খেলা এখন আর নিছক মাঠে যুবদের দৌড়ঝাঁপ, ছুটোছুটি নয়। ভোটের প্রতিযোগিতাও ‘খেলা হবে’ নামক চ্যালেঞ্জ আখ্যা পেয়েছে সাম্প্রতিক অতীতে। সেই খেলারই পরিবর্ধিত রূপ উপহার দিয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া। এসআইআর গতবছর হয়েছে বিহারে। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং রাজ্য মিলিয়ে অতঃপর ১২টি জায়গার পালা। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম পশ্চিমবঙ্গ। বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হতেই ধাপে ধাপে খেলাই দেখছে মানুষ। বাজিকরের নাম জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। এই সংস্থা কোনদিন যে কোন খেলা দেখাবে তা আন্দাজ করাই কঠিন হয়ে পড়ছে আম জনতার পক্ষে। মনে রাখাও দুঃসাধ্য, দৃশ্যমান খেলাটি কততম? চলমান খেলাটির নাম শুনানি, ৭ নম্বর ফর্মের ভিত্তিতে। ভোটার তালিকা থেকে আপত্তিকর নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করতেই এই ফর্ম জমা দিতে হয়। ৭ নম্বর ফর্মের ভিত্তিতে শুনানি শুরু হয়েছে শনিবার। আর তা আরম্ভ হওয়ামাত্রই পদ্মপার্টির কারসাজি চলে এসেছে প্রকাশ্যে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ফর্ম ৭ জমা দিয়ে বহু ‘জীবিত’ মানুষকে ‘মৃত’ বানাবার চেষ্টা হয়েছে। শনিবার শুনানিতে গিয়ে বিক্ষোভ দেখালেন তাঁরাই। ভোটারদের হেনস্তার এহেন ভূরি ভূরি অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলা উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। এমনকি এমন বহু ব্যক্তিকে ‘ডিফ্যাক্টো’ ভোটার চিহ্নিত করা হয়েছে, যাঁদের নিজের নাম কিংবা তঁদের মা-বাবার নাম রয়েছে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায়। উল্লেখ্য, ‘ডিফ্যাক্টো’ ভোটার চিহ্নিত তিনি বা তাঁরাই—যাঁর বা যাঁদের ‘মৃত’ কিংবা ‘স্থানান্তরিত’ জানিয়ে অন্যের তরফে আপত্তি জানানো হয়েছে।
সংগঠিত চক্রান্ত ছাড়া এই অন্যায় করা সম্ভব নয়। এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে নিশ্চয় কোনো ধান্দাবাজ রাজনৈতিক শক্তি সক্রিয়। স্বভাবতই এই অন্যায়ের প্রতিকার দাবি করে বিডিও অফিসে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন চক্রান্তের শিকার ব্যক্তিরা। তার ক্ষোভ আছড়ে পড়েছে শুনানি কেন্দ্রেও। সবচেয়ে বড়ো অভিযোগ এসেছে খড়দহ বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত পানিহাটি পুরসভার ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে। ফর্ম ৭ জমা দিয়ে ওই ওয়ার্ডের ১৩৩ নম্বর বুথের ১৪৫ জন নাগরিককে ‘মৃত’ বলে দাবি করা হয়েছে। ভাবা যায়, একটিমাত্র বুথের এতজন ভোটারকে নিয়ে সন্দেহপ্রকাশ! এই আপত্তিকে সহজ বা স্বাভাবিক ভেবে নেওয়া কঠিন। এই ব্যক্তিদের মধ্যে খোকন মোল্লা, কুতুবউদ্দিন মোল্লাসহ অনেকেই এদিন সশরীরে হাজির হয়ে কমিশনকে জানান দিয়েছেন যে, তাঁরা রীতিমতো ‘জীবিত’। তাঁরা কোনো ভূত-প্রেত নন, আর পাঁচজনের মতোই রক্তমাংসের মানুষ এবং যাবতীয় অধিকার নিয়েই তাঁদের ভারতে বসবাস। ৭ নম্বর ফর্ম জমার সৌজন্যে ‘নন ইন্ডিয়ান’ তকমা সেঁটে গিয়েছে খড়দহ বিধানসভা কেন্দ্রের বিলকান্দার ২১৫ জন ভোটারের গায়ে। নীলকান্ত-২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ওই বাসিন্দাদের অথবা তাঁদের মা-বাবার নাম রয়েছে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায়। তাঁদের কারো কারো পাসপোর্ট পর্যন্ত রয়েছে। এরপরও কেন তাঁরা ‘ভারতীয় নন’ বলে চিহ্নিত হয়ে গেলেন? এই ইস্যুতে তুমুল বিক্ষোভ চলে ওই বিডিও অফিসে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে এই ‘কীর্তি’ দুই বিজেপি কর্মীর। কিছু ‘বৈধ’ ভোটারকে হেনস্তা করার রাজনৈতিক মতলবে তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদনপত্র বা ফর্ম ৭ জমা দিয়েছেন তাঁরাই।
এই ব্যাপারে বিজেপির পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, ‘রোহিঙ্গাসহ কিছু প্রকৃত অনুপ্রবেশকারীর নাম নিয়েই আপত্তি জানানো হয়েছে। এবার তাঁরা নিজেদের ‘ভারতীয়’ প্রমাণ করুন।’ একই কাণ্ড ঘটেছে বাদুড়িয়ায়। সেখানকার ৪৫ নম্বর বুথের জ্বলজ্যান্ত ৩৩ জন নরনারীকে ‘মৃত’ বানাবার অপচেষ্টা সামনে এসেছে। এছাড়া ৮০ নম্বর বুথের ১২ জনকে ‘ডিফ্যাক্টো ভোটার’ দেখানো হয়েছে একই কায়দায়। বিডিও অফিসে গিয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন সেই ‘মৃতরাও’! তাঁদের মধ্যে একজন আবার প্রাক্তন সেনাকর্মী, যিনি নিজের জীবন বাজি রেখেই আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন দেশের জন্য। এলাহি বক্স নাম ওই ব্যক্তি এজন্য নিজের ডেথ সার্টিফিকেটও দাবি করেছেন ইসিআইয়ের কাছে! কমিশনের কাজকর্ম দেখে এটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, ভোটার তালিকার সংশোধন মূল লক্ষ্য নয়, তাদের কাছে অগ্রাধিকার কিছু বিশেষ নাম বাদ দেওয়া। না-হলে ৭ নম্বর ফর্মে আপত্তি গ্রহণের সঙ্গে গ্রাহ্য নথিও জমা নিতে হত। কমিশন কিন্তু তা বাধ্যতামূলক করেনি। অর্থাৎ ভোটারের হয়রানিকেই নিশ্চিত করা হয়েছে এই প্রক্রিয়ায়। তাই সংগত দুটি প্রশ্ন উঠবেই, ভোটযন্ত্রে কোনো একটি বিশেষ দলকে বাড়তি ফায়দা তুলে দিতেই এই কাণ্ড নয় তো? এতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনের পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে না কি?