১৪০ কোটি মানুষের ভারতে সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম বেকারত্ব। সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলিই রাজনীতির কারবারিদের কাছে উৎকৃষ্ট নির্বাচনী পণ্য। এজন্য বিধানসভা, লোকসভাসহ সমস্ত ভোটের আসরে যেসব ইস্যুতে তরজা জমে ওঠে তার শীর্ষে থাকে বেকার সমস্যা। ২০১৩-১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি বেকারত্ব ইস্যুতেই যুবসমাজের মন জয় করেছিলেন। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রথমবারের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল নেহরু-গান্ধী পরিবার এবং কংগ্রেস সরকার। তাঁর অভিযোগ ছিল, কংগ্রেস সরকারগুলির অকর্মণ্যতার কারণে এবং সদিচ্ছার অভাবেই যুবসমাজের এই দুর্দশা। কেন্দ্রে সরকার গঠনে যুবসমাজের সমর্থন ভিক্ষা করেছিলেন মোদি। তিনি কথা দিয়েছিলেন, তাঁর সরকার এই যুবসমাজের প্রত্যেকের হাতে হাতে কাজ দেবে। তার ফলে এই বেকার বাহিনীই, যারা দেশের ‘বোঝা’ বলে গণ্য হচ্ছে, তারাই হয়ে উঠবে সম্পদ সৃষ্টির, দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারিগর। বছরে কত চাকরি দেবে মোদি সরকার, সেই পরিসংখ্যান বহু চর্চিত, তার উল্লেখ আজ নিষ্প্রয়োজন। শুধু এটুকু বলা যায়, আরও একাধিক প্রসঙ্গে বেকারত্ব দূরীকরণের প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু যে জিনিসটা আজও পাওয়া যায়নি তা হল পর্যাপ্ত সংখ্যায় চাকরি। অথচ বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় দপ্তর এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি শূন্যপদের অভাবে সমস্যায় রয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নিয়োগ হয় না রেলে এবং ব্যাংকগুলিতেও। অন্যদিকে, ছোটখাট ব্যবসা-বাণিজ্য করে স্বনির্ভর হওয়ার পথও সুগম করেনি মোদি সরকার। এই শ্রেণির কাছে ব্যাংকঋণ এখনও দুর্লভ, ওইসঙ্গে আছে জিএসটির অত্যাচার। মোদি সরকার বস্তুত তেলা মাথাতেই তেল ঢেলে যাওয়ার অভ্যাসেই ডুবে আছে।
সব মিলিয়ে খেলাপির খেলায় চ্যাম্পিয়ন সরকার বাহাদুর। বৈষম্যবৃদ্ধির এর চেয়ে ‘উৎকৃষ্ট’ উদ্যোগ আর কী হতে পারে। কিন্তু সব রাজ্য সরকারের পক্ষে তো আর চোখ বুজে চুপ করে থাকা সম্ভব নয়। সীমিত ক্ষমতার মধ্যে তারা চাকরি/কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রসঙ্গে সবার আগে আসে বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের নাম। কিন্তু ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ সরকারকে জব্দ করার কৌশলী গেরুয়া রাজনীতির কাছে অনেকাংশে অসহায় হয়ে পড়ছে তারা। যেমন নবান্ন যখনই কোনও বড়সড় নিয়োগ উদ্যোগ নিচ্ছে তাতে বাগড়া দিতে ব্যগ্র হয়ে পড়ছে বিরোধীরা। তার পিছনে গেরুয়া বাহিনীর প্ররোচনা যে যথেষ্ট তা নানাভাবে প্রকট হয়ে পড়ে। অনেক ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার অবশেষে ফের কিছু নিয়োগ দিতে তৎপর হয়েছে। যেমন রাজ্যজুড়ে ১৩,৪২১টি পদে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের পথে আরও একধাপ এগিয়েছে তারা। ইস্যুটি রাজ্য মন্ত্রিসভায় নথিভুক্ত হয় বুধবার। মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য বিষয়টিতে ছাড়পত্র দিয়েছেন আগেই। প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল ১৯ নভেম্বর। তাতেই জানানো হয়েছিল শূন্যপদের সংখ্যা এবং পোর্টাল খোলার বিষয়টি। বুধবার তাতেই সায় দিয়েছে মন্ত্রিসভা। অতঃপর ঘোষিত হয়েছে ইন্টারভিউ গ্রহণের দিনক্ষণ। পর্ষদ ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষকদের ইন্টারভিউ নিতে চলেছে বছরের শেষ দু’দিনে। প্রার্থীদের তরফে বিদেশ গাজি, বহু প্রতীক্ষিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার পুরোটা বিধানসভা ভোটের আগেই সম্পন্ন করে ফেলার দাবি জানিয়েছেন। এই নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বাধিক শূন্যপদ দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায়। বাকি শূন্যপদগুলি রয়েছে মূলত হুগলি, বাঁকুড়া, কলকাতা, পূর্ব বর্ধমান, উত্তর ২৪ পরগনা এবং বীরভূমে। রাজ্যজুড়ে আবেদন জমা পড়েছে প্রায় ৬০ হাজার। অবশ্য প্রাথমিকে শূন্যপদ বাড়িয়ে অন্তত ৫০ হাজার করার দাবি জানিয়ে রেখেছেন টেট পাশ প্রার্থীরা। অন্যদিকে, শীঘ্রই একাদশ-দ্বাদশ স্তরেও কিছু শিক্ষক নিয়োগে তৎপর এসএসসি। এরপরেই শুরু হবে নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া। এখানে শূন্যপদ ২৩,২১২টি। পাশাপাশি শিক্ষাকর্মীও নিয়োগ করবে এসএসসি। সেই সংখ্যাটি প্রায় সাড়ে আট হাজার। আরও একাধিক বিভাগেও নিয়োগ সংক্রান্ত ছাড়পত্র দিয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভা। কিছু পদকপ্রাপ্ত ক্রীড়াবিদদেরও চাকরি দেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার।
সব মিলিয়ে একটি আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাজ্যবাসী প্রত্যাশা করে, আর যেন কেউ বাগড়া না দেয়। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক অতীতের ঘটনাবলি, মামলা-মকদ্দমা থেকেও শিক্ষা নিতে হবে শাসক দল এবং সরকারি প্রশাসনকে। বর্তমান এবং আগামী দিনে যাবতীয় নিয়োগে একশো শতাংশ স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য যা যা করণীয় তা রাজ্যকে নিশ্চিত করতেই হবে। মনে রাখতে হবে, পানের থেকে চুন খসলেই ফের তার ‘সদ্ব্যবহারে’ জোর দেবে কেউ কেউ। পরিণাম? সরকারের আন্তরিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার সামনে ফের বাধার প্রাচীর!