হিমাংশু সিংহ: একের পর এক বায়ুসেনা ঘাঁটি ধ্বংস হতেই ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা পাকিস্তানের। আমেরিকার মধ্যস্থতায় শনিবার যুদ্ধবিরতির কথা ঘোষণা হলেও পাকিস্তানের জন্য অন্ধকার ভবিষ্যৎই অপেক্ষা করছে। কারণ ফের গোলাগুলি চালাতে শুরু করেছে তারা। ভারতও জানিয়ে দিয়েছে, সন্ত্রাসের সঙ্গে কোনওরকম আপস নয়। পাকিস্তানের এই চরিত্র বড্ড চেনা। তাকে কোনও দিন বিশ্বাস করা যায় না। বেইমানি গোটা দেশটার মজ্জায়।
আসলে শান্তির ললিত বাণী পাকিস্তানের জন্য নয়। নাহলে পৃথিবীর কোন দেশে জঙ্গিদের শেষকৃত্য হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়? সন্ত্রাসবাদের শিক্ষা দেওয়া কট্টর মৌলবী আর উর্দি পরিহিত সেনার ঘেরাটোপে? যুদ্ধের কৌশল রচনার পরিবর্তে জখম সন্ত্রাসীদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান সেনাপ্রধান? মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সেই ছবি। উত্তরটা থুড়ি দেশটার নাম জানাই ছিল, স্রেফ একটু ঝালিয়ে নেওয়া গেল এই সুযোগে। প্রমাণ হয়ে গেল পাকিস্তানের সেনা মদতেই ভারতের মাটিতে একটার পর একটা জঙ্গি আক্রমণ সংগঠিত হয়েছে বছরের পর বছর। শুধু মদতই বা বলি কেন, জিন্না ভুট্টো মোশারফের দেশে আজ সরকার, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার জঙ্গিরা। গত ৭-৮ মে রাতের অন্ধকারে ভারতের রাফাল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হানায় ধ্বংস হওয়া জয়েশ আর লস্করের সন্ত্রাস গবেষণাগারের বাইরে জঙ্গি শেষকৃত্যে তারই প্রমাণ মিলেছে ভারতের ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সৌজন্যে। বাহওয়ালপুর, মুরিদকে, মুজফ্ফরপুর, লাহোর, রাওয়ালপিন্ডিতে অতিআধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বাহাদুর সেনা জবাব দিচ্ছে স্থলে জলে আকাশপথে একযোগে। গোটা দেশ ঐক্যবদ্ধ। ঠিক যে ভাষায় শত্রুকে উত্তর দেওয়া উচিত সেই পথেই ভবিষ্যতেও জবাব দিতে হবে যাতে কাশ্মীরের দিকে বিষ চোখে আর চাইতে না পারে। শান্তির ললিত বাণী কোনওদিন সীমান্তপারের জঙ্গি রাষ্ট্রকে শান্ত করতে পারেনি। বরং উত্তেজিত করেছে ক্ষমতা দেখাতে। সেই কারণেই বিগত তিন দশকে যখনই ভারত সৌহার্দ্যের হাত বাড়িয়েছে তা দ্বিগুণ বেগে ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে আরও ভয়ঙ্কর গণহত্যার উচ্চকিত আস্ফালনে। ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ শুনতে বড্ড ভালো। কিন্তু পাকিস্তান অন্য ধাতুতে গড়া। তাই শ্মশানের নিঃশব্দ শান্তির মধ্যেই জঙ্গি তৈরির কারখানায় নিরাপদে বেড়ে উঠেছে সন্ত্রাসের বীজ। আপাতত যুদ্ধবিরতি হলেও আবার হামলা হলে সেই নার্ভ সেন্টার ধ্বংস করতে প্রত্যাঘাত শুরু করতে হবে। কোনওরকম আপস চলবে না। মাদ্রাসা ও মসজিদ যদি সন্ত্রাস ছড়ানোর কারখানা হয় তাহলে শুধু ভারত নয় গোটা পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষকে ওই ভাষাতেই মৌলবাদীদের জবাব দিতে হবে। ভারতের বাহাদুর সেনার পাশে দাঁড়াতে হবে।
