প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াইয়ের মাঠে নামার আগে যেকোনও ক্রীড়াবিদ নিজের মনোনিবেশ বাড়াতে গা-ঘামিয়ে নেন, ইংরেজিতে বলে ‘ওয়ার্ম-আপ’ করে নেওয়া। সেই গা-ঘামানোর ময়দানেই প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় যে ‘খেলা’ দেখিয়েছে ভারত তাতেই পাকিস্তান মোটামুটি কুপোকাত! গত ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে ২৬ জন নিরীহ হিন্দু পর্যটককে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছিল জঙ্গিরা। সেই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পাল্টা হিসেবে জঙ্গি ও তাদের মদতদাতাদের মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেইমতো ঘটনার পনেরো দিন পর ৭ মে পাক সীমানায় অবস্থিত ন’টি জঙ্গিঘাঁটিতে বিমান হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় ভারত এবং তখনই জানিয়ে দেওয়া হয়, পাকিস্তান পাল্টা হামলা চালালে তার সমুচিত জবাব দেওয়া হবে। যেমন কথা তেমন কাজ। কার্যত খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তান নিজেদের ‘তাকত’ দেখাতে বুধবার রাতভর ভারতের কাশ্মীর, পাঞ্জাব ও রাজস্থানের সেনাছাউনি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মাঝআকাশেই ড্রোনগুলি ধ্বংস করে দেয় ভারতীয় সেনা। পাল্টা হিসেবে লাহোরের আকাশ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ড্রোন হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় ভারত। তবু ভারতের নিরীহ নাগরিকদের হত্যার চেষ্টা করে চলেছে পাকিস্তান। এর প্রত্যাঘাতে করাচি, লাহোর, ইসলামাবাদ সহ পাকিস্তানের কয়েকটি শহরে একযোগে অভিযান চালায় ভারত। অপারেশন সিন্দুরের প্রথম পর্বে শুধুমাত্র জঙ্গিঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে পাকিস্তানের আক্রমণ ভোঁতা করে দিতে পড়শি রাষ্ট্রের সামরিক কাঠামোকে টার্গেট করেছে ভারত। কৌশল সেই এক, পাল্টা মার। সব মিলিয়ে তাই দু’দিনেই সন্ত্রাসবাদের মদতদাতা পাকিস্তানেরই খোলসে ঢুকে পড়ার উপক্রম।
আসলে এটাই হওয়ার কথা ছিল। ১৯৪৭-এ ভারত-পাকিস্তান দুটি দেশের জন্মের পর থেকে এখনও পর্যন্ত চারটি যুদ্ধ হয়েছে। ইতিহাস বলছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারতীয় ভূখণ্ডে হামলা চালানো শুরু করেছে পাকিস্তান। ভারতের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। প্রতিবারই ভারতের প্রবল প্রতিরোধ ও পাল্টা আঘাতে ল্যাজগুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে তারা। শেষ বিচারে ‘জয়ী’ হয়েছে ভারত। যুদ্ধ কিংবা সংঘর্ষের কারণ সেই কাশ্মীর। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর ভূস্বর্গের দখল নিতে দু’দেশের যুদ্ধ বাধে। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৯-এর জানুয়ারি মাসে রাষ্ট্রসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলওসি) তৈরি করে ভাগ হয় কাশ্মীর। যুদ্ধ থামে কিন্তু সেই যুদ্ধে কাশ্মীরের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ভূখণ্ডের দখল পায় ভারত। ১৯৬৫ সালে মূলত কাশ্মীর বিরোধকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় যুদ্ধ বাধে। সেবার তস্কর সুলভ আচরণ করে ভারতের সীমানায় ছদ্মবেশী সৈন্য ও বিদ্রোহীদের ঢুকিয়ে আক্রমণ চালায় পাকিস্তান। দেশবাসীর গর্বের ভারতীয় সেনা মোক্ষম জবাবটি দেয়। শেষপর্যন্ত দুই বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপে যুদ্ধ বিরতি হয়। সই হয় তাসখণ্ড চুক্তি। তৃতীয় যুদ্ধ ১৯৭১ সালে। পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ)-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সামরিক অভিযান চালায় ভারত। তীব্র লড়াইয়ের পর হার মেনে নেয় পাকিস্তান। সে দেশের ৯৩ হাজার সেনা আত্মসমর্পণ করে। জন্ম নেয় নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এরপরে ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধ। জম্মু কাশ্মীরের কারগিল দখল করতে অভিযান চালায় পাক সেনা। নিয়ন্ত্রণ রেখা থেকে অপারেশন বিজয় শুরু করে ভারত। কারগিলের নিয়ন্ত্রণ হাতে পায় আমাদের দেশ। তবু সবক শেখেনি পাকিস্তান। তারপরের আড়াই দশকে কোনও যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি না হলেও সংঘর্ষ থেমে থাকেনি। যেমন, ২০১৬-তে কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনাঘাঁটি আক্রমণ করে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদীরা। ভারত সার্জিকাল স্ট্রাইক করে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের একাধিক জঙ্গিঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়। এর তিন বছর পর ২০১৯ সালে কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সেনা কনভয়ে গাড়িবোমা বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। তাতে ৪০ জন ভারতীয় জওয়ান প্রাণ হারান। প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানের বালাকোটে জয়েশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায় ভারত। এরপর ২০২৫-এর ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে পাকিস্তানের মদতে ঘটেছে ন্যক্কারজনক ঘটনা, যার প্রতিশোধের আগুনে কার্যত গোটা পাকিস্তান এখন জ্বলছে।
যেকোনও দেশের বৈদেশিক নীতির মূল কথাই হল, নিজের সামর্থ্য বুঝে কৌশল ঠিক করা। পাকিস্তান বরাবর ভারতকে তাদের ‘সমকক্ষ’ ভেবে এলেও ঘটনা হল, আর্থসামাজিক, উন্নয়ন, বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ভাবমূর্তি এবং সামরিক শক্তির বিচারে দু’দেশের মধ্যে আসমান-জমিন ফারাক। তা সত্ত্বেও কিছু বিদেশি শক্তির অঙ্গুলিহেলনে ভারতের বিরুদ্ধে দশকের পর দশক ধরে শত্রুতা জারি রেখেছে পাকিস্তান। এবং সেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে নিজেদের ‘বাঘ’ ভেবে নেওয়ার ফলে প্রবল পরাক্রমী ভারতের হাতে বারবার নাককাটা পড়লেও চোখ খোলে না পাকিস্তানের! অথচ চলতি পহেলগাঁও কাণ্ডের সময়কালেই বাইরে ভারত এবং ঘরে বালুচ আর্মির হামলায় কার্যত নাভিশ্বাস উঠেছে পাকিস্তানের। বিভিন্ন সূত্রের খবর, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ দানা বাঁধছে। শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে। এককথায়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সমস্যায় হাঁসফাঁস করছে দেশটা। এমন দিনও আসতে পারে যখন দেখা যাবে, এই পাকিস্তান ভাগ হয়ে গিয়েছে। সব মিলিয়ে ইতিমধ্যেই ‘লাল কার্ড’ দেখে বসে আছে পাকিস্তান।