নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দিনে বাইকে চেপে ঘুরে ঘুরে পিৎজা ডেলিভারি। তার ফাঁকেই সুযোগ বুঝে গয়না-মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি। তারপর উর্দিধারীদের নাগাল এড়িয়ে বুলেট গতিতে ভ্যানিশ— ‘ধুম’ সিনেমার এই চিত্রনাট্য সবারই পরিচিত। সেই চিত্রনাট্য খানিকটা ধার করেছিল ঠাকুরপুকুরের সাগ্নিক সাহা। তার নিজের বাইক নেই। সৎ বাবা বাড়ি ফেরার পর তাঁর বাইক নিয়ে সোনার চেন ছিনতাই করাকে স্বভাবে পরিণত করেছিল সে। তবে অপারেশনের আগে খুলে নিত বাইকের নম্বর প্লেট। পুলিসি নজর এড়াতেই এই কৌশল। ছিনতাইয়ের পর বাড়ি ফেরার আগে ফের লাগিয়ে দিত নম্বর প্লেট। দু’টি সোনার চেন ছিনতাইয়ের ঘটনার তদন্তে নেমে এই চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পর্ণশ্রী থানার পুলিস। ধৃতরা হল সাগ্নিক সাহা ও তার দুই সহযোগী শেখ আমির রহমান ও আয়ুষ দত্ত। এদের মধ্যে সাগ্নিক মূল অভিযুক্ত। এই তিনজনের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে দু’টি বাইক ও তিন লক্ষ টাকার সোনার অলঙ্কার।
ঘটনার সূত্রপাত ১৮ এপ্রিল। ওই রাতে আচমকা হন্তদন্ত হয়ে পর্ণশ্রী থানায় ছুটে আসেন তরুণী সায়নী চন্দ্র। অভিযোগ, তাঁর বাবার গলা থেকে ১৮ গ্রামের সোনার চেন ছিনতাই করে চম্পট দিয়েছে বাইকে থাকা দুই দুষ্কৃতী। ঘটনাস্থল পাড়ুই কাঁচা রোড। দেড় ঘণ্টার মধ্যে ফের একই অভিযোগ নিয়ে থানায় আসেন সুষমা রাই। এই মহিলার দাবি, তাঁর মায়ের গলা থেকে ১০ গ্রামের সোনার চেন ছিঁড়ে নিয়ে গায়েব হয়ে গিয়েছে বাইক পার্টি। এবারের ঘটনাস্থল পদ্মপুকুর। পরপর দু’টি ঘটনায় নড়েচড়ে বসে পর্ণশ্রী থানার পুলিস। পৃথক মামলা রুজু করে তদন্তে নামে তারা। দু’টি ঘটনাস্থল ও তার আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করলেও সেই সময় অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। শেষমেশ মোট ৭৫টি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে অভিযুক্তরা যে তিনজন, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হন তদন্তকারীরা। কিন্তু অন্ধকার থাকায় তাদের চেনা যায়নি বলে পুলিসের দাবি।
ছিনতাই কাণ্ডের কিনারায় সাদা পোশাকের চারটি টিম তৈরি করে পর্ণশ্রী থানার পুলিস। তাঁদের মোতায়েন করা হয় স্পর্শকাতর এলাকায়। সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয় টহলদারি। সম্প্রতি ছিনতাইকারীদের বাইকটিকে শনাক্ত করে একটি টিম। দুষ্কৃতীদের গাড়ি থামানোর নির্দেশ দেন কনস্টেবল কাজল রায় ও সুশীল বর্মন। সাদা পোশাকে থাকলেও তাঁরা যে পুলিস, তা আন্দাজ করে গতি বাড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করে অভিযুক্তরা। সেই সময় তাদের ধাওয়া করেন দুই কনস্টেবল। ঠিক যেন সিনেমার ‘চেজ সিন’। বাইক আরোহীর পিঠে থাকা ব্যাগটি নাগালে পেয়ে যান কাজলবাবু। এক টানেই ছিঁড়ে যায় সেটি। ব্যাগ ফেলেই বাইক নিয়ে চম্পট দেয় দুই অভিযুক্ত।
ওই ব্যাগই তদন্তের মূল সূত্র হয়ে ওঠে। ব্যাগেই মেলে বাইকের নম্বর প্লেট। নম্বরটি হল ডব্লুবি ২০বিএস ০৪৮১। এই নম্বরের বাইক রেজিস্ট্রেশন হয়েছে সাগ্নিকের সৎ বাবার নামে। ঠিকানাও তাঁর। সেই ঠিকানায় গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই মেলে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সাগ্নিকের সৎ বাবা আদতে সেল্সম্যান। তিনি বিকেলে বাড়ি ফিরলে তাঁর বাইক নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে বেরিয়ে পড়ত সাগ্নিক। তার সঙ্গী হতো পর্ণশ্রী ও বাঁশদ্রোণী থানা এলাকার দুই বন্ধু। তদন্তে পুলিস জেনেছে, তিনজনের টিমই গত পাঁচ মাস ধরে অপারেশন চালাচ্ছে পর্ণশ্রী, ঠাকুরপুকুর, তারাতলা এলাকায়। মঙ্গলবার তাদের গ্রেপ্তার করে আলিপুর আদালতে পেশ করা হয়। বিচারক ধৃতদের ১৭ জুন পর্যন্ত পুলিস হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।