Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অনলাইন মানি গেমস ও এক অস্থির ভবিষ্যৎ

রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। আলো নিভিয়ে মোবাইল হাতে বসে আছেন অনির্বাণ দত্ত (নাম পরিবর্তিত)। এক বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মী। পরিবার ঘুমিয়ে পড়েছে বহুক্ষণ। কিন্তু তাঁর চোখে ঘুম নেই।

অনলাইন মানি গেমস ও এক অস্থির ভবিষ্যৎ
  • ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। আলো নিভিয়ে মোবাইল হাতে বসে আছেন অনির্বাণ দত্ত (নাম পরিবর্তিত)। এক বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মী। পরিবার ঘুমিয়ে পড়েছে বহুক্ষণ। কিন্তু তাঁর চোখে ঘুম নেই। মোবাইল স্ক্রিনে খোলা জনপ্রিয় এক অনলাইন গেমিং অ্যাপ। কয়েকজন সহকর্মীকে দেখে কিছুটা ক্যাজুয়ালভাবেই প্রথমে কয়েকশো টাকা দিয়ে খেলা করেছিলেন। আসলে টাকাটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল, সবাই খেলছে। কীভাবে খেলাটা হয়, সেটা দেখা-বোঝা। শুরুর দিকে বেশ কয়েকবার অল্প টাকা দিয়ে খেলে জিতে যান। অ্যাকাউন্টে জ্বলজ্বল করতে থাকে প্রায় ডাবল অঙ্ক। পর পর বেশ কয়েকটা জয় কনফিডেন্স বাড়িয়ে দেয়। অনির্বাণের মনে হচ্ছিল, ভাগ্যদেবী বুঝি তাঁর প্রতি বিশেষ সহায়। খেলাটা খুব সহজেই রপ্ত হয়ে যায়। হার-জিত মিলিয়ে চলছিল দিব্যি। সঙ্গে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে টাকার অঙ্ক। ৫০০-৭০০ টাকার গণ্ডি পেরিয়ে তা পৌঁছে গিয়েছে হাজারে। গত এক বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খুইয়েছেন এই খেলায়। কিন্তু ক্রমেই আরও জাঁকিয়ে বসেছে খেলার নেশাটা। প্রত্যেকবার হারের পর মনে হতো, ‘আর একবার চেষ্টা করে দেখাই যাক না। একবার ভাগ্য সহায় হলেই তো সব লস উসুল হয়ে যাবে।’ কিন্তু আমরা যা ভাবি, তা তো হয় না। তাই লাভের মুখ দেখা তো দূর কি বাত, ধীরে ধীরে নিজের যাবতীয় সঞ্চয়, বাড়ির জমানো জরুরি তহবিলের টাকা ঢেলেও সামাল দেওয়া যায়নি। শেষপর্যন্ত ব্যক্তিগত ঋণ নিতে হয়েছে। ঠিক সময়ে সেই টাকা শোধ না করতে পারলে মহা বিপদ। কিন্তু এত কথা বাড়ির বাকিদের কীভাবে বলা যাবে, জানেন না অনির্বাণ।

Advertisement

এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারতের তরুণ প্রজন্মের বাস্তব চিত্র। যাঁদের জীবনে অনলাইন গেম অর্থাৎ রিয়েল মানি গেমিং এক ভয়াবহ নেশায় পরিণত হয়েছে। আর ক্রমেই এই খেলার প্রভাব পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে পড়েছে সমাজ ও অর্থনীতিতে। শেষপর্যন্ত পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যে, এই ধরনের গেম বন্ধ করতে কেন্দ্রীয় সরকারকে আইন আনতে হয়।
অনলাইন গেমিং কী? মোবাইল বা কম্পিউটারে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে সমস্ত খেলা হয়, সেসবই এই অনলাইন গেমিংয়ের আওতায় পড়ে। এই গেমিংয়েরও আবার ভাগ রয়েছে। কিছু খেলা নিছকই বিনোদনের জন্য। আবার কিছু একেবারে নির্দিষ্টভাবে ‘রিয়েল মানি গেম’। যেখানে খেলার জন্য টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। হার-জিতের ভিত্তিতে টাকার পরিমাণ ওঠানামা করে। ‘ড্রিম ১১’, ‘এমপিএল’, ‘রামি সার্কেল’, ‘পোকারস্টারস’ বা ‘তিন পাত্তি’—এমন অসংখ্য অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মায়া-ফাঁদে আকৃষ্ট হয়েছিল ভারতের তরুণ সমাজ। আইপিএলের মরশুমে রীতিমতো সংক্রামক জ্বরের মতো ছড়িয়ে পড়ে ড্রিম১১, এমপিএলের মতো ফ্যান্টাসি স্পোর্টস প্ল্যাটফর্মগুলি। অনলাইন পোকার, রামির মতো গেমগুলি ছিল ক্যাসিনোর ডিজিটাল