সংবাদদাতা, ডোমকল: কোমল হাতগুলিতে ওঠার কথা বই-খাতা। অথচ ওই হাতগুলি দিয়েই উঠছে শক্ত ইট। তাও এক হাজার কাঁচা ইট সাজানোর বদলে মাত্র ৫০ টাকা মজুরি মেলে শিশু শ্রমিকদের। অভিযোগ, দারিদ্রকে হাতিয়ার করে এভাবেই ইটভাটাগুলিতে কাজে লাগানো হচ্ছে শিশুদের। একটা-দু’টো ভাটা নয়, ডোমকল মহকুমার একাধিক ভাটাতেই এভাবেই কম মজুরির সুযোগ নিয়ে শিশুদের কাজে লাগাচ্ছে ইটভাটাগুলি। মহকুমার একাংশের বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসন দেখেও কিছু দেখছে না। তাই অবাধেই চলছে শিশুদের কাজে লাগানোর এই বেআইনি কারবার।
সরকারি আইন বলছে ১৪ বছরের নীচে কোনও শিশুকে ইটভাটা বা তার মতো ভারী কাজে লাগানো যাবে না। শুধু নিয়ম নয়, কড়া আইনও রয়েছে এক্ষেত্রে। কিন্তু শ্রম, মানবাধিকার, শিশু সুরক্ষা, শিক্ষার অধিকারের সব আইন যেন এসে থমকে যায় এই ইটভাটাগুলির দরজায়। নজরদারি না থাকার সুযোগে ইটভাটাগুলিতে ব্যাপকভাবে শিশুদের কাজে লাগানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।
একাধিক ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কাজ করছে একাধিক শিশু। ডোমকলের একটি ইটভাটায় গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, সেখানে কাজ করছে বছর ১২-র এক বালক। একটু কথা বলেই জানা গেল, ওই বালকের বাড়ি ইটভাটার কাছেই। সাইকেলে করে এসেছে সে। প্রতি এক হাজার কাঁচা ইট সাজানোর বদলে সে পায় ৫০ টাকা। অপর একটি ভাটাতে কাজ করা আর এক নাবালকের সঙ্গে কথা বলে যা জানা গেল, ট্রাক্টরে ইট লোড করার ক্ষেত্রে প্রতি হাজারে ১৫০ টাকা করে পায় তারা।
কিন্তু বড়রা থাকতেও ছোটোদের দিয়ে কাজ কেন? নাম প্রকাশ না করার শর্তে খোলাসা করলেন একটি ইটভাটার কর্মী। তিনি বলেন, আপনার মনে হয় এক হাজার ইট সাজানোর বদলে ৫০ টাকা মজুরি নেবে বড়রা? বদলে তাদের দিতে হবে কয়েকগুণ টাকা। কিন্তু ওই একই কাজ ছোটোদের দিয়ে করিয়ে নিয়ে হাতে অল্প কয়েকটা টাকা গুঁজে দিলেই তো ল্যাটা চুকে গেল।
শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের এক কর্মকর্তা বলেন, একদিকে ইটভাটা মালিকদের অত্যাধিক লোভ। অপরদিকে প্রশাসনের নজরদারির অভাবের বলি হচ্ছে ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা। যাদের হাতে বই-খাতা থাকার কথা তারাই আজ ইটভাটায় কাজ করছে। আমরা কয়েকটি ভাটাকে একবার সতর্কও করেছিলাম। কিন্তু প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় তারা খুব একটা কর্ণপাত করেনি। এগুলি বন্ধ হওয়া দরকার। মাস কয়েক আগেও ডোমকলের একটি ইটভাটায় ধস নেমে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। ইটভাটায় কাজ করার সময় দুর্ঘটনার কারণেই ওই মৃত্যু হয়েছিল বলে সেই সময়ে অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু তারপরেও এখনও বিভিন্ন ইটভাটায় শিশুদের দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যেই ভাটাগুলিতে শিশুদের কাজে লাগানো হচ্ছে সেগুলি প্রশাসনের সিল করে দেওয়া দরকার।
এদিকে শিশুদের নিয়ে ইটভাটায় কাজ করানোর ওই অভিযোগ মানতে নারাজ ইটভাটা মালিকদের সংগঠন। ডোমকল মহকুমা ব্রিক ফিল্ড ওনার্স সংগঠনের সভাপতি এনামুল হক বলেন, ইটভাটাগুলিতে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা আমরা কমিয়ে একেবারে শূন্যের কাছে নিয়ে চলে এসেছি। আমাদের তরফে বিভিন্ন মিটিংয়ে ইটভাটার মালিকদের সচেতন ও সতর্ক করা হয়। তারপরেও দু’একটি ভাটায় বিক্ষিপ্তভাবে এইরকম ঘটে থাকলে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
এবিষয়ে শ্রমদপ্তরের ডোমকলের মহকুমার অ্যাসিস্ট্যান্ট লেবার কমিশনার সুদর্শন সরকার বলেন, সমস্যাটি আমাদের নজরে রয়েছে। তবে ইটভাটাগুলিতে হুট করে হানা দেওয়ার জন্য আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ প্রয়োজন। নির্দেশ ছাড়া আমরা কোনও ভাটায় অভিযান চালাতে পারি না।