সন্দীপন বিশ্বাস: প্রথম থেকেই নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপির একমাত্র লক্ষ্য কংগ্রেসহীন ভারত গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যেই দিনের পর দিন নানা কৌশল অবলম্বন করে চলেছেন মোদি। তার প্রথম ঝটকাটা লেগেছিল ২০১৬ সালে। ওই বছর অক্টোবর মাসে মোদি রাতারাতি পাঁচশো এবং হাজার টাকার নোট বাতিল করার কথা ঘোষণা করলেন। কালো টাকা ধরবেন বলেই নাকি এই পদক্ষেপ ছিল! কালো টাকার হদিশ মেলেনি। তখন অনন্ত যন্ত্রণার মধ্যে মানুষের দিন কেটেছে। ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে কত লোক মারা গিয়েছেন। দেশের আর্থিক পরিস্থিতিকে কবরে পাঠিয়েছেন। এসব অবশ্য বিজেপিকে বিব্রত করেনি। কেননা তারা জেনেছিল, ঢিলটা ঠিক জায়গাতেই গিয়ে পড়েছে। রাতারাতি কংগ্রেসের তহবিলে টান পড়ে গেল। কংগ্রেস তার তহবিলে গচ্ছিত পাঁচশো বা হাজার টাকার নোট বদল করতে পারল না। আড়ালে হাসলেন মোদি। এছাড়া বহুবার জয়ী কংগ্রেস বিধায়কদের ‘কিনে নিয়ে’ কয়েকটি রাজ্যে গদি উল্টে দিয়েছে বিজেপি।
এভাবে একটা একটা করে মোদি পদক্ষেপ নিয়েছেন কংগ্রেসকে ফিনিশ করতে। আর্থিকভাবে এবং সংগঠনের দিক থেকে আজ কংগ্রেস খুবই অসহায়। তবে তার থেকেও একটা বড় দুর্বলতা কংগ্রেসের আছে। সেটা হল নেতৃত্বের দুর্বলতা। সত্যি বলতে কী, কংগ্রেসের এমনই দুর্ভাগ্য যে, মোদি বা শাহের মতো সম ক্ষমতাসম্পন্ন নেতৃত্ব তাদের ভাণ্ডারে নেই। গত নির্বাচনে কংগ্রেসের যেটুকু আসন বেড়েছে, তার পিছনে রয়েছে বিজেপির প্রতি মানুষের ক্ষোভ এবং আঞ্চলিক দলগুলির শক্তিবৃদ্ধি। বিভিন্ন রাজ্যের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাদের প্রদীপের তেল কমে এসেছে। এর জন্য শুধু বিজেপিকে দায়ী করলে সর্বাংশে ভুল হবে। দায়ী কংগ্রেস নিজেই। তার আত্মিক দুর্বলতাই তাকে ভিতর থেকে ভাঙছে। রাজনীতি এখন তীব্র গতিশীল। প্রতি মুহূর্তে তার পট পরিবর্তন হচ্ছে। এই সময় মোদির মতো পরিশ্রমী, বাগ্মী, চতুর নেতাকে টক্কর দিতে গেলে বিপরীতে দরকার এক সিংহ পুরুষ। সেই খ্যামতা যে রাহুল গান্ধীর নেই, এতদিনে দেশের মানুষ সেটা জেনে গিয়েছেন। হাফপ্যান্ট পরা পার্ট
টাইম নেতৃত্ব দিয়ে কংগ্রেসের মতো দলকে পরিচালনা করা যায় না। শুধু নেহরু, ইন্দিরা, রাজীব ব্র্যান্ডের ঘিয়ের গন্ধ শুঁকে কংগ্রেসকে এগিয়ে নিয়ে চলা সম্ভব নয়। তবে মাটি কামড়ে পড়ে থেকে খাদের কিনারা থেকে দলকে ফিরিয়ে আনার দম যে রাহুলের নেই, বেশ কয়েক বছর ধরে তাঁর নড়াচড়া দেখলেই বোঝা যায়। একটা পরিক্রমা, দু’টো সভা করে দলের সংগঠনকে মজবুত করা যায় না। দলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে হোলটাইমার হতে হয়। দলের লক্ষ লক্ষ নেতা কর্মীদের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে হয়। সেটা যে কেমন, তা মোদি বা মমতাকে দেখেও রাহুল শিখতে পারেননি। কিছুদিন রাজনীতিতে, কিছুদিন সভা সমাবেশ, আবার হঠাৎ করে বেশ কিছুদিনের জন্য উধাও! কয়েকদিন পর জানা যায়, তিনি বিদেশে ছুটি কাটাচ্ছেন। সত্যি, কংগ্রেস এখন একটা অভিভাবকহীন দল। এই অবস্থায় মনে হয় কংগ্রেসকে সত্যি করে ফিনিশ করার জন্য বিজেপির প্রয়োজন নেই। রাহুলের একনিষ্ঠতা ও কঠোর মানসিকতার অভাব, একসূত্রে সবাইকে বেঁধে রাখতে না পারার ব্যর্থতাই দলটাকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করে তুলছে।
