নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: শহরের পুজো মণ্ডপ যাঁদের সুনিপুণ কারিকুরিতে আলোয় ভাসে, সেই আলোর কারিগরদের ঘরেই চাপা অন্ধকার। বিভিন্ন জেলায় বসবাসকারী আলোক শিল্পীদের সঙ্গে কারিগররাও প্রায় দু’মাস হল ঘরছাড়া। তাঁদের এখন অস্থায়ী ঠিকানা কলকাতার বিভিন্ন নামকরা মণ্ডপ। সেখানে দিনরাত এক করে তাঁরা ব্যস্ত আলোর সাজে শহরবাসীকে মাতোয়ারা করতে। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ কেবল মোবাইল ফোনে। প্রিয়জনদের দেখার ইচ্ছা হলে ভিডিও কলই একমাত্র মাধ্যম। দুর্গাপুজোয় যা উপার্জন হয়, তা দিয়ে নতুন জামাকাপড় কিনে লক্ষ্মীপুজোর পর ঘরে ফেরেন তাঁরা। পরিবারে আসে খুশির হাওয়া।
আলোর কারিগরদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই জানা গেল তাঁদের জীবনের নানা কথা। উত্তর কলকাতার একটি পুজো মণ্ডপে কথা হচ্ছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার লক্ষ্মীকান্তপুর ও কুলপির বাসিন্দা যথাক্রমে রাকেশ হালদার ও রঘুনাথ প্রামাণিকের সঙ্গে। তাঁদের কথায়, বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তাই পড়াশোনা খুব একটা হয়নি। পেটের টানে ছোট বয়স থেকেই লেগে গিয়েছি ইলেকট্রিকের কাজে। এই কাজ করতে করতে কখন যে এই শিল্পের প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে, বুঝিনি। সেই ভালোবাসা থেকেই কাজ করে চলেছি বছরের পর বছর। তাঁরা বলেন, আলোর রোশনাইয়েও চলছে প্রতিযোগিতা। সেকথা মাথায় রেখেই যতটা ভালো কাজ করা সম্ভব, তা করার চেষ্টা করছি। রঘুনাথ প্রামাণিক এক ধাপ এগিয়ে বলেন, কাজ ভালো হলে মালিকের কাছ থেকে কিছুটা টাকা বেশি মিলবে। তেমনই কাজটাও টিকে যাবে। পুজো যত এগিয়ে আসছে, ততই কাজের চাপ বাড়ছে। প্রতিদিনই ঘুমোতে ঘুমোতে রাত গভীর হয়ে হচ্ছে। আবার সকালে উঠেই নামতে হচ্ছে কাজে। মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে ফোন এলে মনটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে। কিন্তু কী আর করা যাবে! পেট বড় বালাই!
হুগলির তারকেশ্বরের বাসিন্দা বিকাশ বাউরি শ্যামপুকুরের একটি পুজো প্যান্ডেলে একমনে রকমারি আলোর কাজ করছিলেন। তিনি বলেন, ঠিক মতো আলোর কাজ ফুটিয়ে তুলতে না পারলে দর্শকদের যেমন ভালো লাগবে না, তেমনই নিজেদের মনঃপুত হবে না। তাই যতটা সম্ভব নিখুঁত করার চেষ্টা করি।
শহরতলির নীলমণি মিত্র রো’তে সরকার বাগান স্পোর্টিং ক্লাবের অন্যতম কর্তা দেবজ্যোতি দে বলেন, ‘ওনাদের পরিশ্রম ও অধ্যবসায়কে শ্রদ্ধা করি। তাই পুজোকে সফল করে তুলতে যাঁদের ভূমিকা অপরিসীম, সেই প্রতিমা শিল্পী, মণ্ডপ শিল্পী ও আলোক শিল্পীদের নাম বারবার ঘোষণা করা হয়। তাঁদের সৃষ্টি নিয়ে আলোড়ন হলেও তাঁরা থেকে যান লোকচক্ষুর অন্তরালেই।’ গোয়াবাগানের বাসিন্দা সমীরণ পাল একদৃষ্টিতে দেখছিলেন, কীভাবে আলো দিয়ে সেজে উঠছে মণ্ডপ। তাঁর মুখ থেকে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল একটাই শব্দ— ‘অসাধারণ দক্ষতা’। নিজেই বললেন, রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। রকমারি আলোর কাজ দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম।