মৃণালকান্তি দাস: পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং পাক সেনা বাহিনীকে হাতের তালুর মতো চেনে তালিবান। শুধুমাত্র নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তারা যে চরম বিশ্বাসঘাতকতাও করতে পারে তাও জানেন কাবুলের নেতারা। এই একই বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বালুচিস্তানের সঙ্গেও!
মৃণালকান্তি দাস: পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং পাক সেনা বাহিনীকে হাতের তালুর মতো চেনে তালিবান। শুধুমাত্র নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তারা যে চরম বিশ্বাসঘাতকতাও করতে পারে তাও জানেন কাবুলের নেতারা। এই একই বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বালুচিস্তানের সঙ্গেও!
একের পর এক খনিজ ভাণ্ডারের লোভ দেখিয়ে ইসলামাবাদের নেতারা আমেরিকার হাতে তুলে দিতে চাইছে গোটা বালুচিস্তানকে। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি) এবং বালুচদের হাত থেকে বাঁচতে নিজেদের মাটিতে বিদেশি শক্তিকে ডেকে আনতে চাইছেন পাক সেনা প্রধান আসিম মুনির। কে জানে, হয়তো আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কৌশল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাথায় ঢুকিয়েছেন ইসলামাবাদের নেতারাই! ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দিয়েছেন সেই পুরানো প্রবাদ: ‘মধ্য এশিয়ার দখল যার, ইউরেশিয়ার কর্তৃত্ব তার।’
সম্প্রতি পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সংঘর্ষের নেপথ্যে টিটিপি মূল কারণ বলে ইসলামাবাদ যতই প্রচার করুক না কেন, এর পিছনে আসলে কী অভিসন্ধি রয়েছে তা নিয়ে বহু প্রশ্ন উঠছে। আফগান নাগরিকরা জানতে চাইছেন, বাগরাম বিমানঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে ওয়াশিংটন কি বুঝে নিতে চাইছে কাবুলের এখন লড়াই করার ক্ষমতা কতটা? নাকি বোঝার চেষ্টা করছে, ফের আফগানিস্তান আক্রমণ করলে কাবুলের পাশে কে কে দাঁড়াবে? টিটিপির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে ইসলামাবাদ কি আসল উদ্দেশ্যকে ঢাকার চেষ্টা করছে? এমন প্রশ্ন ওঠার ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তানকে ব্যবহার করে আমেরিকা এই উপমহাদেশে শক্ত ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা চালিয়েছে। আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নিতে ওয়াশিংটন সেই পাক সেনাদেরই যে ব্যবহার করবে, এটা তালিবান নেতারা খুব ভালো করেই জানেন। অবশ্য তালিবান সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের চিফ অব স্টাফ ফাসিহউদ্দিন ফিতরাত স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, ‘আফগানিস্তানের এক ইঞ্চি মাটিও কারও কাছে হস্তান্তর সম্ভব নয়।’ কাবুল মনে করে, সম্প্রতি পাক সেনাদের হামলা ছিল আমেরিকার ‘প্রক্সি ওয়ার’!
একসময় কাবুল থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে বাগরাম ঘাঁটি ছিল আমেরিকার আঞ্চলিক মিশনের স্নায়ুকেন্দ্র। কৌশলগত, সামরিক ও ভূরাজনৈতিক কারণে বাগরাম বিমানঘাঁটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ‘চীনের পারমাণবিক অস্ত্র বানানো হয় যেখানে (শিনজিয়াং), সেখান থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে এই ঘাঁটি।’ এর অর্থ, বাগরাম ফেরত নিতে চাওয়ার বড় কারণ চীনের উপর নজরদারি। এছাড়া আফগানিস্তানের বিরল খনিজের উপরও আমেরিকার নজর পড়েছে।
প্রকৃতপক্ষে বাগরাম এমন এক কৌশলগত স্থানে অবস্থিত, যা গোটা এশিয়ার উপর নজরদারির পথ খুলে দেয়। আমেরিকার বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রে আছে মধ্য এশিয়া। কারণ, যে শক্তি মধ্য এশিয়া নিয়ন্ত্রণ করবে, সে-ই ইউরেশিয়ায় সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে। ‘ইউরেশিয়া’ হল ইউরোপ ও এশিয়া মিলিয়ে এক বিশাল ভূখণ্ড। মার্কিন কূটনীতিক জবিগনিউ ব্রেজিনস্কি ইউরেশিয়াকে বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইউরেশিয়াকে একটি বিশাল দাবার ছকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেখানে বড় শক্তিগুলি (আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ভারত) নিজেদের কৌশল সাজায়। অর্থাৎ, ইউরেশিয়া বিশ্ব শক্তিগুলির ভূরাজনৈতিক খেলার কেন্দ্রীয় মঞ্চ। বাগরাম নিয়ন্ত্রণের মানে ইউরেশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করা। গোটা অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত নজরদারি ও গোয়েন্দাগিরি সহজ হয়ে যাওয়া। বাগরাম থেকে পূর্বে পাকিস্তান, উত্তরে চীন, দক্ষিণে ভারত— সবই হাতের নাগালে। আবার বাগরাম থেকে মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব ও ইরানের কার্যকলাপ নজরে রাখা সম্ভব। বাগরাম যখন ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তখন মস্কো ও তেহরান উভয়ের কাছে বিষয়টি ছিল নিজেদের ‘অঙ্গনে’ এক অনাকাঙ্ক্ষিত শক্তির (শত্রু) উপস্থিতি।
স্বাভাবিক কারণেই চীন-রাশিয়া আফগানিস্তানের পাশে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। চীনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র লিন জিয়াং বলেছেন, ‘চীন আফগানিস্তানের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করে। আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আফগান জনগণ।’ হয়তো সেই কারণেই আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষে চীন হাত গুটিয়ে বসেছিল। পাকিস্তানকে কোনও সাহায্যও করেনি। আমেরিকার তাঁবেদারি করা শুরু করে ইসলামাবাদ যে তাদের সঙ্গেও গদ্দারি করছে, তা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে বেজিং। আপাতত পাক-আফগান সংঘর্ষ থামলেও অবস্থা যে পথে গড়াচ্ছে, তাতে সন্ত্রাসবাদ (টিটিপি) দমনের নামে যে কোনও দিন আফগানিস্তানে হামলা চালাতে পারে মার্কিন সেনাবাহিনী। আর তার ‘জমি’ তৈরি করছে পাক সেনাবাহিনী। কখনও কাবুলের বিরুদ্ধে, কখনও নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে। ইসলামাবাদ প্রভাবিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে শুরু হয়ে গিয়েছে যুদ্ধের বয়ান তৈরি করার প্রক্রিয়া।
পাকিস্তানের দাবি, তাদের লক্ষ্য তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) জঙ্গিগোষ্ঠী, যারা আফগানিস্তান সীমান্তের কাছে ঘাঁটি তৈরি করেছে। পাক অভিযোগ, ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালিবান ক্ষমতায় এলে টিটিপি-সহ অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেয়েছে পাকিস্তানে। ইসলামাবাদের এ-হেন দাবি নস্যাৎ করে কাবুল পাল্টা বিবৃতি দিয়েছে, যে জঙ্গিগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে ইসলামাবাদ হামলা চালাচ্ছে, আদতে তারা রয়েছে পাক ভূখণ্ডেই। পাক নাগরিকদের মধ্যে টিটিপির আদর্শগত ভিত তৈরি হয়েছে ইসলামাবাদের ইন্ধনেই।
নব্বইয়ের দশকে তালিবান উত্থানের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসা পাকিস্তান বহু বছর ধরেই মদত দিয়ে আসছে এই তালিবান গোষ্ঠীকে। শুধু তা-ই নয়, উনিশশো নব্বইয়ের শেষের দিকে তালিবান যখন ক্ষমতায় আসে তখন তাদের সরকারকে যে কতিপয় দেশ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল, তাদের অন্যতম ছিল পাকিস্তান। তবে ২০০১-এর ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদী হামলার পরে ওয়াশিংটনের চাপে তালিবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য হয় ইসলামাবাদ। যদিও দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে কৌশলগত ভাবে দ্বৈত ভূমিকা পালন করে এসেছে তারা— একদিকে আমেরিকাকে তাদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহযোগিতা করেছে এবং অন্যদিকে তালিবানকেও নেপথ্যে মদত দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই পাক জেহাদিদের দ্বারা ২০০৭ সালে জন্ম হয় টিটিপি-র। পাশতুনভাষী খাইবার-পাখতুনখোয়াকে নিয়ে স্বাধীন পাশতুনিস্তান তৈরির স্বপ্ন রয়েছে তাঁদের। কাশ্মীর ইস্যুতেও পাক ফৌজের পুরোপুরি উল্টো অবস্থান নিতে দেখা গিয়েছে টিটিপিকে।
