Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আমাদের ‘কপি কালচার’

‘ভাইয়া, আইয়ে, গুড লাক করেঙ্গে! আজ আপ হি মেরা পহেলা কাস্টমার হ্যায়!’ খিদিরপুরের ফ্যান্সি মার্কেটে ঘোরার ফাঁকেই কাঁধে হালকা ছোঁয়া।

আমাদের ‘কপি কালচার’
  • ৯ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: ‘ভাইয়া, আইয়ে, গুড লাক করেঙ্গে! আজ আপ হি মেরা পহেলা কাস্টমার হ্যায়!’ খিদিরপুরের ফ্যান্সি মার্কেটে ঘোরার ফাঁকেই কাঁধে হালকা ছোঁয়া। দেখি, দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে এক যুবক। বয়স ৩৫-৩৬। ফের বললেন, ‘আইয়ে ভাইয়া। আজ গুড লাক আপ হি সে করেঙ্গে!’ দোকানের ভিতরে তাকাতেই চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। এক সে এক বিদেশি ব্র্যান্ডের জিনিস ঠাসা। এত দামি ব্র্যান্ড সাধ্যে কুলবে না, বলতেই মাথা নাড়লেন দোকানদার। বললেন, ‘ও নিয়ে ভাববেন না। ভাবীর জন্য বলমাঁর এই ব্যাগটা দেখুন। দাম ৮০০ ডলার (প্রায় ৬৮ হাজার টাকা)। এখানে ৫ হাজারে মিলবে।’ ‘আসল ব্যাগ?’ অজ্ঞতার প্রশ্নে ফের হাসিমুখে বললেন, ‘এটা ফার্স্ট কপি।’ ব্যাগটা হাতে নিয়ে দেখলাম। সাদা ফোমে মোড়া হ্যান্ডেল। ভিতরে কোম্পানির ট্যাগের সঙ্গে একটা কিউআর কোডও রয়েছে। একেবারে আসলের মতোই। ভিতরে একটা রসিদ। ম্যান্ডারিনে লেখা। এত ছাড়ের পরেও ব্যাগ কিনব না শুনে যুবকটি বললেন, ‘সানগ্লাস দেখবেন? ফেন্ডি আর প্রাডা পেয়ে যাবেন হাজারের মধ্যে!’

Advertisement

ঘটনাচক্রে পরে আলাপ হয়েছিল ওখানকার অন্য এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তাঁর ভাঁড়ারও ছিল দেখার মতো। মঁ ব্লাঁ-ফেরারির পেন, হার্মেসের ডিজাইনার চটি, রোলেক্স-টিসোঁর ঘড়ি—কী নেই সেখানে। ‘সবই পোর্ট থেকে টানা মাল?’প্রশ্ন শুনে একচোট হেসে শুনিয়েছিলেন এই দুনিয়ার ‘গোপন’ গল্প।
ফি বছর একবার বা দু’বার ছোট একটা ‘নকল’ বিশেষজ্ঞদের টিম যায় চীনের গুয়াংঝুতে। কখনও সাত দিন, কখনও বা ১০ দিনের জন্য। সেখানে বড় বড় মার্কেটে ঘুরে ঘুরে তাঁরা বেছে নেয় বিশ্বের সেরা সব ব্র্যান্ডের কপিগুলি। মোটামুটি যেমন প্রি-অর্ডার থাকে, সেই অনুযায়ী চলে ঘোরাঘুরি। কখনও কখনও অন স্পটও মাল দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গুয়াংঝুর ওই বাজারে মূলত তিন ধরনের জিনিস মেলে। প্রিমিয়াম ক্রেতাদের জন্য ফার্স্ট কপি, দোকান-বুটিকের জন্য মিড রেঞ্জ, আর শেষেরটা একদম সস্তা। আম জনতার জন্য। এই সব জিনিসের জন্য বিলও