নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: রিভিউ পিটিশন কবে গৃহীত হবে, তা অনিশ্চিত। তাই সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের জন্য নতুন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। মঙ্গলবার নবান্নে সেই ঘোষণাই করলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৩০ মে এসএসসির উল্লিখিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হবে। অনলাইন আবেদন চলবে ১৮ জুন থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী মিলিয়ে মোট ৪৪ হাজার ২০৩টি শূন্যপদের (নতুন ও পুরনো) জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী আগেই ফেসবুক পোস্টে আন্দোলনকারীদের ভাই-বোন সম্বোধন করে লিখেছিলেন, তাঁদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করতে চলেছেন তিনি। তাই তাঁর ঘোষিত সময় বিকেল ৫টায় সবার চোখ ছিল টিভি ও মোবাইলে। মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু বারবার বলেছেন, আইন এবং নিয়োগ— দুই পথে একসঙ্গেই সরকার চলবে। সেই কারণেই পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হচ্ছে না। রিভিউ পিটিশনে কী হয়, সেটা দেখার পরই ওই তারিখ জানানো হবে। যদি রাজ্যের আবেদনে শীর্ষ আদালত সাড়া দেয়, সেক্ষেত্রে পরিস্থিতিতে বদল আসবে। মানবিকতার খাতিরে প্রত্যেক প্রার্থীর কথাই ভেবেছেন তিনি। পাশাপাশি নতুন আবেদনকারীদের জন্য আলাদাভাবে ২০ হাজার শূন্যপদের ঘোষণাও করেছেন। মমতা বলেন, আইন এবং সংবিধান মেনেই তাঁকে চলতে হবে। তবে চাকরিহারাদের জন্য বয়স এবং অভিজ্ঞতায় ছাড়ের ব্যবস্থা করার কথা ভাবছে রাজ্য। চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের তাঁর আবেদন, এই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। ব্যবস্থা একটা হবেই। এই প্রসঙ্গে অন্য দপ্তরে কাজের সুযোগের কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে, নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরে হতাশা, কান্নায় ভেঙে পড়েন আন্দোলনকারী শিক্ষকরা। আন্দোলনস্থলে এক শিক্ষিকা জ্ঞান হারান। সাংবাদিক সম্মেলনে এসে আন্দোলনকারীদের তরফে বৃন্দাবন ঘোষ, রাকেশ আলম এবং মহম্মদ হাবিবুল্লা বেশ কয়েকটি দাবি এবং প্রস্তাব তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্য, ১) এই ঘোষণা তাঁদের কাছে মৃত্যু পরোয়ানার শামিল। কারণ স্কুলে ছাত্র পড়িয়ে, সংসারের অন্যান্য কাজ সামলে তাঁদের পক্ষে আর প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ই থাকছে না। তার উপর রয়েছে চাকরি হারানোর মানসিক যন্ত্রণা। ১২-১৪ ঘণ্টা প্রস্তুতি নেওয়া নতুন প্রার্থীরা (ফ্রেশার) তাঁদের থেকে স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি সুবিধা পাবেন। ২) সুপ্রিম কোর্ট এত সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন দেওয়ার কথা বলেনি। তা সত্ত্বেও, একেবারে কাউন্সেলিং পর্যন্ত দিনক্ষণ ঘোষণা এখনই করে দেওয়া হচ্ছে। রিভিউ পিটিশনের জন্য হাতে বাড়তি সময় রেখে আবেদনের সময়সীমা পিছনো যেত। ৩) সুপ্রিম কোর্টের যে নির্দেশে এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কথা বলা হচ্ছে, সেখান থেকেই অযোগ্যদের চাকরি বাতিল করার কথা বলা হয়েছিল। তা কেন মানল না সরকার? ৪) তাঁদের স্বার্থরক্ষায় আইনজীবীরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। সেগুলি তাঁরা সরকারকেও জানাতে চান। সে কারণেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক চেয়েছিলেন। তার আগে কেন এই ঘোষণা করা হল? তাঁরা এখনও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছেন। ৫) রিভিউ পিটিশন খারিজ হলে কিউরেটিভ পিটিশন করা যায়। সে কথা কেন মুখ্যমন্ত্রী তুললেন না? ৬) ওবিসি সংরক্ষণের কী হবে এবং যাঁরা অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার জন্য পরীক্ষা দিতে পারবেন না, তাঁদেরই বা কী হবে, তা নিয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট ঘোষণা নেই।
আন্দোলনকারীরা মনে করছেন, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরেও কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গিয়েছে। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাড়তি নম্বর এবং বয়সে ছাড় দেওয়া ছাড়া তাঁরা আর কোনও সুবিধা পাবেন কি না, সেটা স্পষ্ট নয়। তাই তাঁদের বক্তব্য, সুপার নিউমেরারি পোস্ট তৈরি করে পরীক্ষা এড়িয়ে তাঁদের আলাদাভাবে নিয়োগ করা হোক। যদিও ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় আন্দোলনকারীদের প্রতি বেশ কিছু পরোক্ষ ইঙ্গিত রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের অবমাননা যাতে না হয়, তার জন্যই যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হচ্ছে, তা তিনি জানিয়েছেন। তবে, মূল লড়াইয়ের জায়গা যে রিভিউ পিটিশন, তাও মনে করিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেছেন, তিনি কারও চাকরি বাতিল করেননি। তা হোক, সেটাও চান না। সেই কারণেই শিক্ষাকর্মীদের স্বার্থ দেখার চেষ্টা করছেন তিনি। পাশাপাশি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ত্রিপুরায় ১০ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল হলেও বিজেপি সরকার তাঁদের জন্য কোনও পদক্ষেপ করেনি।
ওয়াকিবহাল মহল এও মনে করছে, চাকরিহারাদের স্বার্থরক্ষা যেমন এই মুহূর্তে প্রধান কাজ, তেমনই নতুন করে তৈরি হওয়া শূন্যপদগুলিও সময়ে পূরণ করতে হবে। না হলে একদিকে যেমন শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে, তেমনই পড়ুয়ারা বঞ্চিত হবে পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে। তার জেরে স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়বে অচিরে। সবরকম আইনি লড়াই শেষে যদি আদালতকে সন্তুষ্ট না করা যায়, তাহলে নতুন নিয়োগ পদ্ধতিই একমাত্র ভরসা। বৃহত্তর স্বার্থে সেই পথেই হাঁটতে হবে সরকারকে।