২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সেনা প্রত্যাহার-সহ ও তালিবান উত্থানের পর পাকিস্তান বোঝে পড়শি রাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা বজায় রাখা কঠিন। এদিকে, তালিবানদের পুনরুত্থান শক্তি জুগিয়েছে টিটিপি-কেও। আফগান তালিবান এবং টিটিপি বা পাকিস্তানি তালিবান দু’টি ভিন্ন সংগঠন হলেও সমমনস্ক। অর্থাৎ, আফগানিস্তানে আফগান-তালিবানদের মতোই, পাকিস্তানকে আমেরিকার প্রভাবমুক্ত একটি কট্টর ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় টিটিপি। পাকিস্তানের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও টিটিপি-কে সমর্থন বহাল রাখার জেরে তাই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অবনতি ঘটেছে। গত বছরের শেষে পাকিস্তান সরকারের লক্ষ লক্ষ আফগান উদ্বাস্তুকে দেশছাড়া করার সিদ্ধান্তও বাড়িয়েছে দু’দেশের মধ্যে তিক্ততা। চীন বহু চেষ্টা করেও পারেনি দু’দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে।
ইসলামাবাদের সঙ্গে কাবুলের সম্পর্কে অবনতি হলেও ২০২১-এর পর থেকে কাবুলের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক কিন্তু তুলনামূলক স্থিতিশীল। সরকারিভাবে স্বীকৃতি না দিলেও হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে মানবিক সাহায্য পাঠিয়ে গিয়েছে নয়াদিল্লি। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত গত কয়েক বছরে ৫০ হাজার টনের বেশি গম, ৩০০ টনের বেশি ওষুধ এবং ২৭ টনের বেশি ভূমিকম্প-ত্রাণ পাঠিয়েছে মোদি সরকার। হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল ভারত। সেগুলি ফের মোদি সরকার চালু করুক, তা চাইছেন তালিবান নেতৃত্ব। ‘ছুতমার্গ’ কাটিয়ে নয়াদিল্লি তালিবানকে পুরোপুরি মেনে নিলে বিপদ বাড়বে পাকিস্তানের।
৯ অক্টোবর প্রথম ভারত সফরে আসেন তালিবান সরকারের বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি। চার বছর আগে মার্কিন–সমর্থিত সরকারকে উৎখাত করে তালিবান আবার আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর এটাই শীর্ষ কোনও তালিবান নেতার প্রথম নয়াদিল্লি সফর। মুত্তাকির উপর রাষ্ট্রসংঘের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে এক সপ্তাহের জন্য ওই নিষেধাজ্ঞায় ছাড়পত্র পেয়েছিলেন তিনি। অনেকে পাকিস্তানের সঙ্গে তালিবানের সীমান্ত সংঘর্ষের সঙ্গে মুত্তাকির ভারত সফরের যোগসূত্র খুঁজেছেন। ইসলামাবাদের ক্ষোভের কারণ, তালিবান ও পাকিস্তানের যোদ্ধারা যখন পরস্পরের সীমান্তে মৃতের সংখ্যা বাড়াতে ব্যস্ত, তখন আফগান বিদেশমন্ত্রী মুত্তাকি দিল্লিতে ভারতের অতিথি হিসেবে জনসংযোগে ব্যস্ত। ২০২১–এর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে যে দেশ থেকে ভারতীয় কূটনীতিবিদদের প্রায় প্রাণভয়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল, সেখানে মুত্তাকি আবার তাঁদের হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। নয়াদিল্লি কাবুলে আবার দূতাবাস খোলার কথা ঘোষণা করেছে। চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে চাওয়া আফগানদের আরও বেশি করে ভিসা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন মুত্তাকি। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, আফগান বন্দি মুক্তি ও প্রত্যর্পণ এবং ইরানের চাবাহার বন্দরের উন্নয়ন এবং ব্যবহারের বিষয়ে দু’পক্ষের মধ্যে কথা হয়েছে। এটা ইসলামাবাদের কাছে ভয়াবহ এক কূটনৈতিক বিপর্যয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মুত্তাকির ভারত অভিযান আমেরিকার জন্যও বার্তাবহ। আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যখন বেশ তলানিতে, তখনই আফগান বিদেশমন্ত্রী নয়াদিল্লি সফর করেছেন। হয়তো এটা ট্রাম্পের বাগরাম বিমানঘাঁটি চাওয়ার একটা হালকা প্রত্যুত্তর। পাকিস্তান নিরাপত্তা বিষয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি করে চমক দেখিয়েছে বলে যাঁরা মনে করছেন, তাঁদের জন্য কাবুল-নয়াদিল্লির নৈকট্য নিঃসন্দেহে আরও বড় চমক। এটা যদি ভারত-তালিবান-টিটিপি-বালুচ নেটওয়ার্ক তৈরি করার পথে সামান্যও অবদান রাখে, সেটা পাকিস্তানের কোমর ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কাবুলের কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বাগরাম দখল করতে ট্রাম্প ফের মার্কিন সেনা পাঠাবেন, না কি ‘প্রক্সি যুদ্ধ’-এ পাক সেনাবাহিনীকে মদত দিয়ে যাবেন— সেটাই দেখার। ট্রাম্পের চাটুকারিতা করে পাকিস্তানের কূটনীতি টিকিয়ে রাখার দায় প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের আছে, তালিবানের নয়!