আলাদা। তাতে লেখা থাকে ‘মিরর কপি’ বা ‘শো-রুম কোয়ালিটি’। জিনিসপত্র পছন্দ ও কেনাকাটার পর বুক করতে হয় কনসাইনমেন্ট। ১০০ ইউয়ান দিয়ে (ভারতীয় টাকার অঙ্কে বর্তমানে যা প্রায় ১২০০ টাকা)। তারপর সেই বুকিংয়ের রিসিট নিয়ে ঘরের ‘ক্যারিয়ার’ ঘরে ফিরে আসে। তবে এই ব্র্যান্ডেড জিনিসপত্রের জন্য ‘ক্যারিয়ার’ প্রতি কেজিতে হাজার টাকা আর সাধারণ জিনিসের কেজিপ্রতি ৫০০-৬০০ টাকা নেয়। অর্ডারের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মাল ডেলিভারি হয়ে যায়। সেই খবর দিয়ে দেওয়া হয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। সঙ্গে জিনিসের ছবি-ভিডিও। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তা দেখে প্রয়োজনমতো অর্ডার দেন। রেট ফাইনালের পর গ্রিন সিগন্যাল পেলেই শুরু হয় ডেলিভারি। একাধিক হাত ঘুরে সেই সমস্ত জিনিস পৌঁছে যায় বিভিন্ন দোকানের শোকেসে।
বছরখানেক আগে একবার খিদিরপুর গিয়ে ওই ব্যবসায়ীর খোঁজ করেছিলাম। দেখা হয়নি। তাঁরই সুবাদে পরিচিত এক দোকানদার জানালেন, ভাইয়া পুরনো ব্যবসা ছেড়ে এখন ফলের কারবার করেন। কিছুটা দুঃখ করে বললেন, ‘দাদা, এখন লোক আসা অনেক কমে গিয়েছে। আর সেই বাজার নেই। এখন তো সব অনলাইনেই...।’ বুঝলাম, বাজার ঠিকই আছে। শুধু বদলে গিয়েছে লোকেশন। দেশের মার্কামারা কিছু জায়গার গণ্ডি ছাড়িয়ে দিল্লি থেকে দার্জিলিং, নভি মুম্বই থেকে নদীয়া—প্রায় সর্বত্রই হাজির এই বাজার। কিছুক্ষণ ফেসবুক রিলস বা ইনস্টাগ্রামের ফিড স্ক্রল করলেই চোখে পড়ে গুচির বেল্ট, নাইকির স্নিকার্স, অ্যাপলের এয়ারপডস বা লুই ভিঁতোর ব্যাগ বিক্রির পোস্ট। কিন্তু দাম শুনলেই বোঝা যায়, এগুলি ঠিক ‘ব্র্যান্ডেড’ নয়। তাতে অবশ্য থোড়াই কেয়ার তরুণ প্রজন্মের। তাঁদের একটা বড় অংশই এখন ‘ফার্স্ট কপি’, ‘মাস্টার কপি’ বা ‘ডিউপস’ (ডুপ্লিকেটের সংক্ষিপ্ত রূপ)-এ মজে। 
বণিকসংস্থা ফিকি’র ক্যাসকেডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে ভারতে বেআইনি নকল পণ্যের বাজারের অর্থমূল্য ছিল ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা। যার মধ্যে শুধুমাত্র পোশাকের বাজারই ছিল ৪ লক্ষ ৩ হাজার ৯১৫ কোটি টাকার। চমকে উঠলেন? এখনও চমকের বাকি রয়েছে। একাধিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৮০% নকল পণ্যই তৈরি হয় এশিয়াতে। নেতৃত্বে অবশ্যই চীন। আর ভারতেও তাদের সাপ্লাই চেইন দিনে দিনে আরও উন্নততর হচ্ছে। অপর একটি সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ভারতে অনলাইনে কেনা নকল ফ্যাশন আইটেমের ৬৫% ক্রেতাই ১৮–৩৫ বছর বয়সি। তাঁদের কেউ মজে ফার্স্ট কপিতে (আসলের সঙ্গে মিল ৯৫-৯৯%), কেউ বা আবার মাস্টার কপি (৮০-৯৫% মিল) বা সেকেন্ড কপিতে (৫০-৮০% মিল)। তাঁদের মতে, আসলের ১০ ভাগ দামে ৯০ ভাগ অভিজ্ঞতা পাওয়া যাচ্ছে। লাভ তো আমাদেরই হচ্ছে।
এই কমবয়সিদের একটা বড় অংশ আবার কাউন্টারফিটের বদলে (এরা আসল ব্র্যান্ডের লোগো, ট্রেডমার্ক অবৈধভাবে ব্যবহার করে) ‘ডিউপস’ (এগুলি দেখতে হুবহু এক হলেও বাজারে আসে ভিন্ন নামে। ফলে আইনি জটিলতাও কম থাকে) ব্যবহারে বেশি আগ্রহী। শুধু তাই নয়, জেন-জি’র বড় অংশই ‘ডিউপস’ কেনাকে ‘স্মার্ট শপিং’ বলে মনে করেন। তাঁদের কাছে ডিউপস আসলে কাউন্টারফিটের ‘গেটওয়ে ড্রাগ’।
কিন্তু কেন এই বয়সের ক্রেতারা ঝুঁকছেন এই ‘অন্ধকার’ বাজারে? বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ সাধ ও সাধ্যের মধ্যে বাড়তে থাকা ফারাক। ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে অফিসের (এনএসএসও) একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ভারতের তরুণ প্রজন্মের ৬০ শতাংশের মাসিক আয় ১৫ হাজারের নীচে। অথচ তাঁদের অনেকেরই পছন্দের তালিকায়  রয়েছে  ৮০ হাজার টাকার গুচি বেল্ট বা ৯০ হাজার টাকার অ্যাপল ওয়াচ আল্ট্রা ২। কেনা অসম্ভব। তাই কপি এডিশন কিনেই নিজেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় সফল ও ফ্যাশনেবল হিসেবে তুলে ধরেন অনেকে। সাময়িক হলেও এই পণ্যগুলি তাঁদের একটা মানসিক শান্তি দেয়। সেই কারণেই ‘অ্যাফোর্ডেবল লাক্সারি’র দিকে বাড়ছে ঝোঁক।
ফার্স্ট কপি, সেকেন্ড কপি, মাস্টার কপি বা ডিউপসের-এর এই হাইপ শুধু একটি প্যারালাল মার্কেট তৈরি করেছে, এমনটা নয়। সঙ্গে গড়ে তুলেছে একটি সমান্তরাল অর্থনীতিও। আর সেই ইকোসিস্টেমকে আরও জোরদার করার নেপথ্যে বড় ভূমিকা রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের। আসলে জেন-জি’দের মধ্যে নিজেকে একটি ডিজিটাল ‘ট্রাইব’ বা গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে তুলে ধরার মারাত্মক প্রবণতা রয়েছে। এই ডিজিটাল ট্রাইব হয় স্টাইল, লোগো, ব্র্যান্ড চয়েস বা তার ডিউপসের মাধ্যমে। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক রিলস—সব প্ল্যাটফর্মেই এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁদের কথা একদম স্পষ্ট—‘এটা এখন ট্রেন্ডিং। সবার আছে। আমারও চাই!’
