বহু ভাষা, বহু ধর্মবর্ণ এবং বহু সংস্কৃতি নিয়েই ভারত। এত বিভিন্নতা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতার দ্যোতক নয়, বরং প্রতিটি ভারতবাসীর সম্পদ। এই সম্পদের ধারণাকে মূর্ত এবং সত্যে প্রতিষ্ঠিত করেছে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সৌন্দর্য। এজন্যই আমরা গাইতে পেরেছি বিবিধের মাঝে মহান মিলনের জয়গান। এমন বিরলপ্রায় সম্পদের রক্ষাকবচ আমাদের মহান সংবিধান এবং বহুদলীয় সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। অনেকগুলি প্রদেশ ও অঞ্চলকে সংহত করার মাধ্যমেই সার্বভৌম ও শক্তিশালী ভারত গঠিত হয়েছে। এই আদর্শ যুক্তরাষ্ট্র নির্মাণের নির্দেশ রয়েছে আমাদের সংবিধানে। সংবিধানের চোখে ভারত রাষ্ট্রের প্রতিটি অঞ্চল, প্রদেশ, ধর্ম, ভাষা এবং সংস্কৃতির মর্যাদা ও মূল্য সমান। রাষ্ট্রের কাছে কোনও এক বা একাধিক রাজ্য ও ভাষার গুরুত্ব বেশি কিংবা কম নয়। এমনকী কেন্দ্র প্রভু এবং রাজ্যগুলি তার আজ্ঞাবহ মনসবদার তাও নয়। কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলির সমন্বয়ের ভিত্তিতেই সুন্দর ভারত গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছে সংবিধান। এজন্য কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলির দায়িত্ব কর্তব্যও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে ওই মহান গ্রন্থে। তার ফলে রাজ্যে রাজ্যে এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিবাদ করার যুক্তিগ্রাহ্য কারণ কিছু নেই। বিভিন্ন ভাষী মানুষের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি বাধার অবকাশও দূর করেছে আমাদের এই অনন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা।
তা সত্ত্বেও দেশে একাধিক ইস্যুতে একাধিকবার অশান্তি হয়েছে। ইস্যুগুলির মধ্যে রয়েছে প্রাদেশিক সীমান্ত সমস্যা, নদীর জলবণ্টন এবং ভাষাগত আধিপত্য বিস্তারের বাসনা। ভাষা সংক্রান্ত বিবাদের শিকার হয়েছে দক্ষিণ ভারতের একাধিক ভাষা এবং বাংলা। মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পূর্ববঙ্গ এবং অসমে বাঙালি প্রাণ পর্যন্ত দিয়েছে। কিন্তু বাংলাভাষীদের বঞ্চনায় ইতি পড়েনি এখনও। সংখ্যার বিচারে ভারতে বাংলাভাষীদের স্থান দ্বিতীয়, হিন্দির পরেই। পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরার বেশিরভাগ মানুষের মুখের ভাষা বাংলা। এছাড়া অসমসহ সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল, আন্দামান, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা প্রভৃতি বহু অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ বঙ্গসন্তান বসবাস করেন। তারপরেও বহির্বঙ্গে বাংলাভাষীদের সঙ্গে অন্যায় ব্যবহারের কিছু অবাঞ্ছিত দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আসে। যেমন দিনকয়েক আগে, বাংলাদেশি সন্দেহে মহারাষ্ট্র থেকে মুর্শিদাবাদের তিনজন এবং পূর্ব বর্ধমানের এক বাসিন্দাকে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছিল। কী ছিল তাঁদের অপরাধ? ভিন রাজ্যেও তাঁরা তাঁদের মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলেছেন! তাঁদের পুশব্যাকের কাণ্ড ঘটানো হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে অন্ধকারে রেখেই। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এই ধরনের পদক্ষেপ বেআইনি, অন্যায় এবং অনৈতিক। জানামাত্রই বিষয়টিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হস্তক্ষেপ করেন। তারপর বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে আনা হয় ওই চারজন ভারতীয় নাগরিককে। এই অসভ্যতা সেখানেও শেষ হয়নি। শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার ‘অপরাধে’ এবার রাজস্থানেও ‘পুশব্যাক রাজনীতি’র শিকার হয়েছেন এরাজ্যের উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারের শ’তিনেক বাসিন্দা। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে তাঁদের রাজস্থানের ভিবাডিতে আটকে রাখা হয়। মহারাষ্ট্র কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছিল রাজস্থানেও। সৌভাগ্য যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা যথাসময়েই রুখে দিয়েছেন। ঘটনাটি সামনে আসামাত্রই তোপ দাগেন বাংলার নেত্রী। বিধানসভা ভবনে প্রসঙ্গটি তুলে ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিজেপির কাছে জানতে চাইছি, বাংলায় কথা বলাটা কি অপরাধ? ভারতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও ‘বাংলাদেশি’ দেগে দেওয়া হচ্ছে! দেড় কোটি পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছেন আমাদের রাজ্যে। সব রাজ্যের লোক এখানে কাজ করেন। আমরা তাঁদের অসম্মান করি না। অথচ শুধুমাত্র বাংলায় কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে আটকে দেওয়া হচ্ছে!’
ভাষাবিদ্বেষের এই ভয়ানক পরিস্থিতি কোনোভাবেই বরদাস্ত করা উচিত নয়, সমুচিত প্রতিবাদ হওয়া দরকার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য পুরনো ঝাঁঝেই ঘোষণা করে দিয়েছেন, ‘প্রতিবাদে পথে নামব।’ তবে এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত দেশের প্রতিটি কোণ থেকেই। কারণ বিপদটা বাংলার একার নয়, এই অন্যায় দেশের যেকোনও অঞ্চলের এবং যেকোনও ভাষার মানুষের ক্ষেত্রে হতে পারে। তাই দেশের ঐক্য, সংহতি ও সার্বিক শৃঙ্খলার স্বার্থেই প্রতিবাদ ধ্বনিত হোক এখনই এবং সর্বত্র।