বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: ১৯৫৯ সালের এক মেঘলা দুপুর। দমদমে যশোর রোডের ধারে গ্রামোফোনের অফিসে ঢুকলেন সুচিত্রা সেন। দিনটা ছিল ৪ আগস্ট। সিনেমার ডাবিং নয়। একটি গান নিজের গলায় রেকর্ড করতে এসেছেন বিখ্যাত অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন। গানটির কথা, ‘বনে নয় আজ মনে হয়...’।
৭৮ আরপিএম রেকর্ডে গানের ‘টেস্ট রেকর্ড’ হল। রেকর্ডিং শেষ হওয়ার পর সুরকার এবং গীতিকারের সঙ্গে বসে সুচিত্রা শুনলেন। তারপর সিদ্ধান্ত হল, ‘টেক ওকে। দ্বিতীয়বার আর গাওয়ার দরকার নেই।’ সেই ‘টেস্ট রেকর্ড’ মার্কেটিং হবে বলে সিদ্ধান্ত হল এবং তৈরি করা হল প্রিন্ট। সুচিত্রা সেন হয়ত জানতেন না, ঠিক ওই জায়গাতেই ২৪ বছর আগে একটি কবিতার টেস্ট রেকর্ড করে গিয়েছিলেন একজন বাঙালি শিল্পী।
কবিতাটির নাম, ‘ঝুলন’। আর শিল্পী ও স্রষ্টার নাম হল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যে টেস্ট রেকর্ডে রবীন্দ্রকণ্ঠে সেই কবিতার রেকর্ডিং হয়েছিল, তা বাজারে আসে পাঁচবছর পর, ১৯৪০ সালে।
এ সব রেকর্ডের জনপ্রিয়তার সূর্যাস্ত অনেকদিন আগেই। তারপর ক্যাসেট, সিডির পর এখন গানের ডিজিটাল যুগ। কিছু মানুষ শখে এখনও সংগ্রহ করেন পুরনো রেকর্ড। বুকে ধরে আগলে রাখেন যকের ধনের মতো। সেসব মণিমাণিক্য সংগ্রহেরই গল্প শোনাচ্ছিলেন বেহালার সংগ্রাহক পরমানন্দ চৌধুরী। কয়েকশো ‘টেস্ট রেকর্ড’ রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। শিল্পীর তালিকায় যেমন আছে সুচিত্রা সেনের গানের রেকর্ড, তেমনই আছে রবীন্দ্রনাথের স্বকণ্ঠে কবিতা পাঠের একমাত্র টেস্ট রেকর্ডটি।
১৯০২ সালে ভারতে প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। শশীমুখী, ফণীবালাদেবী রেকর্ড করেছিলেন গানের। পরবর্তীকালে বাজারে আসতে শুরু করে কিংবদন্তী গওহরজানের রেকর্ড। পরমানন্দবাবু বলেন, ‘যে কোনও গানের রেকর্ডিং ফাইনাল হওয়ার আগে তৈরি হত টেস্ট রেকর্ড। তা শুনে কখনও গায়কী বা সুরের পরিবর্তন করা হত। আবার কখনও টেস্ট রেকর্ডটিই ফাইনাল রেকর্ড হিসেবে চূড়ান্ত করা হত। এমনই বেশ কিছু ‘টেস্ট রেকর্ড’ তাঁর সংগ্রহে আছে। সে তালিকায় আছে শ্যামল মিত্রের সুরে তাঁরই গাওয়া ১৯৫০ সালের টেস্ট রেকর্ড ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর, যা পরবর্তীকালে উত্তম কুমারের লিপে গেয়েছিলেন কিশোরকুমার। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ১৯৪৮ সালে রেকর্ড করেন অঞ্জনগড় সিনেমার গান ‘মোর গান গুনগুন’। মীরা বাঈয়ের গীতে হৃদয়নাথ মুঙ্গেশকরের সুরে ১৯৫৪ সালে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া ‘বরষে বুন্দিয়া শাওন’ ভজন। এছাড়া জ্যাঠামশাই কিংবদন্তি শিল্পী সত্য চৌধুরীর ১৯৩৭ সালে গাওয়া ‘নতুন চাঁদের তিথি এল আকাশে’ বা দেশ স্বাধীনের ঠিক আগে গাওয়া ‘দুর্গমগিরি কান্তার মরু’ সহ বহু গানের টেস্ট রেকর্ড রয়েছে তাঁর জিম্মায়।
৮ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি সাবর্ণ পরিবার পরিষদের উদ্যোগে বড়িশার ‘বড়বাড়ি’তে বসছে ‘২০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসব’। সেখানে ১০টি টেস্ট রেকর্ড শোনাবেন পরমানন্দবাবু। পরিষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায় চৌধুরী বলেন, ‘দর্শকরা এক অনন্য ঐতিহ্যের অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকবেন।’ পরমানন্দবাবু জানান, সানি ম্যাথিউস, সুশান্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, অমিত গুহ (বিশিষ্ট রেকর্ড সংগ্রাহক ও গবেষক সুরাজলাল মুখোপাধ্যায়ের জামাতা), জ্যোতিপ্রকাশ গুহ তাঁকে টেস্ট রেকর্ড সংগ্রহে সাহায্য করেছেন।