Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিনা টিকিটের যাত্রীরা

একেবারে টাটকা ঘটনা। ২১ জুলাইয়ের সকাল। ট্রেন ধরব বলে দমদম স্টেশনে এসেছি। ১ নম্বরের টিকিট কাউন্টারের মুখে এক পরিচিতের সঙ্গে দেখা। হন্তদন্ত হয়ে স্টেশনে ঢুকছিলেন।

বিনা টিকিটের যাত্রীরা
  • ২৩ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: একেবারে টাটকা ঘটনা। ২১ জুলাইয়ের সকাল। ট্রেন ধরব বলে দমদম স্টেশনে এসেছি। ১ নম্বরের টিকিট কাউন্টারের মুখে এক পরিচিতের সঙ্গে দেখা। হন্তদন্ত হয়ে স্টেশনে ঢুকছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, তাড়াতাড়ি চল। খবর হয়েছে। ট্রেন ঢুকল বলে। বললাম, এটা মনে হয় পাব না। টিকিট কেটে যাচ্ছি। আপনি এগোন। ঘটনাচক্রে টিকিট কেটে স্টেশনে গিয়ে দেখি, ট্রেন তখনও ছাড়েনি। সামনে যে দরজা পেলাম, সেটাতেই উঠে পড়লাম। ঠেলাঠেলি করে কোনওমতে ভিতরে ঢুকতেই সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা। রীতিমতো তিরস্কারের সুরে বললেন, এইসব দিনে কেউ টিকিট কাটতে যায়! আমি তো যে কোনও সমাবেশ বা বড় ম্যাচ (ডার্বি) থাকলে কাটি না। জবাবে অনেক কিছুই বলা যেত। কিন্তু কথায় কথা বাড়বে। তার চেয়ে চুপ থাকাই ভালো। 

Advertisement

ভেবে দেখতে গেলে উনি ভুল কিছু বলেননি। এটাই তো অলিখিত নিয়ম। আমরা সবাই জানি। তৃণমূল কংগ্রেসের ২১ জুলাইয়ের শহিদ স্মরণ, বামেদের ব্রিগেড সমাবেশ বা বিজেপির মিছিল হোক বা তিন প্রধানের ফুটবল ম্যাচ—দলমত নির্বিশেষে যে বিষয়টি সবসময় এক থাকে, তা হল জেলায় জেলায় ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থক বা ফুটবল প্রেমীর বিনা টিকিটে কলকাতা সফর। এ এক বহুল প্রচলিত প্রথা। লোকাল ট্রেন হোক বা এক্সপ্রেস, নিজের নিজের দলের ফ্ল্যাগ নিয়ে কোনও টিকিট না কেটে দিব্যি ট্রেনে উঠে পড়েন বহু সমর্থক। সহযাত্রীরা বুঝেও চুপ, টিকিট পরীক্ষকরাও নিরুত্তর। এ এক অলিখিত সামাজিক চুক্তি, বিশেষ এই দিনগুলিতে সবকিছু মাফ।
আসলে এই ‘প্রথা’র পিছনে রয়েছে একটি গভীর সামাজিক বাস্তবতা। পিয়ের বোর্দোর ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ থিয়োরি মেনে বলতে গেলে দলমত নির্বিশেষে এই সমস্ত কর্মীর জন্য শহরে আসার সুযোগ মানে শুধু নেতাকে দেখা নয় বরং ‘দলীয় সংযোগ’ তৈরি করা। একবার নেতার পা ছোঁয়া, মুখ দেখানো বা একটা সেলফি গ্রামে গিয়ে বলার সুযোগ করে দেয় যে, ‘আমি সমাবেশে গিয়েছিলাম’। এটাই তাঁদের সামাজিক ও রাজনৈতিক মূলধন। কিন্তু উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনা—দূরদূরান্ত থেকে কর্মীরা আসেন শুধু নেতানেত্রীদের ‘একঝলক’ দেখার আশায়। তাঁরা দিনমজুরির কাজ ছেড়ে বা দৈনন্দিন আয়ের ক্ষতি করেই কলকাতায় আসেন। এঁদের কাছে এক্সপ্রেসের টিকিট কাটা রীতিমতো বিলাসিতা। অথবা ধরুন, মোহন বাগান বনাম ইস্ট বেঙ্গলের ডার্বি। বড় ম্যাচ দেখতে লোকাল ট্রেনের ভিড় করেন যে সব খেলাপাগল জনতা, তাঁদের অধিকাংশই টিকিট কাটার ধার ধারেন না। বড় বড় শহরের জীবনধারায় অভ্যস্ত জীবনে অবশ্য এ অঙ্ক মেলানো কঠিন। 
বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন টিলাবাড়ির সুদেব ওঁরাও। ২০১৯ সালের আলাপ হয়েছিল ওঁরাও দম্পতির সঙ্গে। চালসায় মঙ্গলবারের হাটে কাঠের টুল, পিঁড়ি বিক্রি করছিলেন সুদেব। পাশে বসা স্ত্রী বিক্রি করছিলেন ভাপা পিঠে। সেই পিঠে খাওয়ার সময়েই কথায় কথায় জানতে চাইলেন বাড়ির কথা। কলকাতায় থাকি শুনে বলেছিলেন তাঁদের তিলোত্তমা সফরের কথা। সেবছর ২১ জুলাই উপলক্ষ্যে পদাতিক এক্সপ্রেসের জেনারেল কামরায় ঠাসাঠাসি করে আসার কথা। ক্যাম্পে থাকা-খাওয়ার কথা। ছেলেকে নিয়ে দল বেঁধে ভিক্টোরিয়া, চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখার কথা। বলেছিলেন, ‘আমাদের তো দিন আনি দিন খাই দশা টিকিট-থাকার খরচ দিয়ে এমনিতে হয়তো যাওয়া হতো না। এই সুযোগে তবু ছেলেকে কিছুটা ঘুরিয়ে আনলাম।’
শুধু এক্সপ্রেস নয়, বড় ম্যাচ বা রাজনৈতিক সভায় যোগ দিতে লোকাল ট্রেনেও বহু মানুষ বিনা টিকিটেই সওয়ার হন। যাঁরা একটু ভীতু গোত্রের, তাঁরা আশ্রয় নেন ‘গ্রুপ টিকিটিং’ পদ্ধতির। সেখানে ১০-১২ জন মিলে একটি টিকিট কাটেন। দৈবাৎ টিটিই টিকিট দেখতে চাইলে ওই টিকিটই দেখানো হয়। বাকিরা ততক্ষণে পাশ কাটিয়ে ধাঁ। যদিও সাধারণত দলীয় পতাকা বা মশাল-পালতোলা নৌকার কাটআউট দেখলে তাঁদের বিশেষ বিরক্ত না করে এড়িয়েই যান টিকিট পরীক্ষকরা।
যে কোনও মিটিং-মিছিল বা সমাবেশ হলেই ফেসবুক বা এক্স (টুইটার)-এ অনেকেই পোস্ট করেন, ‘আবার শহর অচল’, ‘আবার ট্রেনে বিনা টিকিটের ভিড়’। অনেকে আবার ভিডিও করেন মেট্রো রেলের গেট পেরনোর চেনা কৌশল ‘হিউম্যান শিল্ড’-এর। যেখানে একজন টিকিট পাঞ্চ করেন, আর তাঁর গায়ে গা লাগিয়ে অন্তত দু’জন ভিতরে ঢুকে যান। পোশাকি ভাষায় ‘ঘোস্ট রাইডিং’ বলে পরিচিত এই দৃশ্য দেখেও অধিকাংশ সময়েই দেখেন না নিরাপত্তা রক্ষীরা। সভা-সমাবেশ শেষে বহু সমর্থক বেড়িয়ে পড়েন কলকাতা দেখতে। পাঁচিল টপকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ভিতর বা বিনা টিকিটে ইকো পার্কে ঢুকে পড়েন। এই বিনা টিকিটের সফর বা বিনা টিকিটে দর্শনীয় কোনও স্থানে ঢুকে পড়াকে শুধু অর্থনৈতিক অনটনের নিরিখে বিচার করলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এর পিছনে আছে এক ধরনের সামাজিক মনস্তত্ত্ব। চিরাচরিত ‘সিস্টেম’-এর বিরুদ্ধে একটা প্রতীকী বিদ্রোহ। যে মানুষটা সারা বছর টিকিট কেটে নিয়ম মেনে চলেন, সে-ও হয়তো এই একদিন সুযোগ পেলে নিয়ম ভাঙতে চান। দমদম স্টেশনের ওই পরিচিত ব্যক্তিও বোধহয় এই শ্রেণিতেই পড়েন। এটা আসলে সমাজকে একধরনের ‘চোখ রাঙানো’। মনে মনে কলার তুলে বলা, ‘দেখো, নিয়ম ভাঙছি। তাও কিছু করতে পারছ না।’ যা মনে পড়িয়ে দেয় জুডিথ বাটলারের পারফর্মেটিভ অ্যাক্টস তত্ত্বকে। অথবা জেমস স্কটকে। ‘ওয়েপনস অব দ্য উইক’ বইতে স্কট তুলে ধরেছিলেন মালয়েশিয়ার কৃষকদের কথা। দেখিয়েছিলেন, প্রান্তিক মানুষরা সরাসরি বিদ্রোহের বদলে টিকিট বা কর ফাঁকির মতো ছোট ছোট প্রতিরোধে বিশ্বাসী। এটাই তাঁদের ‘মরাল ইকনমি’।
