Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গরিব হচ্ছে রাজনীতির বলি

গরিব হচ্ছে রাজনীতির বলি
  • ১৩ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

এতদিন প্রশ্নটা তুলছিল রাজ্যের শাসক দল, প্রশাসনের মাথারা। এবার কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ কার্যত একই প্রশ্ন তুলে মোদি সরকারের কাছে কৈফিয়ত চাইল। প্রশ্নটা হল, ১০০ দিনের কাজে কোনও কোনও জেলায় কিছু দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় কেন গোটা রাজ্যে এই প্রকল্পে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেবে কেন্দ্রীয় সরকার? ‘মনরেগা’ বা বছরে ন্যূনতম ১০০ দিনের কাজ হল একটি গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প। ইউপিএ আমলে চালু হওয়া এই প্রকল্পের পুরো আর্থিক দায়িত্ব সামলায় কেন্দ্রীয় সরকার। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্পের অর্থ নিয়ে ‘দুর্নীতির’ অভিযোগ ওঠায় ২০২২ সালের ৯ মার্চ থেকে প্রকল্পের টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে মোদি সরকার। এই নিয়ে জনস্বার্থে মামলা হলে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে হাইকোর্ট। সেই কমিটি আদালতে রিপোর্ট পেশ করে জানিয়েছে, রাজ্যের চার জেলা হুগলি, পূর্ব বর্ধমান, মালদহ ও দার্জিলিং-এ এই প্রকল্পে মোট ৫ কোটি ৩৭ লক্ষ টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটি ৩৯ লক্ষ ৬২ হাজার টাকা উদ্ধারও হয়েছে। এই রিপোর্ট দেখে প্রধান বিচারপতি বিস্ময় প্রকাশ করে কেন্দ্রের প্রতিনিধির কাছে জানতে চান, চার জেলায় দুর্নীতি হলে কেন রাজ্যের বাকি জেলাগুলিতে প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাবে না! উদ্ধার হওয়া টাকা প্রকৃত উপভোক্তাদের মধ্যে বণ্টন করতে অসুবিধা কোথায়? সেই প্রশ্নও তোলে ডিভিশন বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, এ রাজ্যে ১০০ দিনের কাজ চিরতরে বন্ধ হতে পারে না। দুর্নীতির আশঙ্কা থাকলে প্রকল্পের কাজে সরাসরি নজরদারি চালাক কেন্দ্র। প্রয়োজনে কোনও বিশেষ অফিসারকেও নিয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু যেখানে অভিযোগ নেই সেখানে কেন চালু হবে না এই প্রকল্প? কেন্দ্রকে এই নিয়ে তিন সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট দিতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। 

Advertisement

এ রাজ্যে ১০০ দিনের কাজে যে কিছু কিছু গরমিল হয়েছিল তা আগেই মেনে নিয়েছিলেন প্রশাসনের শীর্ষকর্তারা। প্রকল্পের কাজ খতিয়ে দেখতে একাধিকবার রাজ্য সফরে এসে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি দল যেসব শর্ত ও পরামর্শ দিয়েছে তা সবই মেনে চলেছে রাজ্য। তবু তিন বছর ধরে বকেয়া টাকা পাঠানো বন্ধ, টাকার অঙ্কে যা প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। বকেয়া মেটাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী সহ কেন্দ্রের কাছে তদ্বির করেছেন। তৃণমূলের সাংসদরা সংসদ ভবনের সামনে ধর্নায় বসেছেন। অতি সম্প্রতি কেন্দ্রের গ্রামোন্নয়ন ও পঞ্চায়েতি রাজ বিষয়ক সংসদের স্ট্যান্ডিং কমিটিও অবিলম্বে বকেয়া মেটানোর সুপারিশ করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। বিস্ময়ের কথা হল, এই একই অভিযোগ বিজেপি শাসিত কিছু রাজ্যের বিরুদ্ধে উঠলেও সেখানে একদিনের জন্যও টাকা পাঠানো বন্ধ হয়নি! গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের রিপোর্টেই বলা হয়েছে, বিজেপির ‘ডাবল ইঞ্জিনের’ ১৫টি রাজ্যে (এর মধ্যে তিনটিতে এনডিএ সরকার) মোট দুর্নীতির পরিমাণ ১১১ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজ্য গুজরাত রয়েছে, কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের মধ্যপ্রদেশও রয়েছে। এই ১৫টি রাজ্য থেকে উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ টাকা! আর পশ্চিমবঙ্গে দুর্নীতির পরিমাণ ৫ কোটি টাকা বলে অভিযোগ। তার অর্ধেক উদ্ধারও হয়েছে। তবু এখানে টাকা পাঠানো বন্ধ হয়েছে নানা অছিলায়! 
আসলে বিমাতৃসুলভ আচরণের উত্তর প্রশাসনিক নিয়মে নেই, আছে রাজনীতিতে। স্পষ্ট উদ্দেশ্য হল, বিরোধীশাসিত পশ্চিমবঙ্গকে প্যাঁচে ফেলা, জনমানসে হেনস্তা করা। সন্দেহ নেই, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সত্ত্বেও কদর্যতার নিরিখে এই রাজনীতি মোদি সরকারকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে। ১০০ দিনের কাজে বকেয়া না মেটানোর মানে সরাসরি গরিব, প্রান্তিক মানুষের পেটে লাথি মারা। অথচ সবকা সাথ, সবকা বিকাশের বিজ্ঞাপন দিয়ে সেই চরমতম অন্যায় কাজটাই করে চলেছে মোদি সরকার। রাজনৈতিক অস্ত্রকে প্রশাসনিকভাবে ব্যবহার করছে নির্লজ্জের মতো। যদিও এসব করেও ফসল তুলতে ব্যর্থ মোদি সরকার। ১০০ দিনের প্রকল্পে বকেয়া বন্ধ করার পর এ রাজ্যে পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচন হয়েছে। দুটি ভোটেই কেন্দ্রীয় বঞ্চনার উপযুক্ত জবাব দিয়েছে এ রাজ্যের মানুষ। পাশাপাশি দিল্লিকে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে ১০০ দিনের কর্মরত শ্রমিকদের ন্যায্য বকেয়া মেটানোর দায়িত্ব তুলে নিয়েছে নবান্ন। সব জবকার্ড হোল্ডারদের বছরে ৫০ দিন কাজের গ্যারান্টি দিতে কর্মশ্রী প্রকল্প চালু করেছে রাজ্য। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, যদি অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুধাবন করে ১০০ দিনের কাজ সহ বিভিন্ন প্রকল্পে রাজ্যের প্রাপ্য মেটাতে মোদি সরকার তৎপর হয়, তবু কিছুটা মুখরক্ষা হলেও হতে পারে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