নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দুপুর গড়াতেই রোদ নরম। একেবারে কালীপুজোর মতো আবহাওয়া। চারটে বাজতেই রোদ্দুর পুরোপুরি গায়েব। তারপরই আমহার্স্ট স্ট্রিটে আলোর উৎসব জমজমাট। মানুষের আনাগোনা শুরু। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই রং-বেরঙের আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল মধ্য কলকাতার ‘কালী-স্ট্রিট’। এসময় আমহার্স্ট স্ট্রিটকে এই নামেই ডাকছে সবাই।
সেই রাস্তায় ঠাকুর দেখার আকর্ষণে, মেলার টানে দুপুরের পর থেকেই ভিড়। যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় কলকাতা পুলিশ। সন্ধ্যা গড়িয়ে দীপান্বিতা অমাবস্যার রাত যত ঘন হয়েছে, ততই মানুষের ঢল বেড়েছে আমহার্স্ট স্ট্রিটে। এর সঙ্গে দস্তুরমতো পাল্লা দিয়েছে গিরিশ পার্ক, জানবাজার অঞ্চল। অন্যদিকে অভিযোগ, আনন্দ ফিকে করে দিচ্ছে শব্দবাজির অত্যাচার। পুলিশি নজরদারি থাকা সত্ত্বেও আলোর উৎসবে শব্দবাজির দাপটে অতিষ্ট প্রবীণ থেকে শিশু।
‘কালীপুজোর রাত কোনওভাবে মিস করা যায় না। আমরা যে যেখানেই থাকি কলকাতায় বাড়ি ফিরে আসি। ঠাকুর দেখা তো ছুতো, আসল তো মেলা ঘোরা। পা টনটন করলেও হাঁটা বন্ধ হয় না’— প্রায় আবেগপ্রবণ হয়ে বললেন এক প্রৌঢ়া। তাঁর নাম অগ্নিবীণা চট্টোপাধ্যায়। বয়স ৫৫ ছাড়িয়ে গিয়েছে। তিনি কলেজ স্ট্রিটের আদি বাসিন্দা। কিন্তু ছেলের চাকরি সূত্রে পুনেতে থাকেন। কালীপুজো, ভাইফাঁটা উপলক্ষ্যে এসেছেন মধ্য কলকাতায় বাপের বাড়ি। বললেন, ‘ছোট থেকে এখানেই বড় হয়েছি। কালীপুজো মানেই জিলিপি, পাঁপড় ভাজা চাই-ই চাই। এটা একটা ইমোশন।’ ভিন রাজ্যে থাকলেও প্রতিবার কালীপুজোয় বাপের বাড়ি আসেন। কলেজ স্ট্রিটের প্রৌঢ়ার থেকে অনেকটাই ছোট সাগ্নিক মণ্ডল। হেদুয়াতে থাকেন তিনি। রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নিয়েছেন সন্ধ্যাতেই। তবে একেবারে ভরপেট নয়। তিরিশোর্ধ্ব সাগ্নিক বলেন, ‘বাইরে খেতে হবে তো। একটু তো পেট খালি রাখতেই হয়। ফাটাকেষ্ট দিয়ে ঠাকুর দেখা শুরু করি। সঙ্গে চলে মুখ। পাপড়ি চাট, ফুচকা, আইসক্রিম এন্তার চলে। মেলা দেখতে দেখতেই ঠাকুর দেখা হয়।’ এরইমধ্যে তাঁর স্ত্রী হাঁক দিলেন—‘দু’টো কাপ কিনব। এখানে দাম কম পড়বে।’
আলোর উৎসবে মেলার ভিড় বেড়েই চলেছে। পথে নামল বাড়তি পুলিশ। রাত ১০টা নাগাদ নর্থ ডিভিশনের ডেপুটি কমিশনার দীপক সরকার সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের নিয়ে একাধিক পুজোর নিরাপত্তা ও ভিড় সামলানোর ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখলেন। তবে অভিযোগ, এসব সত্ত্বেও নিরাপত্তার বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরোয় পরিণত হয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় শব্দবাজির ব্যাপক দাপট। বিশেষত শিয়ালদহ, মুচিপাড়া, জেলেপাড়া, বউবাজার চত্বরজুড়ে চকোলেট বোমার কানে তালা দেওয়া শব্দ। সর্বক্ষণ ভয়ে সিঁটিয়ে গৃহপালিত পশুরা। আমহার্স্ট স্ট্রিটে ভিড় যখন উপচে পড়ছে, তখন ভিড় জমেছে গিরিশ পার্কেও। অনেকেই রাতের শহরে বাইকে পুজো পরিক্রমায় বেরিয়েছেন। গভীর রাতে তাঁদের বেশিরভাগেরই মাথায় হেলমেট নেই।