কংগ্রেস নিজেদের দীর্ঘদিন জমিদারের পার্টি ভেবে এসেছে। প্রথম থেকেই তার মধ্যে ছিল একটা সামন্ততান্ত্রিক ভাবনা। স্বাধীনতার পর বেশ কিছুদিন তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়নি। কিন্তু স্বাধীনতার পর দ্বিতীয় প্রজন্ম বড় হতেই কংগ্রেস বেকায়দায় পড়তে শুরু করে। ইন্দিরার মৃত্যুর পর আবেগের ভোটে রাজীব জিতেছিলেন। কিন্তু ইন্দিরার জরুরি অবস্থার কথা মানুষ ভুলতে পারেননি। তাই রাজীবের মৃত্যুর পর থেকে কংগ্রেস নেতৃত্বহীনতায় ভুগতে শুরু করে। কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে গান্ধী পরিবার সম্পর্কে আলাদা আবেগ ছিল। কিন্তু ততদিনে সেই নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রথম বুঝেছিলেন, কংগ্রেসকে বাঁচাতে গেলে জোট বাঁধতে হবে। কেননা কংগ্রেসের এককভাবে পথ চলার দম ফুরিয়েছে। এই কথাটা তিনি সোনিয়াকে বোঝাতে পেরেছিলেন বলেই ২০০৩ সালে কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল। সেবার কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভোটে লড়েছিল ডিএমকে, আরজেডি, আরএলডি, টিআরএস, জেএমএম দলগুলি। কংগ্রেস এককভাবে পেয়েছিল ১৪৫টি আসন। জোটসঙ্গীরা পেয়েছিল ৯৮টি আসন। মনমোহন সিংয়ের সুশাসনের কারণে পরবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের আসন বাড়ল। এককভাবে কংগ্রেস পেল ২০৬টি আসন এবং জোটসঙ্গীরা পেল ৫৬টি আসন।
ব্যাস, রাহুল গান্ধী নিজেকে বিশাল নেতা ভাবতে শুরু করলেন। বেশ কয়েকটি ব্যাপারে প্রকাশ্যে মনমোহন সিংকে অপমান করে বসলেন। সব থেকে বড় ঘটনাটি ঘটে ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। সেদিন মনমোহন সরকারের আনা একটি অর্ডিন্যান্সকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করে সাংবাদিক সম্মেলনেই সেই কাগজটি ছিঁড়ে ফেলেন। মনমোহন সিংয়ের মতো সুভদ্র প্রধানমন্ত্রীকে এত বড় অপমান সেই সময় সম্ভবত দেশের বিরোধী দলগুলিও করেনি।
প্রথম ইউপিএ সরকারে মনমোহন সিংয়ের
মিডিয়া অ্যাডভাইসর ছিলেন সঞ্জয় বারু। দ্বিতীয় ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সোনিয়া এবং রাহুল সেই সঞ্জয় বারুকে বিদায় করেন। মনমোহন সিংয়ের ফেয়ারওয়েল ডিনারেও আসেননি
রাহুল। রাহুলের সেই ঔদ্ধত্য ২০১৪ সালের পর থেকে খসে খসে পড়তে থাকে। কংগ্রেসের সমস্ত জৌলুস ফিকে হতে শুরু করে।
এরপর কংগ্রেস যত দুর্বল হয়েছে, ততই সে জোট রাজনীতিকে অগ্রাহ্য করতে শুরু করেছে। রাহুলকে দেখলে তারাশঙ্করের ‘জলসাঘর’ কাহিনির বিশ্বম্ভর রায়ের কথা মনে পড়ে। বিশ্বম্ভর যেমন বাস্তব পরিস্থিতিকে অস্বীকার করে অতীতের স্মৃতি ও অহংকারকে আশ্রয় করে বাঁচতে চেয়েছিলেন, আজ গান্ধী পরিবারের মানসিকতাও তাই। রাহুল মাটিতে নেমে আসতে পারেননি। মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে গিয়েছেন। তাই দেশের বিভিন্ন বিরোধী শক্তির সঙ্গে তার হাত মেলাতে ইগোয় লাগে। অথচ পশ্চিম বাংলায় যে সিপিএম তাদের সব থেকে বড় শত্রু ছিল, যে সিপিএম এক সময় দেওয়ালে দেওয়ালে তাঁর দিদিমা ইন্দিরাকে ‘ডাইনি’ সাজিয়ে কুৎসা করেছিল, তাঁর বাবাকে ‘কাটমানি খোর’ সাজিয়েছিল, যে সিপিএম একসময় কংগ্রেস কর্মীদের খুন করে, মেরে পিটিয়ে ছাতু করে দিয়েছিল, তাদের সঙ্গে তারা হাত মেলাল। তাতে যা হওয়ার তাই হল। পুরনো মার খাওয়া কর্মীরা কংগ্রেসের প্রতি ঘৃণায় মমতার আঙিনায় ভিড় করলেন। পাশাপাশি আপন স্বার্থসিদ্ধি করার উদ্দেশে অধীর চৌধুরী এই রাজ্যে কংগ্রেসকে কার্যত পথে বসালেন। এখন রাজ্যে দুই সর্বস্বান্ত দল সিপিএম আর কংগ্রেস ঘরে বসে লুডো খেলে। সিপিএম তবু সোশ্যাল মিডিয়ায় তার লড়াই লড়াই ড্রামা চালু রেখেছে। কিন্তু কংগ্রেস সম্পূর্ণ দেউলিয়া।
বর্তমান রাজনীতিতে সত্যিই যদি কংগ্রেস আত্মহননে মেতে থাকে, তাহলে সেটা হবে বিজেপির পক্ষে সবথেকে বড় আশীর্বাদ। মাঝে মাঝে রাহুলের কাজকর্ম দেখে মনে হয় কংগ্রেস বোধহয় এখন বিজেপির বি টিম। তিনি গুজরাতে গিয়ে দলকে চাঙ্গা করার বদলে হতোদ্যম করলেন। বললেন, ‘দলের অনেকে বিজেপির হয়ে কাজ করছে।’ রাহুল ঠিকই বলেছেন। তবে বললেন না, এই ব্যর্থতার দায় একমাত্র তাঁর দুর্বল নেতৃত্বের।
বিজেপিও কিন্তু সুকৌশলে নেমেছে। একদিকে নেহরু পরিবারের নামে কুৎসা। অন্যদিকে ভ্রান্ত ইতিহাসের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে স্বাধীনতা আন্দোলনে উজ্জ্বলতর ভূমিকা ছিল সাভারকর সহ তৎকালীন বিতর্কিত হিন্দুত্ববাদী নেতাদের। গোয়েবলস থিওরির মতো তারা বারবার অসত্য ঘটনাগুলিকে সত্য বলে প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। কথায় আছে দশচক্রে ভূতও একদিন ভগবান হয়ে উঠতে পারে।
যদি কেউ ভাবেন, মোদির লক্ষ্য শুধু কংগ্রেসকে ফিনিশ করা, তাহলে সেটা হবে মস্ত বড় ভুল হবে। মোদির পরবর্তী লক্ষ্য আঞ্চলিক দলগুলিকেও ফিনিশ করা। বন্ধু সেজে সেই কাজ শুরু করে চলেছেন মোদি। বিজেপির দীর্ঘদিনের বন্ধু নবীনবাবুর বিজেডি প্রায় শেষ। সুযোগ পেলে নীতীশের দলকেও মরণ কামড় দেবে বিজেপি। শুধু তাল খুঁজছে। চন্দ্রবাবু নাইডুকে একটু খেলিয়ে ডাঙায় তুলতে চাইছে তারা। আপাতত ভেট দিয়ে তোষণ করে মোক্ষম সময়ের অপেক্ষা। সারা দেশের রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, বিজেপির বিভিন্ন অশুভ স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করার জন্য, প্রতি পদক্ষেপে তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো একজনই সমকক্ষ নেতা রয়েছেন দেশে। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর শক্তি রাজ্যের জনগণ।
বাঙালি জানে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে গুটকা আধিপত্য বাড়বে। রাজ্যটা কয়েক বছরের মধ্যে দ্বিতীয় উত্তরপ্রদেশ বা বিহার হয়ে যাবে। হিন্দিভাষীর রক্তচক্ষুর সামনে বাঙালিকে কেঁচো হয়ে থাকতে হবে। বাঙালির অস্মিতা পাপোশে গড়াগড়ি খাবে। স্বীকার করে নিতে হবে আধুনিক বিজ্ঞানের সবকিছু ‘ব্যাদে’ আর রামায়ণ, মহাভারতে আছে। তাই চারিদিকে ধর্মের বিষ নিঃশ্বাসের মাঝেও বাঙালি তার জাত্যভিমান বজায় রাখার চেষ্টা করে চলেছে। এই আত্মগরিমাটুকু বাঙালি অনুভব করতে না পারলে কালের গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে যাবে তার পরিচয়, তার ইতিহাস, তার সংস্কৃতি। এই লড়াই বাঙালিকে জারি রাখতেই হবে।