সৌম্যজিৎ সাহা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: বর্ণ পরিচয়ে আছে-‘অ-অজগর আসছে তেড়ে।’ সুন্দরবনের শিশুটি কোনওদিন অজগর দেখেনি। কিংবা ‘আ-আমটি খাব পেড়ে।’ কয়েকটি বাচ্চা জীবনে কোনওদিন আম পেড়ে খায়নি। সুন্দরবনের সেই শিশুরা অবশ্য জানে নৌকা কি জিনিস। কারণ তাদের রোজই তাতে চড়তে হয়। ফলে তার জন্য লেখা হল, ‘অ-অভয় মাঝির নৌকা চড়ে। ‘আ-আমরা যাব নদীর চরে।’ ফলে শিশুরা তাদের পরিচিত বিষয়গুলি দিয়ে চটজলদি বুঝে ফেলল ‘অ’ কিংবা ‘আ’। সুন্দরবনের এরকম পরিচিত কিছু জিনিসের উল্লেখ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক অধ্যাপক লিখে ফেলেছেন নতুন এক বর্ণ পরিচয়। সেটির ছত্রে ছত্রে সুন্দরবনের জল-জঙ্গল-জন্তুরই কথা।
অধ্যাপকের নাম বরেন্দু মণ্ডল। বাংলা বর্ণ নিয়ে বই লেখার নেপথ্যের ঘটনাটি আকস্মিক। কয়েক বছর আগে সুন্দরবনের সাতজেলিয়া দ্বীপে কয়েকটিখুদে পড়ুয়ার সঙ্গে পড়াশোনার কাজ করছিলেনবরেন্দুবাবু। এক শিশুবলেছিল, ‘তুমি তো বই লেখ। আমাদের জন্য কিছু লেখ না?’‘আমাদের’-এই শব্দটি গভীর রেখাপাত করেছিল অধ্যাপকের মনে। গবেষণা শুরু করলেন। তারপর বাংলার প্রতিটি অক্ষর সুন্দরবনকে চেনানোর জন্য লেখা হল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয় অনুকরণেই লিখলেন সুন্দরবনের বর্ণ পরিচয়। সুন্দরবনেরশিশুদের প্রাথমিক জ্ঞানের সুবিধার্থে সরল ভাষায়লেখা বইটি। সেটি ছোট আকারে প্রকাশ হলও। স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ ব্যবহার করে সুন্দরবনের জনজীবন, জীবিকা, বৈচিত্র ইতাদি তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে। সুন্দরবনের প্রাথমিক স্কুলে তাবিলিবণ্টনের পরিকল্পনাও নিয়েছেনবরেন্দুবাবু।
মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশু শিক্ষা’, বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’, রবীন্দ্রনাথের ‘সহজ পাঠ’, যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘হাসিখুশি’ বাংলা ‘প্রাইমার’-এর (শিশুদের বাংলা ভাষা শিখতে সাহায্য করার জন্য তৈরি প্রথম পাঠ্যপুস্তক) ধারায় গুরুত্বপূর্ণ চারটি মাইলফলক। এর মধ্যে শেষ তিনটি বই পড়েই গড়পড়তা বাঙালির অক্ষরজ্ঞান সঞ্চয়। প্রাইমার হিসেবে সবগুলিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের বক্তব্য,এই বইগুলিতে সুন্দরবনের নদী-খাঁড়ি-জল-জঙ্গল ইত্যাদির উল্লেখ নেই। অধ্যাপক বরেন্দু মণ্ডলবলেন, ‘শিশুদের সুন্দরবন সম্পর্কে জানার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। তাজরুরিও।’ এই বর্ণপরিচয়ে বাঘ-কুমিরের উল্লেখ আছে। স্থান পেয়েছে একাধিক নদীর নাম। যেমন,‘ম-মাতলা নদীর খেয়াঘাট’।‘র-রায়মঙ্গল এর মস্ত ঢেউয়ে।’ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবনের কী হয় তা‘ষ’ এবং ‘স’ দিয়ে বোঝানো হয়েছে। বই সম্পর্কে বরেন্দুবাবু বলেন, ‘প্রতিটি বাংলা বর্ণ দিয়ে সুন্দরবনের ছোটরা নিজের জায়গা নিবিড়ভাবে চিনবে। এটাই আমার অভিপ্রায়। তাছাড়া অক্ষর ও ভাষাজ্ঞানের পাশাপাশি প্রতি বর্ণ দিয়ে ছোটরা প্রাত্যহিক জীবনে পাশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য চিনতে শিখবে।’ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদ জানিয়েছে, স্কুল কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলে অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যতিরেকে কোনও লেখক তাঁর লেখা বই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের উপহার দিতে পারেন।