পাকিস্তানের গত তিন দশকের জঙ্গি কার্যকলাপের ইতিহাসে বারে বারেই দিল্লির সরকার শান্তির হাত বাড়িয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তার পরিণাম হয়েছে উল্টো। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌভ্রাতৃত্বের অনন্য নজির স্থাপন করতে বাস নিয়ে লাহোরে গিয়েছিলেন বিজেপি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, নরেন্দ্র মোদির পূর্বসূরি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ি। কয়েক মাসের মধ্যেই ভারতের ভূখণ্ডে জঙ্গি ঢুকিয়ে নামিয়ে আনা হয় কারগিল যুদ্ধ। গোটা পর্ব চলে প্রায় ৯৪ দিন। অপারেশন বিজয় জিতলেও আমাদের কয়েকশো জওয়ানকে প্রাণ হারাতে হয় সেই অভিযানে। দু’বছরের ব্যবধানে ২০০১ সালের জুলাই মাসে আগ্রায় ফের পারভেজ মোশারফ ও অটলবিহারী বৈঠকে বসেছিলেন। কিন্তু পাঁচ মাসের মধ্যেই খোদ ভারতীয় সংসদে চমকে দেওয়া হামলা প্রমাণ করে পাকিস্তান আছে পাকিস্তানেই।
কারগিলের বছরেই কান্দাহারে ভারতের আইসি ৮১৪ বিমান হাইজ্যাক করে নিয়ে যায় পাক জঙ্গিরা। পরে কট্টর পাকিস্তানি জঙ্গিদের মুক্তির বিনিময়ে যাত্রীদের মুক্ত করে ভারত সরকার। মাসুদ আজহার সহ জঙ্গিদের মুক্ত করতে কান্দাহারে যেতে হয় তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী যশবন্ত সিংকে। ২০০২ সালে পাকিস্তানের করাচি থেকে অপহৃত হন মার্কিন সাংবাদিক ড্যানিয়েল পার্ল। ভারতের হানায় মৃত্যু হয়েছে জয়েশ-ই-মহম্মদ প্রধান মাসুদ আজহারের ভাই আবদুল রউফ আজহারের। কান্দাহারের ভয়ঙ্কর বিমান অপহরণের মাস্টারমাইন্ড ছিল মাসুদ আজহারের এই ভাই। একাধিক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পিছনে হাত ছিল আবদুল রউফ আজহারের। ইহুদি মার্কিন সাংবাদিক ড্যানিয়েল পার্লের অপহরণ, পাশবিক অত্যাচার এবং মুণ্ডচ্ছেদ করে হত্যার পিছনে দায়ী ছিল মাসুদ আজহারের এই ভাই। ভারতের প্রত্যাঘাতে তার মৃত্যুর পর পহেলগাঁও জঙ্গি হামলায় নিহতদের পাশাপাশি ন্যায়-বিচার পেয়েছেন সাংবাদিক ড্যানিয়েল পার্ল ও তাঁর পরিবারও। ২০০২ সালের ২৩ জানুয়ারি পাকিস্তানে অপহৃত হন ড্যানিয়েল। তাঁকে যেভাবে মুণ্ডচ্ছেদ করে খুন করা হয়েছিল, সমগ্র বিশ্বকে তা নাড়িয়ে দিয়েছিল। শিউরে উঠেছিলেন সকলেই। ঘটনার ২৩ বছর পর অবশেষে ন্যায়বিচার মিলল ভারতীয় সেনার সৌজন্যে।
নরেন্দ্র মোদিও শান্তি প্রতিষ্ঠার কম চেষ্টা করেননি। ক্ষমতায় আসার পরের বছরই হঠাৎ নওয়াজ শরিফের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে ছুটে গিয়েছিলেন পাকিস্তানে। ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫। কিন্তু ওই যে বললাম, শান্তির ললিতবাণী বিতরণ করতে গেলেই পাকিস্তান দুর্বলতা ভাবে। সেই ফর্মুলা মেনেই ৯ মাসের মধ্যে নেমে এসেছে পাকিস্তানের আঘাত। উরির আক্রমণের বদলা নিয়েছে ভারত সরকার মাত্র দশদিনের মধ্যে। তাতেও শুধরোয়নি পাকিস্তান। আবার নেমে এসেছে পুলওয়ামায় সেনাবাহিনীর উপর বর্বরোচিত হামলা। যে ঘটনায় আমাদের ৪০ জন নিরীহ জওয়ান