‘সন্ত্রাসবাদীদের কোমর ভাঙব, হামলাকারীদের কল্পনাতীত সাজা দেব’—কাশ্মীরের পহেলগাঁওতে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিদের ‘টার্গেট কিলিংয়ের’ জবাবে এমনই চরম বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার বিহারের মধুবনিতে এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কাশ্মীরে বেছে বেছে হিন্দুদেরই নিধন করা হয়েছে! এই হামলা শুধু পর্যটকদের উপর নয়, বস্তুত ভারতের আত্মার উপর। হামলাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীরা কল্পনাও করতে পারছে না, তাদের জন্য কী শাস্তি অপেক্ষা করছে। তাদের চিহ্নিত করেই শাস্তি দেবে ভারত। ১৪০ কোটি মানুষের ইচ্ছাশক্তি নিয়ে সন্ত্রাসবাদীদের কোমর ভাঙব।’ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল এরকম, ‘নিরপরাধ মানুষগুলিকে জঙ্গিরা নৃশংসভাবে মেরেছে।’ এরপরই নিহতের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনসহ ‘ওঁ শান্তি’ মন্ত্রপাঠ করেন তিনি। শহিদদের স্মৃতিতে ২ মিনিট নীরবতাও পালন করা হয়। সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন, ‘প্রত্যেক নিহতের পরিবার-পরিজনের পাশে আছে ভারত।’ অতঃপর মোদির হুঁশিয়ারি, ‘প্রত্যেক ষড়যন্ত্রী, জঙ্গি, যারা এই মানবেতর কাজ করেছে, তারা ভাবতেও পারবে না কী সাংঘাতিক শাস্তি তাদের দেওয়া হবে। তাদের ধরা হবে প্রয়োজনে পৃথিবীর শেষ পর্যন্ত ধাওয়া করেই!’
পহেলগাঁও হামলার পর পাল্টা অ্যাকশন প্ল্যান ইতিমধ্যেই নিয়েছে ভারত। প্রথম দফায় বুধবারই ভারত ‘ডিপ্লোম্যাটিক স্ট্রাইক’ করেছে। জঙ্গিদের খোঁজে দিকে দিকে চলছে চিরুনি তল্লাশি। প্রত্যাশিত যে, সরকার দ্রুত সামরিক অ্যাকশনের পথেও হাঁটবে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় ভারতের তরফে নিখুঁত এয়ার স্ট্রাইক বা সার্জিকাল স্ট্রাইকের কথা। ২০১৯-এ পাকিস্তানের বালাকোটে ঢুকে এই দুঃসাহসিক কাজ করেছিল ভারত। ওই ক্ষত পাকিস্তানের নেতাদের মনে এখনও নিশ্চয় দগদগে। প্রবল চাপে পড়ে গিয়ে পাল্টা শক্তি প্রদর্শনেরও চেষ্টায় রয়েছে ইসলামাবাদ। খবর মিলেছে যে, করাচি উপকূলে ভূমি থেকে ভূমি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করতে চলেছে পাক সরকার। পরিস্থিতির উপর বিশেষ নজর রাখছে ভারত। এবার অ্যাকশানে নামার আগে বিষয়টি সম্পর্কে দেশের সকলকে অবগত এবং আশ্বস্তই করতে চায় সরকার। এই উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার দিল্লিতে সর্বদল বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এই ব্যাপারে আলোচনা করেছেন সমস্ত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে।
এসবই কাঙ্ক্ষিত। তবে পহেলগাঁও কাণ্ডে দেশের যেসব মানুষ এবং পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হলেন, তাঁরা মূলত পর্যটক। ভারতের নানা প্রান্ত থেকেই তাঁরা কাশ্মীর বেড়াতে গিয়েছেন। ভূস্বর্গ যখন মৃত্যু উপত্যকায় পাল্টে গিয়েছে—তখন তাঁদের কারও পক্ষেই আর সেখানে থাকা সম্ভব নয়। প্রত্যেককেই নিজ নিজ ঠিকানায় এখনই ফিরতে হবে। বিশেষ করে যেসব পরিবারকে মৃতদেহ সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে তাদের অবস্থা তো আরও করুণ! হতভাগ্য মানুষগুলি ফিরবেন ফুরিয়ে আসা চোখের জল আর এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে। কাশ্মীর ছাড়ার হিড়িকই পড়ে গিয়েছে পর্যটকদের মধ্যে। বুধবার সকালে মাত্র ৬ ঘণ্টায় শ্রীনগর থেকে বিমান ধরেছেন তিন হাজারেরও বেশি মানুষ। যেভাবেই হোক বাড়ি ফিরতে চাইছেন সকলে। পর্যটকদের এমন অসহায়তার ‘সুযোগে’ বিমান ভাড়া একধাক্কায় আকাশ ছুঁয়েছে। জঙ্গি হামলার পর যেন বিমান ভাড়ার সন্ত্রাস নেমে এসেছে তাঁদের উপর। স্বভাবতই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সকলে। ভাবা যায়, শ্রীনগর থেকে কলকাতা (ভায়া মুম্বই) ভাড়া চাওয়া হচ্ছে ৮১,৪৩৮ টাকা! শ্রীনগর থেকে কলকাতা ‘টু স্টপ’ হলে ভাড়া কম—কিন্তু কত? ৭৩,৫৫৫ টাকা! যেসব মানুষ এবং পরিবার সবই হারিয়েছেন বিনা দোষে তাঁদের সঙ্গে এই কারবার মোটেই মানবিক নয়। বিমান সংস্থাগুলি নিশ্চয় ব্যবসা করবে। তাদের কাছে দাতব্য কেউ প্রত্যাশা করে না, কেউ তা করতেও বলেনি। কিন্তু এই অসহায় পরিস্থিতিকে মুনাফা লুটে নেওয়ার ‘মওকা’ হিসেবে ব্যবহার করা হবে! দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান দেশবাসীর সঙ্গে এমন অমানবিক আচরণ করতে পারে কোন কাণ্ডজ্ঞানে? তাদের এই ভূমিকা নিন্দনীয়। দেশবাসীর নিন্দার ঝড়ের মুখে পড়ে অবশ্য ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামতে বাধ্য হয়েছে সরকার। বিভাগীয় মন্ত্রী বলে দিয়েছেন, ‘কোনও বাড়তি ভাড়া নেওয়া চলবে না। সরকার পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। ভাড়া যাত্রীদের সাধ্যের মধ্যেই রাখতে হবে।’ কিন্তু তাঁর এই ঘোষণা যেন কোনোভাবেই দায়সারা না-হয়। সেটি যেন যথাযথভাবেই কার্যকর করে সংস্থাগুলি, সরকারকে তা দেখতে হবে। কেননা, পহেলগাঁও বাদে বাকি কাশ্মীরে এই মুহূর্তে প্রায় ৬০ হাজারের বেশি পর্যটক রয়েছেন। তাঁদের সকলেই আতঙ্কপুরী ছেড়ে নিজ নিজ গৃহকোণে ফিরবেন। সরকার যেন তাঁদের পাশে সবরকমে থাকে। পাকিস্তানকে সমুচিত জবাব দেওয়ার আগেই এই জিনিস নিশ্চিত হওয়া দরকার।