ছোট বড় টিলা, হালকা জঙ্গল আর সুবিশাল জলাধার নিয়েই দুর্গাডিহি। কলকাতা থেকে ঝটিকা সফরে যেতেই পারেন এখানে।
ছোট বড় টিলা, হালকা জঙ্গল আর সুবিশাল জলাধার নিয়েই দুর্গাডিহি। কলকাতা থেকে ঝটিকা সফরে যেতেই পারেন এখানে।
ছোটনাগপুরের মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে কংসাবতী বা কাঁসাই নদী পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পূর্ব মেদিনীপুর দিয়ে বয়ে গিয়েছে। আর তারপর এসে পড়েছে বঙ্গোপসাগরে। ১৯৫৬ সালে ভারত সরকার বাঁকুড়া, হুগলি ও তৎকালীন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার কৃষিকর্মের জন্য জল সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে কংসাবতী সেচ প্রকল্প চালু করে। তৈরি হয় পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিশাল ক্ষমতাবিশিষ্ট মুকুটমণিপুর বাঁধ এবং তৎসংলগ্ন জলাধার। ক্রমশ তা এক জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়।
আজকের নবোদয় পর্যটকস্থল এবং অনাবিষ্কৃত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা অঞ্চল দুর্গাডিহি আসলে মুকুটমণিপুরেরই অন্য একটি দিক। এটি মুকুটমণিপুর জলাধারের অন্য প্রান্তে অবস্থিত। এমন কিছু জায়গা থাকে যেখানে গেলেই মন ভালো হয়ে যায়। এই দুর্গাডিহিও তেমনই একটি। মনোরঞ্জন ও মন্ত্রমুগ্ধ করার জন্য এখানে আছে পাহাড়, জঙ্গল, আর নীল স্বচ্ছ জলাধার। সারা বছরই এখানে বেড়াতে আসা যায়, তবে শীতকালে এলে উপভোগ করতে পারবেন এখানকার দূষণমুক্ত জলবায়ু। এইসব কেন্দ্র করেই পর্যটকদের জন্য তৈরি হয়েছে আধুনিক মাথা গোঁজার আস্তানা ট্যুরিস্ট কটেজ। আর সবচেয়ে বড় বিষয়, জায়গাটা কলকাতা থেকে খুব দূর নয়।
সাঁতরাগাছি রেলস্টেশন থেকে ট্রেন ধরে চলে আসুন বাঁকুড়া রেল স্টেশন। এখান থেকে দুর্গাডিহি প্রকল্প সড়কপথে ৭৭ কিলোমিটার। স্টেশন থেকে গাড়ি ভাড়া করেই চলে আসতে পারেন দুর্গাডিহি পর্যটককেন্দ্রে। কলকাতা থেকে ট্রেন ও গাড়ি, সব মিলিয়ে সময় লাগবে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা।
জায়গাটি পুরুলিয়ার মানবাজার অঞ্চলের ২ নম্বর ব্লকের ধানকিডি গ্রামের কাছেই। সেখানে অবস্থিত দুর্গাডিহি পাহাড়ের (বা বলা চলে টিলা) উপর পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে দুর্গাডিহি পর্যটনকেন্দ্র। ছোট ছোট কটেজ তো আছেই, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার জন্য টেন্ট হাউসও বুক করতে পারেন।
জলাধারের কাছেই চিল্ড্রেনস পার্ক। এই অঞ্চলটি ছোট বড় ও মাঝারি মাপের টিলায় ঘেরা। আর সেইসব টিলার পায়ের কাছ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে শান্ত বিরাটাকার জলাধার। তারই মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট দ্বীপ। টিলার গা বেয়ে নীচে নামার জন্য রয়েছে পায়ে হাঁটা পথ। সেই পথ দিয়ে নেমে পৌঁছে যেতে পারেন জলাধারের একেবারে কিনারে। ছোট বড় পাথরে বিছানো রাস্তা। কোনওটার গায়ে হেলান দেওয়া যায়, কোথাও বা বসতেও পারেন। নাহলে ছোট পাথরে দাঁড়িয়ে জলে পা ডুবিয়ে রাখাও সম্ভব। সামনে শান্ত জলরাশি দু’চোখ ভরে উপভোগ করতে পারেন সেই শোভা।
টিলা আর জলে ঘেরা এই জায়গায় শীতে প্রচুর পাখিরও দেখা মেলে। সারা বছরই নানারকম পাখির দেখা মেলে, তবে শীতে তা বেড়ে হয়ে যায় দ্বিগুণ। কটেজে বসেই দেখতে পাবেন পাহাড়ের কোণে আর জলরাশির কোলে রঙের বাহার ছড়িয়ে অস্তমিত সূর্যের রূপ। রাতের আলোয় দুর্গাডিহি জলাধারের দৃশ্যও ভারি সুন্দর।
মুকুটমণিপুর জলাধারটি আয়তনে বিশাল। তাই আশেপাশের অনেক জায়গাই এর সংলগ্ন বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। একদিকে ঝাঁটি পাহাড়ি, মুকুটমণিপুর এবং দোলডাঙা। আর অন্যদিকে ধাধকিডি, আমজোড়া, জড়োবাড়ি অঞ্চল। দোলডাঙাও একটি পর্যটন কেন্দ্র। জায়গাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আদিবাসী সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। এখানে এলে আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনধারা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় হয়। এখানকার আদিবাসী বাড়িগুলোর ভিন্নরূপ নজর কাড়ে। এখান থেকেও কংসাবতী নদীর জলাধারে নৌকাবিহার ও পাশের জঙ্গলে ভ্রমণ করতে পারবেন। এছাড়া দোলডাঙা অঞ্চলে আছে বানপুকুরিয়া হরিণ সংরক্ষণ প্রকল্প। অরণ্য ও পশু যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের এই ডিয়ার পার্ক হতেই পারে আদর্শ ভ্রমণের ঠিকানা।
দুর্গাডিহির ধারেকাছে যাওয়ার আরেকটি জায়গা বুরুডি হয়ে জলাধার কিনারে গলাডল পর্যটনকেন্দ্র। দূরে পাহাড়ের সারি, মাঝে নীল স্বচ্ছ জলে টইটম্বুর জলাধার, আর এক পারে সবুজ শ্যামল সমতল ভূমি। অদ্ভুত সুন্দর নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে হলে গলাডলে আসতেই হবে।
শীতকালে এই অঞ্চলে ঠান্ডা বেশ ভালোই থাকে। তবে রৌদ্রোজ্জ্বল শুকনো ঠান্ডা। তবে বসন্তেও এই জায়গা খুবই মনোরম। ছোট ছুটিতে তাই অবশ্যই বেড়িয়ে আসতে পারেন ছোটনাগপুরের এই জায়গাগুলোয়।
সুমিত সেনগুপ্ত