এই চাহিদাকেই কাজে লাগাচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা। কনটেন্ট ক্রিয়েটররা নকল পণ্যের রিভিউ করেন, রিলে বলেন, ‘এই জুতো আসলের চেয়েও আরামদায়ক’। কেউ কেউ আবার একধাপ এগিয়ে আসল ও ফার্স্ট কপির মধ্যে গুণগত মানের তুলনামূলক বিচারও করেন। লাখ লাখ ভিউজের সঙ্গে ভাইরাল হয় রিল, পোস্ট। তার মধ্যেই কমেন্ট সেকশনে ‘গতকাল পেয়েছি, একদম ফাটাফাটি!’ টাইপের রিয়েল-টাইম ফিডব্যাক চলে আসে। দর্শকদের আস্থা বাড়ে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ‘ভাই লিঙ্ক দাও’, ‘দিদি, কোথায় পাবো?’র মতো কমেন্টের বন্যা। ব্যস, অর্ধেক কাজ শেষ। এর মধ্যেই কেউ কেউ আবার ‘চেরি অন দ্য টপে’র মতো করে ডিসকাউন্ট কোডও দেন। এর পরেই আসরে নামেন সাপ্লায়াররা (ডার্ক স্টোর/ ফ্যাক্টরি)। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামের প্রাইভেট গ্রুপে ‘স্টক লিমিটেড’ মেসেজ ভেসে ওঠে বারংবার। শেয়ার হয় বাল্ক অর্ডারের ভিডিও। ফেসবুক গ্রুপ, টেলিগ্রাম চ্যানেলে তৈরি হয় ‘রেপ্লিকা কালেক্টর’ কমিউনিটি। সেখানে জিনিসের ফটো শেয়ার, সাপ্লায়ার রেটিং, ডেলিভারি ট্র্যাকিং—সব কিছুর উল্লেখ থাকে। মূল লক্ষ্য একটাই—আগ্রহীদের মধ্যে ফোমো তৈরি করা। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের এই প্রচার অবশ্য দাতব্য নয়। নিজের পেজের লাইক-ভিউ বাবদ আসা অর্থের পাশাপাশি সাপ্লায়ারদের থেকেও মেলে ভালো অঙ্কের পারিশ্রমিক। মুম্বইয়ের একটি কেস স্টাডিতে দেখা গিয়েছে, সাপ্লায়াররা ৫০০ টাকার ‘গুচি’ বেল্ট প্রমোট করার জন্য ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা।
বর্তমানে এই বাজার এতটাই শক্তিশালী যে ফেক ব্র্যান্ড বা লোগো নিয়ে ফটো আপলোড, হ্যাশট্যাগ দিতেও কেউ দু’বার ভাবে না। আইন ভঙ্গই যেন একটা ‘কুল ট্রিক’। তার সঙ্গে জন্ম নিয়েছে একটা সমান্তরাল স্ট্যাটস সিম্বলের সংজ্ঞা। দিল্লির সাউথ এক্সটেনশনে রমরমিয়ে চলে ‘রেপ্লিকা হাউস পার্টি’—যেখানে শো অফ করা হয় বাজারের সেরা সেরা ‘কপি কালেকশন’।
এই পরিস্থিতিতে রাশ টানতে না পারলে এই শ্যাডো ইকোনমি যে আরও ফুলেফেঁপে উঠবে, তা বিলক্ষণ জানেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। আর তা রুখতেই সাইবার সেলের বিশেষ টাস্ক ফোর্স, নকল জিনিস কিনলে ক্রেতাকে জরিমানা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স টুলস দিয়ে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে অটো-স্ক্যান বাধ্যতামূলক করার মতো নিদানও দিয়েছেন অনেকে। এত কিছুর পরেও কিন্তু ফাঁকটা থেকেই যাচ্ছে। কারণ একদিকে ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের ‘প্রিমিয়াম ইমেজ’ ধরে রাখতে গিয়ে মাঝারি দামের বাজার প্রায় ফাঁকা রেখেছে। সেই শূন্যতায় জাঁকিয়ে বসেছে ফার্স্ট কপির এই মার্কেট। 
একটা বিষয় স্পষ্ট। যতদিন না পর্যন্ত সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আসবে, জেন-জি বুঝবে লোগো নয়, লাইফস্টাইলই আসল, ততদিন এই ‘ফেক ইট টিল ইউ মেক ইট’ মানসিকতাও থাকবে। বুক বাজিয়ে বেঁচে থাকবে ‘কপি কালচার’।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