কোনও প্রতীক কি বাণীর মাধ্যমে নয়, সত্য স্বয়ং প্রতিভাত হন যার কাছে, সেই-ই ধন্য। আমাদের মতামত, আমাদের ভাবাবেগের দৌড় বেশিদূর নয়, আর প্রায়ই ঠকায় ওরা। দুর্জ্ঞেয় গূঢ় তত্ত্ব অধিগত করার জন্য প্রবল অনুসন্ধিৎসায় লাভ কি? ও সব না জানলেও “কিয়ামতে”র দিনে দোষী প্রতিপন্ন হব না আমরা। যা আমাদের কাজে আসবে, যাতে আমাদের লাভ, তার খোঁজ না রেখে যত উদ্ভট অনর্থে আমাদের মন। একেই বলে ঘোর অজ্ঞানতা। চোখ থাকতেও দেখিনা আমরা। বস্তুর বর্গ ও শ্রেণী (Genera & species) বিচারে আমাদের কাজ কি? পরাবাণী শ্রবণগোচর হলে ‘অব্যর্থকালতা’র + লক্ষণ দেখা দেয়, ‘নানা মুনির নানা মত’ শোনা থেকেও রেহাই মেলে। একাক্ষরী বাণী হতেই সর্ববস্তুর উদ্ভব এবং তারাও অভিব্যক্ত করছে সেই এককেই—আদিভূতা বাণী এ-ই। তাঁর সহায়তা ছাড়া সম্যক উপলব্ধি বা বিচার মানুষের অসাধ্য।
‘নেহ নানাঽস্তি কিঞ্চন’ এই যাঁর বোধ এবং নিখিল বস্তু একতত্ত্বে সমাহৃত করে একের মধ্যেই বহুকে দর্শন করেছেন যিনি, হৃদয়ে দৃঢ় প্রত্যয় আসে তাঁরই—তিনিই ‘শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি।’ হে সত্যস্বরূপ! অনন্ত প্রেমে তোমার সাযুজ্য দাও আমায়। নানারকম পড়াশোনায় প্রায়ই ক্লান্তি লাগে আমার। আমার আশা-বাসনা বলতে যা কিছু তা যে তুমিই নাথ! তোমার আবির্ভাবে আচার্যরা নীরব হয়ে থাকেন যেন, নিখিল প্রাণী হক মূক। একা তুমিই সম্ভাষণ কর আমায়। যতই ঐকাত্ম্য ঘটে তোমার সঙ্গে, জ্ঞানের পরিধি ততই বাড়ে মানূষের—উপলব্ধি হয় গভীরতর। ‘বাগ্বাদিনীর একটি কিরণ’ সে তখন পায় কিনা! পবিত্র সরল ও নৈষ্ঠিক যে, নানা কর্মে লিপ্ত হলেও সে লক্ষ্যচ্যুত হয় না। তার সকল কর্মই ঈশ্বরপ্রীত্যর্থে। নিজের বিদ্যাবুদ্ধি পাছে নানা অনুসন্ধিৎসা হতে বিরত না থাকে এজন্য চিত্তকে নিষ্ক্রিয় রাখতেই প্রয়াস পায় সে। মনের অদম্য আসক্তির চেয়ে আর কিসে তোমার বেশি ভয়, বেশি ভাবনা? সৎস্বভাব ঈশ্বরানুরাগী ব্যক্তি যে-কোন কাজে নামার আগে মনে মনে তার ছকটি ঠিক করে নেন। এভাবে কাজে নামলে প্রবৃত্তির ফাঁদে পড়বার ভয় থাকে না, ন্যায়বুদ্ধির প্রশাসনে দমিত থাকে কুবাসনা! আত্মজয়ে ব্রতী হওয়ার চেয়ে কঠিন সংগ্রাম আর কি আছে? আত্মজয়ী এবং উত্তরোত্তর বীর্যশালী হয়ে আরও এগিয়ে চলাই হক আমাদের জীবনের একমাত্র কাজ। ঐহিকের সকল ঔৎকর্যেই কোন না কোন খুঁত আছে এবং আমাদের সব হিসাবেই কিছু না কিছু গলদ রয়েছে।
গভীর তত্ত্বানুসন্ধিৎসার চেয়ে নিরভিমান হওয়াটা ভগবানের অধিক প্রিয়। জ্ঞান বা সাদাসিধাভাবে কেবল নানা বিষয় জানাটা দোষের নয় কিছু। ওটা ভাল কাজ এবং ভগবানের অভিপ্রেত। কিন্তু সব সময় বেশি জোর দিতে হবে চিত্তশুদ্ধি ও সাধুজীবন-যাপনের উপর। অধিকাংশ লোক জ্ঞানার্জনের জন্যই বিদ্যাচর্চা করে, সদ্ভাবে জীবন কাটাবার জন্য নয়। এজন্য প্রায়ই ভ্রান্তিতে পড়ে তারা; জ্ঞানার্জনের সুফল পায় সামান্যই। কোন ফল পায়না বললেও চলে। নানা প্রশ্ন তোমায় মানুষের যে অধ্যবসায়, পাপের মূল উচ্ছিন্ন করায় ও সদ্বৃত্তির অনুশীলন যদি তা থাকত তাহলে মানুষের মনে এত মন্দবুদ্ধি বা মহিলাশ্রম কি অন্যান্য মঠাশ্রমে এত অনাচার থাকত না। আমরা কি পড়েছি না পড়েছি ‘কিয়ামতে’ সে প্রশ্ন উঠবেনা নিশ্চয়ই, কাজে কি করেছি সেই কথাই উঠবে। মুখে ভালকথা কত কি বলেছি সে প্রশ্নও নয়, প্রশ্ন হবে জীবনটা কতদূর ধর্মভাবে কাটিয়েছি।
‘ঈশানুস্মরণ’ টমাস আ কেম্পিস অনুবাদ শ্রীনারায়ণী দেবী থেকে