শান্তনু দত্তগুপ্ত: রবিবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সাংবাদিক সম্মেলনে নজরকাড়া বিষয় কী ছিল? যতগুলো প্রশ্ন তাঁর দিকে ধেয়ে এসেছে, তার প্রায় সবই পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে। এই রাজ্যের এসআইআর, আইন-শৃঙ্খলা, বকেয়া ডিএ ও ভাতা ঘোষণা, ভোটের দফা... ছবিটা স্পষ্ট—পাঁচ রাজ্যে ভোট হতে পারে, কিন্তু গোটা দেশের কৌতূহল ও অভিঘাতের ভরকেন্দ্র শুধুমাত্র বাংলা। কারণ এখানে লড়াইটা হাই ভোল্টেজ এবং দ্বিপাক্ষিক— মোদি বনাম মমতা। এই একটিমাত্র রাজ্য, যেখানে এসআইআরের অছিলায় বাছাই করে ভোটার বাদ দেওয়ার বিরোধিতা হয়েছে। বলা ভালো, প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে গেরুয়া বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশনকে। এই একটিমাত্র রাজ্য, যেখানে বঞ্চনা বা এজেন্সির মতো নানাবিধ অস্ত্র প্রয়োগ সত্ত্বেও বিজেপি দাঁত বসাতে পারেনি। এই একটিমাত্র রাজ্য, যেখানে বিজেপি-বিরোধী দল পোস্টার হয়ে যায়নি। বাংলা তো বটেই, রাজধানীর রাজপথেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের উপস্থিতি খবরের শিরোনামে এসেছে। এবার তাই মরিয়া বিজেপি। বাংলার কুর্সি চাই। অন্তত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘সম্মান রক্ষার্থে’। কিন্তু বিজেপিও বিলক্ষণ জানে, বাংলাকে তাদের হাতে প্লেটে করে সাজিয়ে কেউ দেবে না। সমীকরণ আছে। বেশ কয়েকটা।
এসআইআর
তৃণমূল হোক বা বিজেপি, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দু’পক্ষই কিন্তু মনে করছে, ‘আমরা অ্যাডভান্টেজ’। বিজেপির ধারণা, টার্গেট ছিল অন্তত এক কোটি। ইতিমধ্যে ৬৪ লক্ষ নাম বাদ হয়ে গিয়েছে। এবার কাজ চলছে ‘বিচারাধীন’ তালিকার। এই ৬০ লক্ষের মধ্যে যদি ২৫ লক্ষও বাদ হয়ে যায়, তাহলে মোট সংখ্যাটা দাঁড়াবে প্রায় ৯০ লক্ষে। অর্থাৎ, বিজেপি যে লক্ষ্যে এসআইআরের পথচলা শুরু করেছিল, তা কার্যত সফল। বাদ যাওয়া এই বিপুল সংখ্যায় অধিকাংশই তৃণমূলের ভোটার হওয়ার কথা। কারণ, সেই মতোই তো ‘বেছে বেছে’ নোটিস পাঠানো হয়েছিল! মুর্শিদাবাদে ১১ লক্ষ, মালদহে ৮ লক্ষ, উত্তর দিনাজপুরে প্রায় ৫ লক্ষ, দুই ২৪ পরগনা মিলে প্রায় ১০ লক্ষ। এর মধ্যে থেকে যদি তৃণমূলের ১০-১২ লক্ষ কোর ভোটার বাদ পড়ে যায়, তাহলেই কেল্লা ফতে। শ’খানেক আসনের মধ্যে ৪০টাও তো হিসাবে চলে এল! এর সবটাই অবশ্য গত বিধানসভা নির্বাচনের নিরিখে করা অঙ্ক। এই পাঁচ বছরে বহু জল বহু দিকে গড়িয়েছে। লাগাতার আন্দোলন এবং সুপ্রিম কোর্টে দরবারের পর বিচার বিভাগের হাতে এসআইআরের শেষ পর্ব চলে যাওয়ায় তৃণমূলও আর তেমন একটা উদ্বেগে নেই। বরং তারা আশাবাদী। কেন? বাংলার শাসক দল মনে করছে, অন্তত ১৩-১৪টি আসনে বিজেপির মার্কামারা ভোটাররা এসআইআরের সৌজন্যে বাদ পড়ে গিয়েছেন। সিএএ’র টোপ সামনে ঝুলিয়ে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে হিপনোটাইজড করে রেখেছিল বিজেপি। সেই মোহ এবার অন্তত ভঙ্গ হয়েছে। কারণ, এসআইআরে তাঁদের নাম ওঠেনি। মতুয়া সম্প্রদায়ের অধিকাংশ ভোটারই এবার আর ভোট দিতে পারবেন না। যেহেতু ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে গিয়েছে, তাই অর্ডিন্যান্স জারি করে বা তার আশপাশের কোনো সাংবিধানিক পদ্ধতিতে এই লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য আলাদা করে ভোটাধিকার জারিও করা যাবে না! সেক্ষেত্রে ওইসব আসন এবার আর গেরুয়া শিবিরের জন্য একপেশে হবে না। আর বিচার বিভাগ দায়িত্ব নেওয়ায়, একধারসে তৃণমূলের ভোটারকুল বাদ চলে যাবে বলে যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল, সেই সম্ভাবনাও নেই। আম জনতাও দেখে নিয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের জন্য সর্বত্র লড়ছেন। ধরনা মঞ্চ থেকে সুপ্রিম কোর্ট। এর একটা প্রভাব তো রয়েছেই।
