Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্বস্তি বাংলার মানুষেরও

দেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় আট দশক আগে। তবু দেশবাসীর নাগরিকত্বের সমস্যা মেটেনি। তার কারণ একাধিক। ১৯৪৭-এ স্বাধীনতা প্রাপ্তির সঙ্গে ভারতের মানচিত্র বিভক্ত হয়েছিল।

স্বস্তি বাংলার মানুষেরও
  • ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় আট দশক আগে। তবু দেশবাসীর নাগরিকত্বের সমস্যা মেটেনি। তার কারণ একাধিক। ১৯৪৭-এ স্বাধীনতা প্রাপ্তির সঙ্গে ভারতের মানচিত্র বিভক্ত হয়েছিল। তার সিকি শতক পূর্ণ হওয়ার আগেই দু’টুকরো হয়েছিল নবগঠিত পাকিস্তান। উপর্যুপরি দুই ধাক্কায় উদ্বাস্তু নরনারীর ঢল নেমে আসে ভারতের বুকে। প্রতিবেশী পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, মায়ানমার এবং শ্রীলঙ্কায় গণতন্ত্রের ভিত বরাবর দুর্বল। তার ফলে এই দেশগুলি গণঅভ্যুত্থানে বারবার উত্তাল হয়েছে। আম জনতা নিরাপত্তার অভাবে ভোগে সবসময়। নিরাপত্তার অভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় সংশ্লিষ্ট দেশগুলিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভিতরে। তার ফলে স্রেফ প্রাণে বাঁচার সর্বশেষ আশায় লক্ষ লক্ষ হতভাগ্য সর্বস্বান্ত মানুষ দেশ ছাড়ে। এই উপমহাদেশে দেশত্যাগী মানুষগুলির কাছে সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্য হল ভারত। বলা বাহুল্য, উদ্বাস্তু বা শরণার্থী মানুষগুলির মধ্যে হিন্দুরাই সর্বাধিক। তাদের মধ্যেও সংখ্যাগরিষ্ঠ হল বাংলাভাষীরা। পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অসম ও সংলগ্ন রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী পরিবারের সংখ্যা বিপুল। ঐতিহাসিক কারণেই, পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের সঙ্গে তাদের অনেকেরই পারিবারিক আত্মীয়তার সম্পর্কও বিদ্যমান। সেই সূত্রে তাদের পক্ষে এই রাজ্যগুলিতে এসে আশ্রয়গ্রহণের এক পরম্পরা খুঁজে পাওয়া যায়। রাজনৈতিক মহলের অনুমান, দেশভাগের পর শুধু পূর্ববঙ্গ থেকেই দফায় দফায় এদেশে অন্তত দুই কোটি বাঙালি নরনারী এসে আশ্রয় নিয়েছে। সেই স্রোত কালে কালে স্তিমিত হলেও পুরো বন্ধ হয়নি। এছাড়া সংখ্যায় অনেক কম হলেও পূর্ববঙ্গ থেকে এদেশে এসেছে আদিবাসী, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান শরণার্থীরাও। হাজার হাজার মুসলিম পরিবারও এদেশে জীবিকার প্রয়োজনে অনুপ্রবেশ করেছে। সামরিক শাসকের নির্মম নিপীড়নের কারণে মায়ানমার থেকেও হাজার হাজার রোহিঙ্গা নরনারী ভারতে ঢুকেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। গত কয়েক দশকে নেপাল, পাকিস্তান, তিব্বত এবং শ্রীলঙ্কা থেকেও বহু শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছে।

Advertisement

ফলে দুধ আর জল আলাদা করতে গিয়ে হিমশিম অবস্থা ভারত সরকারের। বোঝা দায়, কে ভারতের আসল বাসিন্দা আর কে বিদেশ থেকে আসা লোক। মোদি সরকার দুধ ও জল পৃথক করার অঙ্গীকার নিয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে ‘বিদেশিদের’ বিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে এসআইআর। আর এখানেই বেধে গিয়েছে গোল। ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা সবমসয়ই কাম্য। তাতে কারও নাম একাধিক জায়গায় থাকলে তার সংশোধন জরুরি। বাদ দিতে হবে মৃত ভোটারদেরও নাম। বিদেশিদের নামও খারিজ হওয়া দরকার। কারণ গোলমেলে ভোটার তালিকার ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং সরকার গঠন হলে তাকে গণতন্ত্রের গোড়ায় গলদ বলেই মানতে হবে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ত্রুটিমুক্ত হবে, এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সেই দুরূহ কাজটি করতে গিয়েই কেঁচে গণ্ডূষ করে ফেলছে নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। অন্তত বিহারের ক্ষেত্রে ৬৫ লক্ষ নাম বাতিলের তথ্য সামনে এসেছে! কংগ্রেস, আরজেডি-সহ বিভিন্ন বিরোধী দলের অভিযোগ, এক্ষেত্রে সাংঘাতিক অনিয়ম ঘটেছে। যাদের নাম বাদ পড়েছে তাদের বেশিরভাগই গরিব, প্রান্তিক ও দুর্বল শ্রেণির লোক। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিতেই এই ‘অনাচার’ করা হয়েছে। 
বিজেপি এবং ইসিআই যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করার পরেও বিতর্ক থামছে না। মামলা গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। মূল বিতর্ক নাগরিকত্ব প্রমাণের নথিগুলি নিয়ে। কারণ যে ১১টি নথি ইসিআই কর্তৃক ‘গ্রাহ্য’—তা সবার কাছে নেই। রেশন, আধার এবং ভোটার কার্ড ওই তালিকায় না-রাখাতেই বিপাকে পড়েছে অসংখ্য নাগরিক। বিতর্কের অবসানে অবশেষে নির্দেশ জারি করেছে শীর্ষ আদালত। এসআইআর প্রশ্নে তারা আধারকেও বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছিল আগেই। তা সত্ত্বেও বিহারে এসআইআর-এ প্রামাণ্য নথি হিসেবে আধার কার্ড গ্রাহ্য ছিল না। এমনকী, আধারের মাধ্যমে জমা দেওয়া আবেদনপত্র বাতিলের খবরও শোনা যাচ্ছিল। সোমবার এই তথ্য সুপ্রিম কোর্টে পেশ হতেই ইসিআই’কে নির্দেশ দেওয়া হল যে, বিহারে ভোটার তালিকায় নাম তোলা বা বাতিলের জন্য আধার কার্ডকে প্রামাণ্য নথি হিসেবেই গ্রহণ করতে হবে। বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির বেঞ্চের সাফ মন্তব্য, ‘‘আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় ঠিকই, তবে এটি অবশ্যই সরকার স্বীকৃত পরিচয়পত্র। তাই আধারও গ্রাহ্য হবে এসআইআর-এ। ইনিউমারেশন ফর্ম ফিলাপে আধারকে ১২তম নথি হিসেবে মানতে হবে। এই ব্যাপারে কমিশন শীঘ্রই নির্দেশিকা জারি করবে।’’ শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশে আশার আলো দেখছে বাংলাও। কারণ এসআইআর ইস্যুতে বাংলার সমস্যাটি বিহারের চেয়েও বড়ো। শীর্ষ আদালত সুরাহার পথ না দেখালে নথির জাঁতাকলে পড়তে পারত এরাজ্যের এক থেকে দুই কোটি মানুষ!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