ভার্সন। আবার অন্যতম হিট ‘ডিজিটাল ক্যাসিনো গেম’-এ স্লট মেশিনই ছিল খেলার মূল আকর্ষণ। মজার বিষয়, সমাজের সব স্তরের যে কোনও মানুষ যাতে এই ধরনের গেম খেলতে পারে, তার জন্য খেলার পদ্ধতিও ছিল অত্যন্ত সহজ। প্লেয়ারদের ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং, ক্রেডিট কার্ড বা ইউপিআই পেমেন্টের মাধ্যমে অনলাইন গেমিং অ্যাপের ওয়ালেটে টাকা জমা রাখতে হতো। প্রতিবার খেলা শুরুর আগে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের এন্ট্রি ফি (বাই-ইন) দিতে হতো। এরপর খেলার ফলাফলের উপর নির্ভর করতো লাভ বা ক্ষতি। তবে এই খেলার মূল আকর্ষণই ছিল টাকার টান। ধরা যাক, একজন খেলোয়াড় যদি ৫০০ টাকা দিয়ে খেলা শুরু করলেন। প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে জিতলে চোখের নিমেষে সেই অঙ্ক ৫ হাজার হয়ে যেতে পারে। আবার হারলে পলক ফেলার আগেই উধাও হয়ে যেতে পারে ৫০০ টাকাও। প্রতি মুহূর্তে হার-জিতের এই অনিশ্চয়তা থেকেই জন্ম নিত তীব্র উত্তেজনা। তবে প্লেয়ারদের লাভ বা লস যাই হোক না কেন, প্রতিবারের খেলাশেষে প্ল্যাটফর্ম নিজের কমিশন (১০-২০%) ঠিকই কেটে নিত।
শুনে বা পড়ে এই খেলার ভয়াবহতা আসলে সেভাবে বোঝা যায় না। কিন্তু বাস্তব ছবিটা অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে যাঁরা নিয়মিত টাকা দিয়ে গেম (রিয়েল মানি গেমিং) খেলতেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষই দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে টাকা খুইয়েছেন। খুব অল্প সংখ্যক মানুষই বড় অঙ্কের টাকা জিততে পেরেছেন। 
এখানেই প্রশ্ন ওঠে, এত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেন তরুণ সমাজ এই ধরনের খেলায় আকৃষ্ট হন? এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, তরুণদের হাতে রয়েছে সস্তা ডেটা, স্মার্টফোন এবং অঢেল অবসর সময়। দ্বিতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখধাঁধানো বিজ্ঞাপনের চমক তরুণদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করে। সঙ্গে ছিল বিজ্ঞাপনে সেলিব্রিটিদের উপস্থিতি। বিরাট কোহলি, মহেন্দ্র সিং ধোনি, শাহরুখ খান, হৃত্বিক রোশন, আমির খান, রণবীর কাপুরদের মতো তারকা এই গেমিং প্ল্যাটফর্মগুলির হয়ে প্রচার করতেন। বিজ্ঞাপনের ক্যাচলাইন মেনে তাঁদের মুখে শোনা যেত, ‘খেলুন, জিতুন, হয়ে উঠুন চ্যাম্পিয়ন’-এর মতো প্ররোচনামূলক বার্তা। অভিযোগ, তরুণরা প্রিয় নায়ক বা রোল মডেলের মুখে এই সমস্ত প্ল্যাটফর্মের বারংবার প্রচারে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, এতে কোনও দোষ নেই। প্রথম দিকে এই খেলায় ছোটখাটো জয় সেই ভাবনাকে এক ধাক্কায় অনেকটাই বাড়িয়ে দিত। মোবাইলে ডুবে থাকা একটা প্রজন্ম আরও গভীরভাবে মনোনিবেশ করত এই খেলায়। প্রতিটা ম্যাচে হারের পর চিন্তা করত, কী কী ভুল হল। পরের ম্যাচে টাকা লাগানোর আগে ভুলগুলি কীভাবে শুধরে নেওয়া যায়, চলত সেই স্ট্র্যাটেজি তৈরি। আসলে মানসিক ভাবেও এই খেলাগুলি আমাদের মনে আসক্তি তৈরি করে। মাথার ভিতরে চলতে থাকে ‘ডোপেমিন রাশ’। অর্থাৎ প্রতিবার খেলায় হার বা জিতের পর খেলোয়াড়দের মস্তিষ্কে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতো। যা আরও বেশি করে এই ধরনের খেলার দিকে ঠেলে দিত প্লেয়ারদের। নিজের অজান্তেই। 
