Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ধর্ম রাজনীতি এবং দাঙ্গা ইকনমি

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা, মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ইত্যাদি স্লোগান, মানববন্ধন, অথবা সদ্ভাবনার উদ্ভাস তো খুবই প্রয়োজন। এসব হচ্ছেও।

ধর্ম রাজনীতি এবং দাঙ্গা ইকনমি
  • ১৮ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা, মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ইত্যাদি স্লোগান, মানববন্ধন, অথবা সদ্ভাবনার উদ্ভাস তো খুবই প্রয়োজন। এসব হচ্ছেও। কিন্তু পাশাপাশি দেখা যাক আকর্ষণীয় কিছু তথ্য ও পরিসংখ্যান। জানা দরকার সামাজিক প্রবণতার মধ্যে মিশে যাওয়া রাজনীতি ও অর্থনীতির মুনাফা লোকসান। আবেগ তো থাকবেই। আমার রাজ্য জ্বলছে অথবা জ্বালানোর চেষ্টা করা হবে বারংবার, আমরা  প্রতিবার ইন্টারনেট বন্ধ হওয়া, যাতায়াত বন্ধ 

Advertisement

হওয়া, বাজার দোকান বন্ধ হওয়া, পরীক্ষা অফিস চাষবাস বন্ধ হওয়াকে স্রেফ মেনে নিয়ে নিয়তির দিকে তাকিয়ে বসে থাকব, সেটা তো হয় না! সুতরাং আমাদের আবেগে আঘাত লাগছে এবং লাগবে। কিন্তু একইসঙ্গে বাস্তবের দিকে নজর দেওয়া দরকার। কেন? সেগুলিও একটু বুঝে নিতে পারলে আমাদের উপলদ্ধি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা এবং অনুধাবনের আরও সুবিধা হয়ে যাবে। বিষয়টাও যে খুব জটিল নয়, সেটাও মোটামুটি স্পষ্ট হবে। 
একে বলা হয় রায়ট ইকনমি। দাঙ্গা অর্থনীতি। দাঙ্গার দুই চালিকাশক্তি। বড় ভাইয়ের নাম রাজনীতি। ছোট ভাইয়ের নাম অর্থনীতি। বড় ভাইকে আমরা চিনি। যাকে বলা হয় ধর্মের রাজনীতি। জার্নাল অফ ডেভেলপমেন্ট ইকনমিকসের পক্ষ থেকে ২০১৮ সালে তাৎপর্যপূর্ণ রিসার্চ তথা সমীক্ষা পেপারের  নাম ছিল রিলিজিয়স রায়টস অ্যান্ড ইলেকটোরাল 
পলিটিক্স ইন ইন্ডিয়া।  সেখানে ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯৮ এবং ১৯৯৯ থেকে পরবর্তী সময় পর্যন্ত সময়সীমায় ভারতে হওয়া দাঙ্গার কারণ, রাজনীতি, কোন দল ও সংগঠনের দাঙ্গা হলে সুবিধা হয় এসব নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা আছে। সেই সমীক্ষার অন্যতম চমকপ্রদ বিষয় হল, ১৯৮১ সাল থেকে দেখা গিয়েছে যখনই পরের বছর কোনও ভোট আসছে, তখনই সেই রাজ্যে দাঙ্গার সংখ্যা ও প্রবণতা বেড়ে যায়। চমকপ্রদ এই কারণে যে, বিভিন্ন রাজ্যেই এই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। 
২০০৩ সালে গুজরাতে বিধানসভা ভোট হওয়ার কথা ছিল। গোধরা থেকে শুরু হয়ে আমেদাবাদ পর্যন্ত দাঙ্গা ছড়িয়ে যায় এক বছর আগে। ২০০২ সালের মার্চ মাসে। আর তারই জেরে সেই বছরই ওই আগুনের আবহের রেশ থাকার মধ্যেই নির্বাচন এগিয়ে আসে। ২০০৩ সালের পরিবর্তে, ২০০২ সালের শেষ লগ্নে ভোট হয়। গুজরাত তো ভারতের পশ্চিমে। বাংলা হল পূর্বদিকে। সেখানেও দেখা যাচ্ছে, ওই সমীক্ষার মতোই প্রবণতা। ভোটের এক বছর আগে থেকে দাঙ্গার একটি করে এক্সপেরিমেন্ট শুরু হয়। কখনও বসিরহাট, কখনও ধুলিয়ান, কখনও মোথাবাড়ি, কখনও মুর্শিদাবাদ।
ধর্মের রাজনীতি ব্যাপারটা সহজ। অমর্ত্য সেনের আইডেন্টিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স  গ্রন্থে উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, মানুষের নানাবিধ পরিচয় আছে। 
