Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গরিব মারা অর্থনীতি

২০২৩ সালে মে মাসের গোড়ার দিকের কথা। নবান্নে পৌঁছেছিল দিল্লির এক হুকুমনামা।

গরিব মারা অর্থনীতি
  • ১৯ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

২০২৩ সালে মে মাসের গোড়ার দিকের কথা। নবান্নে পৌঁছেছিল দিল্লির এক হুকুমনামা। তাতে বলা হয়, মনরেগা বা ১০০ দিনের কাজে নজরদারি চালাতে প্রতিটি জেলায় একজন করে ন্যায়পাল নিয়োগ করতে হবে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া রাজ্যই সম্পন্ন করবে। মনরেগার কাজে নজরদারি চালাতে ন্যায়পালদের সবরকম সহযোগিতাও করতে হবে নবান্নকে। তদারকির কাজটি কীভাবে চলবে তাও বাতলে দেন দিল্লির মুরুব্বিরা। জানা গেল কর্তাদের আরও ফরমান, মনরেগার কাজ নিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েতভিত্তিক একটি করে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করতে হবে। তাতে থাকবেন এমপি, এমএলএ এবং ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের শীর্ষকর্তাগণ। যুক্ত করতে হবে পূর্ববর্তী নির্বাচনে পরাজিত নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও। কিছু ক্ষেত্রে সাংসদ ও বিধায়কের প্রতিনিধিও থাকতে পারেন। অভিযোগ থাকলে জবকার্ড হোল্ডারগণ এই গ্রুপে জানাবেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমস্ত অভিযোগের তদন্ত করবেন ন্যায়পালরা। উদ্দেশ্য, রাজ্যকে পরোয়া না করেই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ।

Advertisement

তবু গরিবের স্বার্থে কেন্দ্রীয় নির্দেশ মেনে রাজ্যের করণীয় নবান্ন দ্রুতই করেছিল। কিন্তু এত আয়োজন যে-কারণে, তার তো কোনও খোঁজ মেলেনি তখন। মনরেগার টাকা কোথায়? এই মোদ্দা প্রশ্ন সেদিনের, এখনও মেলেনি জবাব। তবে, একটু ভুলই বলা হল। কেননা, দিন কয়েক আগেই সংসদে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে সরকার বাহাদুরের এক প্রতিনিধি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘১০০ দিনের কাজে বাংলাকে কোনও টাকা মোদি সরকার দেবে না!’ উল্লেখ্য, মনরেগায় বাংলাকে টাকা দেওয়া বন্ধ করেছে দিল্লি দু’বছরের উপর। মনেরগার কাজ করেও বাংলার হাজার হাজার গরিব শ্রমিক দিল্লির টাকা পাননি। এই বাবদ বরাদ্দের নামগন্ধ নেই এবছরও! অথচ অর্থবর্ষ ২০২৪-২৫ শেষ হবে আর দিনকয়েক বাদেই। একে রসিকতা ছাড়া কী বলা যায়? কিন্তু বাংলার সঙ্গে দিল্লির রসিকতার যে এখানেই শেষ নয়! বাংলাকে মনরেগার পর্যালোচনা বৈঠকে ২০২৩-এর মে মাসে সাদর আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় সচিব রাজ্যকে চিঠি পাঠিয়ে ওই আমন্ত্রণ জানান। সমস্ত গ্রামোন্নয়ন প্রকল্পের মান ও অগ্রগতি নিয়ে বৈঠক ডাকা হলেও সর্বাধিক সময় রাখা হয়েছিল মনরেগার জন্য। মোদি সরকারের ‘মহামান্য’ আমলার চিঠিটি পাওয়ার পর নবান্নের কর্তাদের তো হা হতোস্মি দশা! যোগীরাজ্যের প্রতিনিধির পরেই না-হয় বলতে উঠবেন বাংলার প্রতিনিধি, কিন্তু তিনি বলবেনটা কী? বাংলার গ্রামে গ্রামে যে-প্রকল্পকে মোদি সরকার অকালমৃত্যু দান করেছে, তার অগ্রগতি নিয়ে কীই-বা বলার থাকতে পারে? গোড়ায় ভাবা হচ্ছিল, প্ল্যান করে বঞ্চনা করা হচ্ছে। পরে তার সঙ্গে আবিষ্কৃত হয়, মতলব মাফিক বাংলাকে অপদস্থ করার কেন্দ্রীয় সুবন্দোবস্ত। বাংলার গরিব মানুষগুলি যখন নিজেদের জ্বালায় জ্বলে মরছেন, তখন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়ার আয়োজন হয়েছিল আলোকোজ্জ্বল মঞ্চ থেকে। রসিকতা উপভোগ্য। তাতে মন খারাপ দূর হয়। কিন্তু রসিকতা ‘বিলো দ্য বেল্ট’ হলে তাকে ‘নির্মম’ বলা হবে না কি? মোদি সরকার সেই নির্মম রসিকতারই পুনরাবৃত্তি করেছিল।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ রাজ্যের সঙ্গে দুশমনি করতে করতে মোদি সরকারের আদত, নিয়ত দুটোই খারাপ হয়ে গিয়েছে। কাজের বাজারের বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে এই সরকার কমবেশি সারা ভারতেরই। বছরে ২ কোটি চাকরির গপ্পো খতম। করোনাকালে গরিবের পেট আর রাজকোষ বাঁচিয়েছিল কৃষিসহ গ্রামীণ অর্থনীতি। ‘অন্নদাতাদের’ সঙ্গে সরকার বস্তুত বৈরিতার সম্পর্ক গড়তে তৎপর। তার বিরূপ প্রভাব কৃষিতে আজ স্পষ্ট। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার জন্য মনমোহন সিং মনরেগা চালু করেছিলেন। করোনাকালে ভারত আত্মরক্ষা করেছিল তারই আশীর্বাদে। মহামারী মিটতেই মোদি সরকারের রোষে সেই মনরেগাই। স্বভাবতই দেশজুড়ে জোয়ার বেকারত্বে! গরিব মানুষ পেটের দায়ে ফের ১০০ দিনের কাজ পেতে মরিয়া। গত ছ’মাসের প্রবণতায় তা স্পষ্ট—১৫ কোটির বেশি শ্রমিক এই প্রকল্পে কাজের আবেদন করেছেন। চলতি অর্থবর্ষের শেষ ত্রৈমাসিকে লক্ষ করা গিয়েছে রেকর্ড চাহিদা। শুধু গত জানুয়ারিতেই আবেদনকারীর সংখ্যা হয়েছে ২.৭০ কোটি! অর্থাৎ কাজের হাহাকারে জোড়া রেকর্ড গড়েছে মোদির ভারত। অর্থবর্ষের অন্তিম ক’দিনে চেহারাট‍া আরও কেমন ভয়ংকর হয়, তা নিয়েও নিশ্চয় উদ্বেগে রয়েছে কেন্দ্র। নতুন নতুন কয়েকজন ধনপতি সৃষ্টির আহ্লাদ ছেড়ে গরিবের দুর্দশা হ্রাসের নীতি নিলে অবশ্যই এদিন দেখতে হতো না। সংগত কারণেই গুরুত্ব পেত মনরেগা এবং গরিবের হাতে নগদ জোগান বৃদ্ধির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু, হায়! গেরুয়া রাজনীতি মহৎ যে তার বিপরীত মেরুতে অবস্থানে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