সংগঠন
হাওয়া। এই একটি শব্দ ছাড়া বঙ্গ বিজেপির সংগঠনকে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখনই রাজ্যজুড়ে একটি অবরোধ কর্মসূচি করতে হবে। হাতে গোনা কয়েকটি জেলার নগণ্য কয়েকটি জনপদ ছাড়া গেরুয়া শিবির কিন্তু কর্মী-সমর্থক দাঁড় করাতে পারবে না। এখনও বাংলায় জনসংযোগ সংক্রান্ত যা কিছু, তার সিংহভাগ করে থাকে আরএসএস। সংঘের এই নীরব সাপোর্টটুকু তুলে নিলে খাবি খাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না বঙ্গ বিজেপির। মমতা জমানায় চারজন রাজ্য সভাপতি দেখে ফেলল বঙ্গবাসী। শুধুমাত্র উনিশের লোকসভা নির্বাচন
এবং তারপর একুশের বিধানসভায় কিছুটা মাথা তুলতে দেখা গিয়েছিল বিজেপিকে। এবার যা পরিস্থিতি, তাতে গেরুয়া আসন সংখ্যা ৬০’এর
নীচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন দলের একাংশই। কারণ, এসআইআর যতই নাম কাটুক না কেন, সাধারণ মানুষ পথেঘাটে বিজেপি
কর্মীদের দেখতে পায় না। চোখের সামনে থাকাটা রাজনীতির ময়দানে রীতিমতো গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। সেখানে বিজেপির একজন নেতা হয়তো দিনে ১৪ ঘণ্টা এ জেলা থেকে ওই জেলা ছুটে চলেছেন। আর একজন নেতা একটি বিধানসভা কেন্দ্রের বুথে বুথে ছুটে জমি শক্ত করছেন। কিন্তু বাকিদের সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া কোথাও খুব একটা সক্রিয় হতে দেখা যায় না। সাধারণ মানুষ বিপদে-আপদে তাঁদের খুঁজেও পায় না। কাজেই স্রেফ এসআইআরের ভরসায় ভোট বৈতরণি পার হওয়া তাই গেরুয়া ব্রিগেডের জন্য কঠিন।
সেবা ও পরিষেবা
রাজ্য কর্মীদের জন্য বকেয়া ডিএ ঘোষণা করে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর আগে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ৫০০ টাকা বাড়িয়েছেন। যুবসাথী প্রকল্পে বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেছেন। পুরোহিত-মোয়াজ্জেমদের ভাতাও বাড়িয়েছেন। এই সবই সরাসরি আম জনতার সঙ্গে কানেক্টেড। মূল্যবৃদ্ধির বাজারে বঙ্গবাসীর হাতে টাকার জোগান থাকছে। ফলে গ্যাসের দাম হঠাৎ বাড়লেও প্রলেপ একটা পড়েই গিয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসাথী, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, বার্ধক্য ভাতার মতো সামাজিক সুরক্ষামূলক প্রকল্প তো রয়েছেই। গ্রামের দিকে সবথেকে বেশি মানুষকে স্বস্তি দিয়েছে পাড়ায় সমাধান। ব্লকে ব্লকে যে সব রাস্তা দীর্ঘদিন ধরে খারাপ হয়ে পড়েছিল, তাতে পিচ পড়েছে। যে সব কলে জল আসছিল না, সেখানে বালতি বসেছে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ কি নেই? সেও আছে। নীচুতলার নেতাদের দাদাগিরি, তোলাবাজি, সরকারি চাকরি... কিন্তু জনমোহিনী নীতির নিরিখে সেই সবই পিছনের সারিতে চলে যাচ্ছে। