প্রীতম দাশগুপ্ত: ফ্রান্স পারে, আমরা কেন পারি না? উত্তর নেই। গত ১০০ বছর ধরে প্যারিসের বিখ্যাত সিন নদীতে স্নান নিষিদ্ধ ছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে গিয়েছে গত জুলাই মাসে। সেখানে মনের আনন্দে সাঁতার কেটেছেন কয়েক হাজার মানুষ। সিন নদীর দূষণ যদি কমানো সম্ভব হয়, তবে গঙ্গা-যমুনার দূষণ কেন কমবে না? উত্তর জানা নেই।
উত্তরপ্রদেশের বারাণসী। গঙ্গার তীরে অবস্থিত এই শহর থেকেই ২০১৪ সালের মে মাসে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি। শুধু সাংসদই নন, হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীও। তারপরই মোদিকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘মা গঙ্গার সেবা করাই আমার ভাগ্যের লিখন।’ ওই বছরই নিউ ইয়র্কের ম্যাসিডন স্কোয়ার পার্কে প্রবাসী ভারতীয়দের এক সভায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি এই নদীকে আমরা পরিষ্কার করে তুলতে পারি, তাহলে দেশের ৪০ শতাংশ মানুষের বিরাট উপকার হবে। তাই গঙ্গাকে পরিষ্কার করার কাজটি এক ধরনের অর্থনৈতিক কর্মসূচিও।’ যেমন কথা তেমন কাজ। তৎপর মোদিজি রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে ২০১৪ সালের জুলাই মাসে একটি নতুন প্রকল্পের কথা ঘোষণা করলেন। নাম দিলেন ‘নমামি গঙ্গে’ (নদীকে প্রণাম)। তবে মোদিজির সবকিছুতেই যেমন চমক থাকে, এই প্রকল্পও তেমনই একটি চমক। যেমন পূর্বতন ইউপিএ সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিকেই ভিন্ন নামে উপস্থাপন করার একটা প্রবণতা তাঁর রয়েছে। নমামি গঙ্গেও তাই। ইউপিএ আমলে ২০০৯ সালে ছিল মিশন গঙ্গা। সেটাই নাম পাল্টে দিয়ে এমনভাবে নতুন মোড়ক দিয়ে নমামি গঙ্গে বলা হল, যেন মনে করা হয় নতুন কিছু তিনি ঘোষণা করছেন। তাও সেটা মেনে নেওয়া গেল। মনে হয়েছিল, মিশন গঙ্গা তেমন সাফল্য যখন পায়নি, নমামি গঙ্গে নিশ্চয়ই পাবে। তারপর আবার মোদিজি যখন বললেন এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য একটাই। যে সব রাজ্য দিয়ে গঙ্গা প্রবাহিত হয়, সেই সব রাজ্যে গঙ্গাকে দূষণ মুক্ত করা। মনে হয়েছিল, এবার বোধহয় কিছু একটা হবে। এই উদ্দেশ্যে প্রথম বছরের বাজেটেও ২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দও করেছিল মোদি সরকার। পরের পাঁচ বছরের জন্য বাজেটে বরাদ্দ হয়েছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। সব টাকাই দেবে কেন্দ্রীয় সরকার। ঠিক হয়েছিল এই প্রকল্পের মাধ্যমে নিকাশি (সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট) পরিকাঠামো তৈরি করা, নদীপৃষ্ঠ পরিষ্কার করা, জৈব বৈচিত্র্য রক্ষা করা, বনসৃজন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, রিভার ফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট, ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল এফ্লুয়েন্ট মনিটারিং প্লান্ট তৈরি এবং গঙ্গা-গ্রাম তৈরি করা। পাঁচ বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ২০২০ সালে মিশন-২ নামে ফের ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দের কথা ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় সরকার। এবার বলা হল, ২০২৬ সালের মধ্যেই লক্ষ্যপূরণ করা হবে। কিন্তু ঘটনা হল, প্রকল্প ঘোষণার ১০ বছর পরেও দেখা যাচ্ছে, ভারতবাসীর ভাগ্য বদলায়নি। গঙ্গার দূষণ পরিস্থিতি বরং আগের চেয়ে খারাপই হয়েছে। সম্প্রতি মোদি সরকারের জলশক্তি