এই খেলার সামাজিক পরিণামও ভয়াবহ। বহু মানুষ গোপনে টাকা খুইয়ে ক্রমেই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। বহু টাকা খুইয়ে তরুণ খেলোয়াড়ের আত্মহত্যা করার মতো ঘটনাও সামনে এসেছে। অর্থমন্ত্রকের হিসেব অনুযায়ী, অনলাইন গেমিংয়ের ফাঁদে পড়ে ভারতে ৪৫ কোটি মানুষ নিয়ম করে আর্থিকভাবে লোকসানের সম্মুখীন হন। তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছেন, এই সমস্ত প্ল্যাটফর্মে প্রতি বছর মানুষ ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি খুইয়েছেন। আসলে বিনোদনের আড়ালে ভারতে অনলাইন গেমিং ক্রমেই এক দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠছিল। এর মধ্যেই গত মাসে  আইন করে কেন্দ্রীয় সরকার অনলাইন মানি গেমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সরকার সাফ জানায়, আর্থিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে যেসব অ্যাপ অথবা অনলাইন সংস্থা অর্থলগ্নি করতে বলবে, তাদের পরিচালক ও মালিকদের অন্তত তিন বছরের জেল বা ১ কোটি টাকা জরিমানা অথবা দুটোই হবে। অনলাইন মানি গেমের যে কোনওরকম প্রচারে যুক্ত থাকলে বিজ্ঞাপনদাতা, মডেল, সংবাদমাধ্যম সকলের বিরুদ্ধেও ওই আইন কার্যকর হবে। সেক্ষেত্রে ২ বছরের জেল এবং ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে কর্ণাটক হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছে ‘এ২৩’ নামে একটি ভারতীয় গেমিং সংস্থা। তাদের দাবি, দক্ষতা নির্ভর খেলাকে এভাবে বন্ধ করে দেওয়া হলে বহু সংস্থা বিপুল ক্ষতির মুখে পড়বে।
এই দাবি যে ভুল নয়, তাও শোনা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই আইনের ফলে ৩২ হাজার কোটি টাকার অনলাইন গেমিং শিল্পে বড় ধাক্কা এসেছে। প্রশ্নের মুখে ২০ হাজার চাকরির ভবিষ্যৎ। কর্মহীনদের তালিকায় রয়েছেন ডিজাইনার, প্রোগ্রামার, মার্কেটিং এক্সপার্ট, কাস্টমার সাপোর্ট স্টাফরা। তাঁদের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? এক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে এডু-টেক, ফিন-টেক বা সাধারণ মোবাইল গেমিং (যেখানে টাকার লেনদেন নেই) ক্ষেত্র কিছুটা সুযোগ দিতে পারে। তবে সেখানে কত সংখ্যক লোক কাজের সুযোগ পাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফের চিন্তাভাবনা করার জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে অনুরোধ জানিয়েছে ইন্ডিয়া গেমিং ফেডারেশন, ই-গেমিং ফেডারেশন, ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ফ্যান্টাসি স্পোর্টস। যদিও এই আবেদনে কাজের কাজ কতটা হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। 
কারণ অনির্বাণ দত্তের মতো অসংখ্য তরুণ এই সমস্ত খেলার নেশায় ডুবে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনলাইন মানি গেমিংয়ের নামে এই ডিজিটাল জুয়া তাঁদের পরিবার, সমাজ ও দেশের অর্থনীতিতে ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলেছে। সরকারের নিষেধাজ্ঞা হয়তো আপাতত এই প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, কিন্তু এটাকে সমাধান বলে ধরে নিলে হবে না। আসলে এই সমস্যার পূর্ণ সমাধানের জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা। যাতে তরুণরা বুঝতে পারে, দ্রুত ধনী হওয়ার লোভ দেখিয়ে এই খেলা আসলে একটা গোটা প্রজন্মকে অতল গহ্বরে টেনে নিচ্ছে। অন্যদিকে, বিকল্প পথ খোঁজাও জরুরি। যাতে মানুষের জীবন নষ্ট না করে বিনোদন ও প্রযুক্তি একসঙ্গে মিলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এই গোটা পর্বের অভিজ্ঞতা আমাদের একটা বিষয়ই মনে করিয়ে দেয়—ডিজিটাল দুনিয়ার প্রতিটি প্রলোভন নিছকই বিনোদন নয়। কখনও কখনও বিনোদনের আড়ালে তা হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য মরণ-ফাঁদ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