সেটা কেমন? যেমন ধরা যাক, একই ব্যক্তি বাবা অথবা মা। শিক্ষক অথবা ডাক্তার কিংবা সরকারি বা বেসরকারি কর্মী। কৃষক, ব্যবসায়ী। ইস্টবেঙ্গল অথবা মোহনবাগানের সমর্থক। পাড়ার ক্লাবের সেক্রেটারি। প্রশ্ন হল, সমাজজীবনে কখন কোন পরিচয়টা 
তার মনকে চালিত করে। ধর্ম রাজনীতির কারবারিরা মোটামুটি বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বুঝেছে যে, এসব পরিচয় ছাপিয়ে সেইসব মানুষের একটি বড় অংশের কাছেই হিন্দু ও মুসলমান আইডেন্টিটি অনেক বেশি জোরালো করে দেওয়া যায়। 
সেজন্য দরকার নানারকম ইন্ধন। প্ররোচনা। ইস্যু। ঘটনা। আর তারপর একবার সেই আগুন বুকে ঢুকে গেলে শয়নে স্বপনে জাগরণে ওই হিন্দু মুসলমান চলবে। এসব তাত্ত্বিক কথা। সবাই জানে। ধর্ম রাজনীতি যে যথেষ্ট ডিভিডেন্ড দেয় রাজনৈতিক দলকে সেটাও প্রমাণিত। যেখানে দাঙ্গা হয়, তার পরবর্তী ভোটে সেই জনপদ বা জেলা অথবা কেন্দ্রে ধর্ম রাজনীতি করা দলের নির্দিষ্ট ধর্মের ভোটশেয়ার বেড়ে যায়। সবথেকে বড় কথা হল, ভোট কনসেনট্রেশন হয়। অর্থাৎ হিন্দু ভোট বিভাজিত কম হয়। মুসলমান ভোটও বিভাজিত কম হয়। 
ধর্মীয় আইডেন্টিটি যাদের উগ্রভাবে চালিত করে তাদের মধ্যে যারা শহুরে শিক্ষিত নাগরিক, তারা অবশ্য নিজেরা রাস্তায় নামে না। তারা ঘরে বসে উপভোগ করে দাঙ্গার খবরাখবর। তাদের নিজেদের ছেলেমেয়েদের ইংলিশ মিডিয়াম থেকে ফিটজি হয়ে নিট হয়ে বড় শহরে পাঠিয়ে দেয়। তারপর পেনশন অথবা মোটা বেতনের টাকায় ফেসবুকে সমাজসেবামূলক বাণী বিতরণ করে। 
এসব সর্বজনবিদিত। দাঙ্গায় রাজনীতির লাভ 
হয় সেটা তো জানা। কিন্তু প্রশ্ন হল, ‘রায়ট 
ইকনমির’ তথা দাঙ্গা অর্থনীতির গতিপ্রকৃতিটা ঠিক কী? এটা নতুন কোনও ব্যাখ্যা নয়। আন্তর্জাতিক 
অর্থ ভাণ্ডারের রিপোর্টেও একটি বিশদ অধ্যায় আলোচিত হয়েছে, ‘ইকনমিক ইমপ্যাক্ট অফ 
সোশ্যাল আনরেস্ট’। দাঙ্গার পিছনে নিছক রাজনীতি নয়। থাকে অর্থনীতিও। 
আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের ওই রিপোর্ট বলছে, ১৫ থেকে ৩০ দিন ধরে যদি কোনও সাম্প্রদায়িক অথবা জাতিগত দাঙ্গা চলে, তাহলে সংশ্লিষ্ট রাজ্য, রাষ্ট্র অথবা এলাকায় জিডিপি অন্তত ওই বছরে ০.৫ শতাংশ কমে যায়। কোনও একটি রাজ্যে দাঙ্গা হলে সেই রাজ্যের শাসকদের বিরুদ্ধপক্ষদের কী কী 
সুবিধা হয়? প্রথম সুবিধা হল, ওই রাজ্য যে সামাজিকভাবে অস্থির, সেটা প্রমাণ করা যায়। সেক্ষেত্রে সবার আগে যেটা ধাক্কা খায়, সেটি হল শিল্প লগ্নি এবং বাণিজ্যিক লেনদেন। 
শিল্প স্থাপন যারা করবে, তারা সবার আগে চাইবে শান্তি এবং সুশাসন। দফায় দফায় যদি 
সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করা যায়, তাহলে তকমা দেওয়া সুবিধা হয় যে, এই রাজ্যে কোনও সুস্থিতি নেই। এখানে লগ্নি করা অথবা ব্যবসা বাণিজ্য করা ঠিক হবে না। অর্থাৎ এই রাজ্য অথবা এই ঩জেলা অশান্ত। এই তকমা দেওয়া হলে সেই জেলার অর্থনীতি ধাক্কা খাবে। কারণ সবার আগে ইন্টারনেট বন্ধ হবে। আজকের যুগে ইন্টারনেট ৭২ ঘণ্টা 
বন্ধ মানেই হল, বিপুল বাণি঩জ্যিক ক্ষতি। এরপর হল শিক্ষা ও কাজের পরিবেশ। এই জেলায় কেউ 
চাইবে না সন্তানকে পড়াতে। কেউ চাইবে না 
চাকরি করতে, ব্যবসা করতে। কারণ এত অশান্তি হলে জীবিকা সঙ্কটে পড়বে। সুতরাং রাজ্য সরকার অথবা শাসক দল যে অর্থনীতি রক্ষায় ব্যর্থ এটা প্রমাণিত হবে। 