মন্ত্রক বাজেট-বরাদ্দ খরচের যে তথ্য সামনে এনেছে তাতে এটা স্পষ্ট যে, প্রধানমন্ত্রীর নমামি গঙ্গে প্রকল্পটি একটি ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাঁর নমামি গঙ্গে প্রকল্পের কথা শুনলে মনে হবে, বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরির প্রতিশ্রুতি কিংবা প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা নগদ দেওয়া বা কালো টাকা বা জাল নোট বন্ধের মতোই এটাও দেশবাসীকে দেওয়া ভাঁওতা। তাঁর মুখের কথার সঙ্গে বাস্তবের মিল চেষ্টা করলেও পাওয়া যাবে না। এখন বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত ১০টি নদীর নাম নিলে তার মধ্যে থাকবে আমাদের গঙ্গা ও তার প্রধান উপনদী যমুনা। অথচ এই দুই নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে কত জনপদ। দিল্লি, কলকাতা সহ কত বড় বড় শহর। কত মানুষের রুটিরুজিও নির্ভর করে এই নদীগুলিকে কেন্দ্র করে। প্রধানমন্ত্রী সঠিকভাবেই বলেছিলেন, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির ভিত গড়ে উঠবে এই প্রকল্পের মাধ্যমে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু না হওয়ায়, সবটাই মাঠে মারা গিয়েছে।
সরকারের দেওয়া তথ্য বলছে, ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা বা নমামি গঙ্গে প্রকল্পে গত ১০ বছরে সরকার বাজেটে যা অর্থ বরাদ্দ করেছে, তার অর্ধেকও খরচ হয়নি। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। সংসদেই সরকার জানিয়েছে, প্রথম বছর ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে ৯২ শতাংশ অর্থ খরচ করা যায়নি। পরের অর্থবর্ষে তা কমে হয় ৭৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবর্ষেও ৪০ শতাংশ অর্থ খরচ করতে পারেনি মোদি সরকার। গত ১০ বছরে সবমিলিয়ে খরচ হয়েছে মাত্র ৫১ শতাংশ অর্থ। অর্থাৎ খরচ হয়নি গড়ে ৪৯ শতাংশই।
প্রধানমন্ত্রী মোদিজি মুখে যা বলেছেন, তা যে সমর্থনযোগ্য সেটা তো সবাই বলবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই কেন? সরকার মোদিজির সাধের নমামি গঙ্গে প্রকল্প নিয়ে যে প্রচারে খামতি রেখেছিল এটা তো বলা যাবে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সাফল্য এল না কেন? অথচ, তথ্য বলছে, এই প্রকল্পের নামে মুনাফা কামিয়ে নিয়েছেন বেশ কয়েকজন মোদি ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি। আর সাধারণ মানুষ? সেই তিমিরেই।
গঙ্গা দূষণ নিয়ে এই অভিযোগকেই যেন মান্যতা দিয়েছে জাতীয় পরিবেশ আদালত। যে উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি গঙ্গা নিয়ে তাঁর আবেগ ও পরিকল্পনার কথা শুনিয়েছিলেন, সেই রাজ্যের প্রয়াগরাজেই সম্প্রতি আয়োজিত হল মহাকুম্ভ। সেখানে স্নান করা নিয়ে উদ্বেগের কথা শুনিয়েছিল পরিবেশ আদালতও।
এই চিত্র তো গঙ্গার। তার প্রধান উপনদী যমুনার হাল বোধহয় আরও খারাপ। দেশের রাজধানী দিল্লির লাইফ লাইন এই নদী। অথচ কী করুণ দশা। যমুনা দূষণ নিয়ে আপ আর বিজেপির আকচা-আকচি কম হয়নি। কিন্তু তাতে দূষণ কমেনি। বিশেষ করে ছট পুজোর সময় যমুনায় বিষাক্ত ফেনা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে সকলকে সেখানে নামতেই বারণ করা হয়েছিল। যমুনার দূষণের প্রভাব সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যে এবং কৃষিকাজে। মনে আছে, গত বছর যমুনায় স্নান করে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল বিজেপি নেতা