Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সাফল্যের প্রচার ও বাস্তব সত্য

বিজ্ঞাপনের মোড়কে কীভাবে চরম লজ্জাকেও অনায়াসে ঢেকে ফেলা যায়, নরেন্দ্র মোদির সরকার তার জ্বলন্ত উদাহরণ হতে পারে। যে দেশের মূল ভিত্তি কৃষি, জনসংখ্যার ৮০-৮৫ শতাংশই কৃষিনির্ভর, তাদের চরম দুর্দশাকেও ‘কৃষির সাফল্য’ বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি।

সাফল্যের প্রচার ও বাস্তব সত্য
  • ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিজ্ঞাপনের মোড়কে কীভাবে চরম লজ্জাকেও অনায়াসে ঢেকে ফেলা যায়, নরেন্দ্র মোদির সরকার তার জ্বলন্ত উদাহরণ হতে পারে। যে দেশের মূল ভিত্তি কৃষি, জনসংখ্যার ৮০-৮৫ শতাংশই কৃষিনির্ভর, তাদের চরম দুর্দশাকেও ‘কৃষির সাফল্য’ বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। এবং এই ‘মনগড়া’ সাফল্যকে চড়া প্রচারের আলোয় এনে কার্যত ‘কৃষি বিপ্লব’-এর ডাক দিয়েছেন তিনি! ইতিহাস বলছে, স্বাধীনতার পর দেশজুড়ে তীব্র খাদ্য সঙ্কটের মোকাবিলায় ছয়ের দশকে ‘সবুজ বিপ্লব’-এর ডাক দেওয়া হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা। আমদানি নির্ভরতা কমানো। এর কৌশল হিসাবে উচ্চফলনশীল শস্যের ব্যবহার, সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, কৃষকের হাতে হাইব্রিড বীজ তুলে দেওয়া, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়। মূলত পাঞ্জাবে শুরু হওয়া এই বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রয়াত কৃষিবিজ্ঞানী এম এস স্বামীনাথন ছিলেন সবুজ বিপ্লবের জনক। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দারিদ্র্য দূর করা, ক্ষুধা নিবারণ, কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে এই পদক্ষেপ। সবুজ বিপ্লবের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে বহু বিতর্ক হলেও এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অবশ্য সবুজ বিপ্লবকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনতে চান না। তাঁর কাছে, দেশে কৃষির প্রসারে দু’দশক ধরে চলা সবুজ বিপ্লব, ভাকরা নাঙ্গাল থেকে একাধিক সেচ প্রকল্প কিংবা ২০০৭-এর জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের মূল্য শূন্য! তিনি বরং মনে করেন, জিএসটি’র হার কমে যাওয়ায় বহু কৃষিপণ্য ও উপকরণের  দাম কমে গিয়েছে। তাই দেশে কৃষি বিপ্লব আনা কঠিন নয়।

Advertisement

এই কৃষি বিপ্লবের পথে এগারো বছরে যে ‘সাফল্যের’ দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী, তাতে দগদগে ঘায়ের মতো জ্বলজ্বল করছে কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর দেওয়া তথ্য বলছে, ঋণের চাপ, কাজ হারানোর ভয়, পেশায় অনিশ্চয়তা, সংসারের অভাব এবং মানসিক অবসাদে ২০১৪-২০২২ সালের মধ্যে ন’বছরে দেশে লক্ষাধিক কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। তার পরের তিন বছরে সংখ্যাটা যে বেড়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তথ্য বলছে, মোদি জমানায় চাষের খরচের চেয়ে ফসলের দাম কম পাচ্ছেন চাষি। দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এখন জিএসটি’র হার কমায় কৃষক তার সুবিধা পাবেন— এমন আশা কেউ করছেন না।
সরকারের ‘সাফল্য’ দেখাতে কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল, ২০২২-এর মধ্যে কৃষকের আয় দ্বিগুণ করার। অথচ কৃষকদের আয় নিয়ে কোনও তথ্যই প্রকাশ করছে না কেন্দ্রীয় সরকার। সবচেয়ে বড় কথা হল, কৃষকের ফসলের ন্যূনতম ন্যায্য মূল্য আজও মেলেনি। উল্টে ২০২০ সালে কৃষক বিরোধী তিনটি আইন তৈরি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। এর বিরুদ্ধে দিল্লির উপকণ্ঠে তীব্র প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলেন কৃষকরা। ৩৮৪ দিন ধরে সেই উত্তাল আন্দোলন চলার পর মাথানত করতে বাধ্য হয় মোদি সরকার। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর তিনটি কৃষি আইনই বাতিল বলে ঘোষণা করে কেন্দ্র। তবে এই আইন বাতিল হলেও কৃষকদের হাল বিশেষ ফেরেনি। কৃষকদের মূল দাবি ছিল, স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) উৎপাদন খরচের চেয়ে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ বেশি ঘোষণা করতে হবে সরকারকে। এই মূল দাবি আজও পূরণ করেননি কৃষিতে সাফল্যের দাবি করা মোদি। তবু কৃষকদের অবস্থা ফিরেছে বলে দাবি করে চলেছে তাঁর সরকার! মাত্র কয়েকদিন আগেই কৃষি সংক্রান্ত কয়েকটি প্রকল্পের ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন, এর আগে কেন্দ্রের সব সরকার কৃষিক্ষেত্রকে উপেক্ষা করেছে। সেই কারণেই কৃষকদের অবস্থা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো হয়েছে। অতীতের ভুল তিনি সংশোধন করেছেন। বিগত এগারো বছরেই প্রকৃত কৃষি উন্নয়নের প্রকল্পগুলি ঘোষণা করেছে তাঁর সরকার। তিনিই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী, যিনি কৃষকদের উন্নয়নের কথা ভেবেছেন। এই চড়া দাগের প্রচারের আড়ালে তথ্যের যে মারপ্যাঁচ ও আসল সত্য গোপন করা হচ্ছে— তা জানেন, বোঝেন কৃষকরা। মোদিবাহিনী নিজেরা কবে এই সত্য ও বাস্তব পরিস্থিতিটা বুঝবেন— সেটাই দেখার। যদিও সেই সম্ভাবনা কম।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