মুর্শিদাবাদের অর্থনীতি ঠিক কী? ভারত সরকারের প্রকাশ করা বা঩ণিজ্য রিপোর্টগুলি অনুসরণ করলে দেখা যাবে, সিল্ক এবং কৃষিজাত পণ্যের সরবরাহে মুর্শিদাবাদের নাম অগ্রগণ্য। কর্ণাটক, বিহার, দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি জেলা এবং মুর্শিদাবাদ গুণমানে প্রথম সারিতে। উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ হল স্মল স্কেল ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে এগিয়ে। তার মধ্যে আবার মুর্শিদাবাদ অন্যতম। একেবারে মাইক্রো ইকনমির যে স্বনিযুক্তি প্রকল্প, সেখানে হিন্দু ও মুসলিম মহিলারা একজোট হয়ে এই জেলায় কাজ করে। এসব ধাক্কা খেলে অন্য রাজ্যগুলির সুবিধা হবে। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৭৫৮০৫ শিপমেন্ট মুর্শিদাবাদ সিল্ক ভারত থেকে আমেরিকায় রপ্তানি হয়েছে। ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে রপ্তানি, এক বছরে। মালদহের কোন প্রোডাক্ট সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইওরোপে রপ্তানি হয়? আম। মোথাবাড়ি কোথায়? যেখানে মুর্শিদাবাদের আগে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো হল? মালদহে। 
মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ, এই দুই জেলার অর্থনীতির চালিকাশক্তি হল রুরাল ইকনমি। অর্থাৎ কৃষি এবং ক্ষুদ্রশিল্প তথা হস্তশিল্প। সস্তার লেবার মার্কেট হওয়ায় এক্সপোর্ট সাইজ বেশি। আত্মনির্ভর ভারত গড়ার জন্য সবথেকে বেশি কেন্দ্রীয় সরকারের লগ্নি, প্রকল্প এবং প্রোডাকশন ক্লাস্টার স্কিম কোন দুই ঩জেলায় হওয়া উচিত ছিল? মালদহ ও মুর্শিদাবাদ। কিন্তু দুই জেলাকে আরও বেশি করে পণ্য উৎপাদন ও এক্সপোর্টে সাহায্য করার বদলে বেশি বেশি ইমপোর্ট করা হচ্ছে কোন জিনিসটা? দাঙ্গা। বাইরে থেকে লগ্নি আনা হচ্ছে না। বাইরে থেকে বহিরাগত দাঙ্গাকারীদের নিয়ে আসা হচ্ছে। 
দাঙ্গা ইকনমি কাকে বলে? বাইরে থেকে যাদের আনা হয় তারা তো আর ফ্রিতে আসবে না হিংসা ছড়াতে। অতএব তাদের আনা নেওয়ার খরচ বাবদ একটি অর্থ বরাদ্দ করা হয়। স্থানীয়দের যুক্ত করা না হলে লোকেশন চেনা অসুবিধা। তাই কিছু স্থানীয়দের রিক্রুট করা হয়। রামনবমী, হনুমান জয়ন্তী, ওয়াকফ আন্দোলন ইত্যাদি ইস্যুগুলিকে কাজে লাগিয়ে দুই পক্ষের নেতৃত্বকেই অর্থবরাদ্দ করা হয়। এইসব টাকা পাওয়াদের কাজ হয় হিংসা সৃষ্টি করা, ভীতিপ্রদর্শন, অন্য পক্ষকে চোখ রাঙানো। এরা সব পুতুল। কিন্তু নিরীহ পুতুল নয়। তারা জেনেশুনেই করে। ধর্ম রাজনীতি অথবা দাঙ্গা ইকনমির সেনাবাহিনীতে পরিণত হয়। পেইড স্টাফ। এরা ক্ষমতা বদল হলেও রাস্তাতেই থাকবে। চেয়ার পাবে না। পদ ও চেয়ার পাবে উপরতলার উস্কানিদাতারা! 
২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত দাঙ্গা প্রকল্প রচিত হবে বারংবার। যাকে ইচ্ছা ভোট দিন। কিন্তু বাংলা জ্বলছে, বাংলা অশান্ত, বাংলা বসবাসের অযোগ্য, বাঙালি ভীতু, বাঙালি ভিখারি এসব প্রচার ভারতজুড়ে চালানো হলে বাংলার লাভ হবে কি না ভেবে দেখতে হবে। যে কোনও রাজনীতি জিতুক। অবাধে ভোট হোক। সবাই নিজের ভোট নিজে দিতে পারে যেন। শুধু ধর্ম এবং দাঙ্গার রাজনীতি  যেন না জয়ী হয়। নো ভোট টু দাঙ্গা প্রজেক্ট! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