ফাঁকি দেওয়ার এই মনোভাব অবশ্য নতুন কিছু নয়। ব্রিগেড সমাবেশ বা ধর্মতলার জমায়েতের আগে থেকেই এভাবে বিনা টিকিটে ঢুকে পড়ার ঐতিহ্য কলকাতার ফুটবল সংস্কৃতিতে বরাবরই ছিল। একসময় মোহন বাগান-ইস্ট বেঙ্গলের ডার্বি ম্যাচ মানেই ময়দানে হাজির হাজার হাজার মানুষ। তাঁদের অনেকে গেট ভেঙে ঢুকতেন, কেউ বা দু’টুকরো করে ছেঁড়া একটা টিকিট ধরে ঢুকতেন। গেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত টিকিট পরীক্ষককে বোকা বানিয়ে। ভিড় সামলাতে ঘোড়সওয়ার পুলিস লাঠি চালাত। মানুষ দৌড়তে গিয়ে পড়ে যেত, আহত হতো। তবু এই অভ্যাস ছাড়ত না। এখন ডার্বিতে কড়াকড়ির গুঁতোয় বিনা টিকিটে ঢোকা বন্ধ হলেও লোকাল ট্রেনে বা স্টেডিয়ামগামী বাসগুলিতে দেখা মেলে বিনা টিকিটের সমর্থকদের। নদীয়ার মাঝদিয়া থেকে ডার্বি দেখতে আসা এক মোহন বাগান অন্ত প্রাণ সমর্থক পিন্টু মণ্ডল শুনিয়েছিলেন তাঁদের ম্যাচ দেখতে আসার গল্প। বলেছিলেন, ‘ট্রেনে উঠেই আমাদের মেরিনার্স পতাকা ঝুলিয়ে দিই। সঙ্গে সবুজ মেরুণ রঙা শোলার পালতোলা নৌকা তো থাকেই। কতবার বেরনোর সময় বিধাননগর স্টেশনের সাবওয়েতে চেকারদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। কিন্তু আমাদের কাছে কখনও টিকিট দেখতে চায়নি।’ আর টিকিট না কাটা? ম্লান মুখে বলেছিলেন, ‘টিকিট ফাঁকি দেওয়া দোষের। জানি। কিন্তু ওই যে ম্যাচ দেখতে আসি, সেদিন তো সকাল থেকে আমার দোকান বন্ধ থাকে। ভাবুন তো, একদিনের ব্যবসা লস। রিটার্ন টিকিটের দামটা তো বাঁচল। হয়তো অন্যরা বুঝবে না। কিন্তু এই অল্প টাকাটাও আমাদের জন্য অনেক।’ তবু প্রিয় দলের টানে ফি বছর নানান জেলার প্রত্যন্ত সব গ্রাম থেকে মাঠে এসে হাজির হন পিন্টুর মতো বহু মানুষজন। তাঁরা দল বেঁধে বাসে ওঠেন। কয়েকজন হয়তো ভাড়া দেন। বাকিরা ‘দিচ্ছি’ বা ‘বন্ধু দিল তো’ বলে কন্ডাক্টরকে এড়িয়ে নির্দিষ্ট স্টপ আসার আগেই নেমে যান। মাঠে ঢুকতে ঢুকতে সগর্বে বাকিদের টিকিট ফাঁকি দেওয়ার কৌশলের গল্প করেন। বহু কনডাক্টর এই সমর্থকদের ভিড় দেখে বাস দাঁড় করাতে চান না। লোকসান হয়ে যাবে বলে। তার পরেও কিছু বাস দাঁড়ায়। ট্র্যাডিশন সমানে চলতে থাকে।
এই শ্রেণির মানুষদের বিপরীত মেরুতে রয়েছে সমাজের উচ্চ একটি অংশ। যাঁরা কেনাকাটার জন্য যান শপিং মলে, সিনেমা দেখেন মাল্টিপ্লেক্সে। ‘বুক মাই শো’তে টিকিট কেটে ইডেনে আইপিএল দেখতে যান। লোকাল ট্রেন-বাসে ওঠার বদলে নিজের গাড়ি বা অ্যাপ ক্যাবে চড়েন। এই অংশের কাছে বিনা টিকিটে ট্রেনে ওঠা, কোথাও বিনা টিকিটে বা গেট টপকে ঢোকা রীতিমতো ‘অপরাধ’। তাঁরা বুঝতে পারেন না, একজন মানুষ কেন ভোর চারটেয় উঠে, তৈরি হয়ে, তিন ঘণ্টা ট্রেনে বা বাসে চেপে ধর্মতলার মিছিলে যোগ দিতে যান। অথবা দোকান বন্ধ রেখে ম্যাচ দেখতে ময়দানে ছোটেন। আর সেই কারণেই সোশ্যাল মিডিয়ায়, হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ ফরোয়ার্ড করে ‘ফ্রিতে খেতে-ঘুরতে আসার ভিড়’, ভিড়ে ঠাসা ট্রেনকে ‘ডিম্ভাত এক্সপ্রেস’ বলে কটাক্ষ করেন। এঁরাই একসময় বামেদের ব্রিগেড সমাবেশকে ‘মাছ-ভাতের’ সমাবেশ (মার্ক্সবাদের বিকৃত রূপ) বলতেন। চিরকাল এঁরা প্রান্তিক মানুষজনকে উপহাস করে এসেছেন। কিন্তু সমাবেশমুখী এই মানুষজনের অনুভূতিকে তাঁরা কখনও বুঝতে পারেননি। বুঝতে পারেননি প্রান্তিক মানুষজনের কাছে রাজনৈতিক দল বা ফুটবল ক্লাব মানে আত্মপরিচয়ের একমাত্র হাতিয়ার।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