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে। শহুরে ভোটারদের অসন্তোষ আছে ঠিকই। কিন্তু ২৯৪টির মধ্যে তা মেরেকেটে ৮০টা আসনে। আর অসন্তোষ আছে মানেই ওই ৮০টা কেন্দ্রে তৃণমূল হেরে যাচ্ছে, সেটাও নয়। কারণ, বিজেপি বা সিপিএম, কোনো দলই ভোটারদের একাংশের সেই শূন্যতা ভরাট করতে পারছে না। ডবল ইঞ্জিন বলে বিজেপি লাফায় ঠিকই। কিন্তু দুটো লোকসভা নির্বাচনে ভালো সংখ্যক আসনে জয়ের পরও বাংলা একজনও পূর্ণমন্ত্রী পায়নি। প্রাপ্তি বলতে কয়েকটা ট্রেনের ঘোষণা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে কুকথা বললেই যে ভোট বাড়বে না, কাজে করে দেখাতে হবে... সেটা গেরুয়া শিবিরের হর্তা-কর্তা-বিধাতারা এখনও বোঝেননি। কংগ্রেস তো এ রাজ্যে প্রায় ছবি হয়ে গিয়েছে। মালদহ-মুর্শিদাবাদ জেলায় এবার কয়েকটি আসন অবশ্য তারা পেতে পারে। সেই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সিপিএম? অসাম্প্রদায়িক দল বলে নিজেদের ঘোষণা করে সাম্প্রদায়িকতার প্ল্যাকার্ড তুলে ধরা, টিভি এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের আবদ্ধ করে ফেলা এবং তারপরও আমরাই বাংলার সংস্কৃতির ধারক-বাহক বলে জাহির করা। মানুষ কিন্তু এতে আর ভুলছে না। কোভিডের সময় রেড ভলান্টিয়ারদের সেবা মনে রেখেছিল মানুষ। তারপরও কিন্তু একুশের ভোটে তারা শূন্য হয়ে গিয়েছে। মানে, বাংলার ভোটারদের কাছে তা যথেষ্ট মনে হয়নি। মাটির সঙ্গে যতটা যোগ প্রয়োজন, তার ধারেকাছে বামপন্থীরা এখনও পৌঁছাতে পারছে না। উলটে তারা রিগিংয়ের অভিযোগ তুলছে। এই নালিশ অবশ্য বিজেপিরও আছে। আট দফায় ভোট হলে গোটা রাজ্যে ক্যাডার বাহিনীকে তৃণমূল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘুঁটি সাজাবে বলে ধুয়ো অন্দরমহলে তুলেছিল তারা। বরং আধাসেনা বাড়িয়ে কম দফায় ভোট করাতে পারলে নাকি তৃণমূল আর রিগিং করতে পারবে না। তাই কমিশন তাদের এই আবদার মেনেও নিয়েছে। দু’দফায় ভোট হচ্ছে বাংলায়। কিন্তু বিজেপি হোক বা তৃণমূল, তারা ভুলে যাচ্ছে, রিগিং করে আসন কয়েকটা বাড়ানো যেতে পারে। খান কয়েক হারা সিট জেতাও যেতে পারে। কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া যায় না।
রিপোর্ট কার্ড
এসআইআরে কোন রাজনৈতিক দলের সুবিধা হল, তাতে সত্যিই কি সাধারণ মানুষের কিছু আসে যায়? দিনের শেষে তারা মনে রাখে শুধু হয়রানি। দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো। কখনো শুনানির লাইন। কখনো গ্যাসের। আতঙ্ক এখন আম জনতার নিত্যসঙ্গী। ইভিএমের সামনে দাঁড়িয়ে তারা শুধু এটুকুই মনে রাখে। তখন তাদের মনে পড়ে, কার জন্য এই হয়রানি? কোন দল? কোন সরকার? কার জন্য মূল্যবৃদ্ধি? কে হঠাৎ ৬০ টাকা বাড়িয়ে দিল গ্যাসের দাম? কোন দলের জন্য গ্যাস বুকিংয়ের জন্য ২৫ থেকে ৪৫ দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে? এর উত্তর তারা খুঁজবে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে। কিংবা ভোট দিতে যাওয়ার আগে। গ্যাসের লাইনে যেমন হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ হবে না, ভোটের লাইনেও নয়। গ্যাস বন্ধ হওয়ায় যেমন প্রভাব পড়বে মায়ের বাড়ির প্রসাদ বিতরণে, তেমনই সংকট তৈরি হবে ইফতারে। জাকারিয়া স্ট্রিটে কেউ সাড়ে তিন হাজার টাকায় সিলিন্ডার কিনে মরশুমি ব্যবসা চালাচ্ছেন, কেউ সাড়ে ৬ হাজারে। সেখানে মুসলিমের পাশে দাঁড়িয়ে হিন্দুও একই তৃপ্তিতে কাবাব খাচ্ছে। বেশি দাম দিয়ে। কারণ, উপায় নেই কারিগরদের। মূল্যবৃদ্ধির জমানায় তাঁদেরও বেঁচে থাকতে হবে। ভোট দিতে হবে। তাই রিপোর্ট কার্ড যদি কিছু থেকে থাকে, তা তৈরি করছেন তাঁরাই—আম আদমি। শেষ সিদ্ধান্ত তাঁদেরই।