Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাধু

রাধুকে নিয়ে মায়ের একটা পাতলা-আমি খেলা করেছিল। মাকে দীর্ঘ সময় শেষরাত্রে ধ্যানসীমা বা বেলা হলে পুজোর আসনে একমনা হয়ে পুজো করতে যাঁরাই দেখেছেন তাঁরাই জানেন, সেই সেই সময়ে রাধু-টাধু কোনো কিছুর ওপরই তাঁর পরোয়া থাকত না।

রাধু
  • ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাধুকে নিয়ে মায়ের একটা পাতলা-আমি খেলা করেছিল। মাকে দীর্ঘ সময় শেষরাত্রে ধ্যানসীমা বা বেলা হলে পুজোর আসনে একমনা হয়ে পুজো করতে যাঁরাই দেখেছেন তাঁরাই জানেন, সেই সেই সময়ে রাধু-টাধু কোনো কিছুর ওপরই তাঁর পরোয়া থাকত না। সম্পূর্ণ অন্য মানুষই তখন। যাঁরা একটু তীক্ষ্ণ লক্ষ্য রাখতেন মার ওপর, তাঁরা প্রত্যেকেই এ জিনিস বোধে বোধ করেছেন। মা তখন নিজের মধ্যে নিজে, হৃদি রত্নাকরের অগাধজলে ডুব দিয়েছেন। বাইরে থেকে দর্শনেই মালুম হতো। রাধু নিয়ে ন্যাতা জোবড়া ঘর-গেরস্তর মহিলা, এ মেয়ে নয় আসলে। মার এই পাতলা পরদা মোটেই মোটা-আমি নয়। আর মনে রাখা চাই, ছেচল্লিশ বছর বয়েসে পাকাপোক্ত মা রাধুকে হাতে নেন। তার ভার নেন। শ্রীগুরুকে যেন বললেন, প্রভো দিলে যে ভার, নিলেম এবার।

Advertisement

খেলাশেষে লীলাময়ী এক নিমেষে তাসের ঘর ভাঙার মতন রাধুর ওপর থেকে মন তুলে নিলেন ফস করে। ডুবকি ফাটালেন। সম্পূর্ণ নিস্পৃহা। আর মার শরীর থাকবে না, আর মাকে রাখা যাবে না, বলতে বলতে শরীরী শরৎ টসটস করে চোখের জল ফেললেন। ভাবের খেলা, ভবের খেলা সাঙ্গ। তখন মা শেষ শয্যাসীনা তুরীয়া স্তরে। বিদ্যামায়া দৃঢ়হস্তে ছেদন। ওপর থেকে ‹কলিং বেল› আহ্বানের ঘণ্টি, তখন কর্তা টিপছেন। বাঁধনহারা দেবীদেহ তাঁর রাধাসূত্র ছিন্নভিন্ন করে তত্ত্বারূঢ়া। প্রাক্-রাধু যুগের যে মাতৃসত্তা, তার সঙ্গে তো আমরা একেবারেই একান্ত, সাক্ষাৎ সরাসরি অভিজ্ঞতা হতে বঞ্চিত। 
পরমা যোগিনীর ‘মন দেওয়াটা’-ও অনুপম। অসাধারণ। ‘তুলে নেওয়াটা’-ও তদ্রূপ। একই রকম। দুটোই মুঠোর মধ্যে। সাধ করে ছাইমাখা, মরজির মুটেগিরি। কুস্তির পয়লা নম্বর পালোয়ান। শারীর শক্তি তার যেমন করামলকবৎ। ১৯১০ থেকে সমবয়সি রাধুকে নানা অবস্থায় নানাভাবে দেখে এসেছি। কাঁচা মনে-মনে হয়েছিল, মার স্পর্শ বুঝি জীয়ন্তে রাধুর বৃথাই গেল। ইদানীং রাধুকে সর্বদাই খানিকটা আচ্ছন্ন, খাপছাড়া, এলোমেলো মনে হতো। ১৯২৯ সনে জয়রামবাটী দ্বিতীয়বার গিয়েছি। আমাদের মনও তখন খানিকটা রামধুনের গুণে (ধুনুরিতে যেমন পুনঃপুন তুলো ধুনে, তেমনই পুনঃপুন নামজপা। সেইরূপ, গোপালধুন) পেকেছে। আপাত এবং অন্তর্নিহিত-দুটোর তফাত বোধক্ষেত্রে উদয় হচ্ছে।
রাধুর নিস্পৃহতা দেখে, নির্লোভিতা দেখে অবাক। মার মহিমা চাক্ষুষ দেখে মনটা ভরপুর। রাধু তখন উনত্রিশে। হ্যাঁ, মায়ের বেটি বটে। ভক্তেরা কিছু টাকা প্রণামি দিতে উদ্যত। বিরক্তা, অত্যন্ত উত্ত্যক্তা বোধ করে রাধারানি বললেন, জোর গলায়-আমাকে ক্যানে, আমাকে ক্যানে, আমাকে ক্যানে? মন্দিরে মার কাছে দেনগে। কপর্দকও স্পর্শ করলেন না। রাধুর ভেতর মা তখন জ্বলজ্বল করছেন।
মার শতবার্ষিক জন্মোৎসবে সারা পৃথিবীতে যে ‘জয় মা, জয় মা’ রব উঠল, এটা কি পঞ্চতপাচারিণী মাকে মূল্যদান? না, আর কিছু? ঈশ্বরপিপাসু ও বিষয়পিপাসু সবার একজোট সমকণ্ঠ উচ্চারিত তারিফবাক্য শুনলাম। শেষের সংখ্যাই তো সংসারে সব যুগে বেশি।
স্বামী নির্লেপানন্দের ‘দেবী সারদামণি’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