প্রাণ হারায়। জবাবে মাত্র দশদিনের মধ্যে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ মোদি সরকার বালাকোটে কড়া জবাব দেয়। কিন্তু সন্ত্রাসের শিকড় টেনে উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। আরও বড় দুঃখ, আজ থেকে ১৭ বছর আগে মুম্বইতে ঢুকে পাকিস্তানি সেনার মদতে জঙ্গিরা যুদ্ধ ঘোষণা করলেও ভারত কিন্তু তার পাল্টা জবাব দেয়নি। শান্তির পথেই মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। রাতের অন্ধকারে সেই হামলায় কাসব ধরা পড়ে। পরে তার ফাঁসিও হয়। কিন্তু পাকিস্তানের যে মাদ্রাসা ও মসজিদে কাসব ও তার সঙ্গীসাথীরা মদত পেয়েছিল তা ধ্বংস হল মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগে ভারতীয় হারপ ড্রোনের নিখুঁত নিশানায়। পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ড্রোন হেনে পহেলগাঁও হামলার জবাব দিয়েছে ভারত। মধ্যরাতে প্রত্যাঘাত করা হয়েছে ভারতের তরফে। ভারতের প্রত্যাঘাতে মাসুদ আজহারের পরিবারের ১৪ জন সদস্য নিহত। শোনা যাচ্ছে, নিহতদের মধ্যে ছিল মাসুদ আজহারের ভাই, আবু জুন্দালরাও আছেন। মৃত্যু হয়েছে মাসুদের চারজন সহকারীরও। কিন্তু কাজ শেষ হয়নি। হাফিজ সইদের পুত্র তাল্লা সইদ এর মধ্যেও হুঙ্কার ছেড়েছেন, মোদিজি জল বন্ধ করলে জঙ্গিরা ওঁর শ্বাস বন্ধ করবে। এখনও যারা এই কথা বলতে পারে, তাদের জন্য শান্তির বাণী মূল্যহীন। সেই জন্যই আরও বড় প্রত্যাঘাতের প্রয়োজন। নাহলে সীমান্ত পারের জঙ্গি কার্যকলাপ চিরতরে বন্ধ হবে না। আপাতত যুদ্ধ বিরতি হলেও ভারতের মাটিতে জঙ্গি সন্ত্রাস হলেই ফের শুরু হবে প্রত্যাঘাত।
পাকিস্তান নিজের দেশেই দিশেহারা। একদিকে বালোচ বিদ্রোহ। ওয়াজিরিস্তানে অসন্তোষ। তালিবানের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে। অশান্ত পাখতুনওয়া। পাকিস্তান তছনছ। জঙ্গিদের সঙ্গে সেনার কোমরও ভেঙে গিয়েছে। এই যুদ্ধে যদি আমাদের এস ৪০০ মিসাইল বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা না থাকত তাহলে কী হতো? আমেরিকা কিন্তু নানাভাবে রাশিয়ার কাছ থেকে এই এস ৪০০ কেনা আটকাতে গিয়েছিল। এমনকী নিষেধাজ্ঞার জারির হুমকিও এসেছিল। কিন্তু কোনও কথায় কান না দিয়ে ৩৫ হাজার কোটি ব্যয়ে এস ৪০০ কেনার চুক্তি করেছে মোদি সরকার। একই কথা প্রযোজ্য রাফালের ক্ষেত্রেও। গত দশ বছরে একদিকে যেমন ভারতীয় অস্ত্রশস্ত্র, প্রযুক্তি ও যুদ্ধ বিমানের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, তেমনি ফ্রান্স রাশিয়া ইজরায়েল থেকেও আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম কিনে তিলে তিলে সেনা পরিকাঠামোর উন্নতিতে জোর দেওয়া হয়েছে। এস ৪০০-কে সাহায্য করছে ভারতের নিজের তৈরি আকাশ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। রাফাল সুখোইকে শক্তি জোগাচ্ছে দেশীয় প্রযুক্তির তেজস। ভারত তৈরি। পাকিস্তানের ইতিহাসও সবার জানা। যুদ্ধ নিয়ে বেশি কথা বলা উচিত নয়। সব ভালো যার শেষ ভালো। শুধু বলব, জয় ভারত। জয় ভারতীয় সেনা।