সচদেবকে। এখন দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ ও হরিয়ানা—তিন রাজ্যেই বিজেপি সরকার। কেন্দ্রেও। তিন রাজ্যকে নিয়ে টাস্ক ফোর্স গঠন করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সবই হচ্ছে। কিন্তু আসল কাজ যেটা, মানে দূষণ রোধ, সেটাই হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডই বলেছে, দিল্লির ৩৬টি নিকাশি ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মধ্যে ২৬টিই অনুপযুক্ত। যমুনা দূষণ রোধে ক্রুসেডার হিসেবে কাজ করছেন ৪১ বছরের বরুণ গুলাঠি। তাঁর কথায় দিল্লির এ ধরনের প্রতিটি শিল্পতালুক দৈনিক ৫-১০ লক্ষ লিটার দূষিত জল যমুনায় পাঠাচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে ক্ষতিকর সালফার, অ্যামেনিয়া ও ফসফেট। যমুনা পরিষ্কারে দুর্নীতির অভিযোগে সরব হয়েছিলেন গুলাঠি। যমুনা নিয়ে কাজ করা আর এক সমাজকর্মী পঙ্কজ কুমারের কথায়, সরকার যদি এই গতিতে কাজ করে, তবে কোনওদিনই যমুনা দূষণমুক্ত হবে না। তিনি সাফ জানিয়েছেন, দূষণ ঠেকানোর যেসব কথা বলা হয়, তার ৮০ শতাংশই শুধু কাগজে কলমে থাকে। বাস্তবে তা চোখে পড়ে না।
মুদ্রার উল্টো পিঠটা এবার দেখুন। ফ্রান্সের সিন নদী। গঙ্গার মতোই এই নদীর গুরুত্ব রয়েছে ফরাসি জনজবীনে। ফরাসি সংস্কৃতি বা ফরাসি জাত্যভিমানের কেন্দ্রে এই নদী। গঙ্গা যেমন দেবীর নামানুসারে, সিনও তাই। রোমান দেবী সিক্যুয়ানার নামে। ফ্রান্সের ২৭টি প্রশাসনিক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় সিন নদী। বিখ্যাত আইফেল টাওয়ার থেকে শুরু করে নোটারডাম ক্যাথেড্রাল রয়েছে এই নদীর পাশেই। ১৯২৩ সালের পর এই নদীতে জনসাধারণের সাঁতার নিষিদ্ধ ছিল। কারণ দূষণ। গত জুলাই মাসে এই নদী আবার সাধারণের সাঁতারের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ১০০ বছর পরে উঠেছে নিষেধাজ্ঞা। এই উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। প্যারিসের তৎকালীন মেয়র জ্যাক চিরাক এই ভাবনা নিয়েছিলেন। তবে কাজ তেমন এগয়নি। গত বছর ছিল প্যারিসে বসেছিল ওলিম্পিক্সের আসর। বস্তুত ওলিম্পিক্সকে কেন্দ্র করেই রাজসূয় যজ্ঞ শুরু হয় ফ্রান্সে। ২০১৮ সালে এই নদীকে দূষণমুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বাজেট ধরা হয় ১৬০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ওলিম্পিক্সের আগে সিন নদীকে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। মূলত অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণেই সেবার উদ্যোগ মাঠে মারা যায়। তার মধ্যেও অবশ্য ইভেন্ট সম্পন্ন হয়েছিল। ওলিম্পিক্সের পরও কাজ থমকে যায়নি। তার ফল মিলল হাতেনাতে। বেশিদিন অপেক্ষা করতে হল না। সেই কাজ সম্পূর্ণ হল চলতি বছরের জুলাইয়েই। মেয়র অ্যানি হিদালগো সিন নদীতে সাঁতার কেটে ঘোষণা করলেন মিশন সাকসেসফুল।
‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?’—সেই এক শতাব্দী আগে কবি কুসুমকুমারী দাশ লিখে গিয়েছিলেন ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতাটি। নিখাদ বাংলা ভাষাতেই। সোজা কথায় মুখে ভাষণ না দিয়ে কাজ করে দেখানোর কথা বলেছিলেন কবি। আমাদের দুর্ভাগ্য ১০০ বছর পরেও আমরা সেই ভাষণেই ভর করে চলেছি। প্রতিটি ভাষণেই শুধু হেন করেঙ্গা, তেন করেঙ্গা। কিন্তু সাফল্য কিছুই নেই। তাই ফ্রান্স মাত্র সাত বছরে সফলভাবে নদী দূষণমুক্ত করতে পারে। আমরা শুধু বাগাড়ম্বর করতে পারি। কাজের কাজ করতে পারি না।