ওঁ সর্বরূপময়ী দেবী সর্ব্বং দেবীময়ং জগৎ।
ওঁ সর্বরূপময়ী দেবী সর্ব্বং দেবীময়ং জগৎ।
অতোঽহং বিশ্বরূপাং তাং নমামি পরমেশ্বরীম্।।
ভারতের সনাতন ধর্মের উপনিষদ প্রভৃতি শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ব্রহ্মপদের ব্যাখ্যা—“বৃহত্ত্বাৎ বৃংহণত্বাৎ ব্রহ্ম”, অর্থাৎ যিনি বিশ্বে সর্বমহান, যাঁর সমান বা অধিক কেহ নাই (ন তৎসমশ্চাভ্যা ধিকোঽপি দৃশ্যতে—শ্রুতি) তিনিই ব্রহ্ম এবং যিনি বৃঙ্ঘণ অর্থাৎ তাঁহার সহিত সম্বন্ধযুক্ত সাধককেও বৃহৎ করেন (ব্রহ্মবেদ ব্রহ্ম ভবতি—শ্রুতি, মম সাধর্ম্ম্যমাগতাঃ—গীতা) তিনি ব্রহ্ম। সমগ্র জগতের সেশ্বর ঈশ্বরেও বিশ্বাসী, তাঁহারা এই শাশ্বত নিত্য অনাদি অনন্ত নির্গুণ সগুণ নিরাকার সাকার পরম এক অভিন্ন বস্তু ব্রহ্মকে নিজ নিজ ধর্মানুসারে পরমাত্মা ভগবান, গড বা আল্লা প্রভৃতি শব্দে অভিহিত করেন। ঋষি ভারতের শাস্ত্র বলেন, সেই সচ্চিদানন্দ পরম প্রভুর বহু রূপ বহু নাম ও বহু মন্ত্র। তিনি সর্বশক্তিমান ও জগতের সৃজন, পালন ও প্রলয়ের কর্তা। তাঁর শক্তি ও তিনি অভিন্ন। তাঁর সহিত জীব জগতের সম্বন্ধ কিরূপ—এই বিতর্কের ফলে ভারতের দার্শনিক আচার্যগণের অদ্বৈত, বিশিষ্টাদৈত, দ্বৈত, দ্বৈতাদ্বৈত শুদ্ধাদ্বৈত ও অচিন্ত্যভেদাভেদ প্রভৃতি মতবাদের সৃষ্টিতে পরস্পর মতের খণ্ডন চলিয়া আসিতেছে।
প্রায় সকল মতেই ব্রহ্মের নিকটতম ও প্রিয়তম নাম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ আলম্বন ওঁ কারের প্রাধান্য ও মহিমা স্বীকৃত হইয়াছে। ওঙ্কার পর ও অপর বা কারণ ও কার্য—এই উভয় ব্রহ্ম। উপনিষদ গীতা ভাগবত ও তন্ত্রাদি সকল শাস্ত্রে ওঙ্কারের মহিমা বর্ণিত থাকিলেও সর্বাপেক্ষা উপনিষদ ও গীতাই একমাত্র ওঙ্কার মহানাম মহামন্ত্রের সর্বোৎকর্ষ খ্যাপনে অগ্রগামী। কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ডে নিত্য সনাতন সর্বব্যাপী মহানাদ ওঙ্কারই সকল ধ্বনি নাম মন্ত্র তন্ত্র শাস্ত্র মূর্তি তত্ত্ব ধর্ম ও রসের উৎস সমুচ্চয় ও স্বীকৃতি এবং সমগ্র বিশ্বচরাচরের অখণ্ডতা ও মহামিলনের এক অভিন্ন স্বর্ণসূত্র। সেই অখণ্ড মহানাদের সহিত একতান হইবার জন্যই খণ্ড খণ্ড যত কিছু পাঠ কীর্তন ও মন্ত্রোচ্চারণাদি অনুষ্ঠিত হয়। ওমিতি সর্ব্বম্। ওমিতি উপাসিত। সর্ব্বমোঙ্কার এব।– উপনিষদ। গিরামস্মোকমক্ষরম্। ওঁ মিত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম। ওঁ তৎসদিতি ব্রহ্মণোনির্দ্দেশঃ।–গীতা। তস্য বাচকঃ প্রণবঃ—যোগদর্শন। উপনিষদের যুগে ব্রহ্মগায়ত্রী জপ এবং ওঙ্কার ব্রহ্মের সমবেত উপাসনাই সকলের মুখ্য আধ্যাত্মিক কর্ম ছিল। হেথা একদিন বিরামহীন মহাওঙ্কার ধ্বনি—রবীন্দ্রনাথ। সকল বেদের সার ব্রহ্মগায়ত্রী এবং গায়ত্রীর সার ওঙ্কার। পরবর্তী যুগে নিরাকার ব্রহ্ম বা ওঙ্কার অবলম্বনে ব্রহ্মের যোগ্য উপাসকের অভাবে এবং কিছু কিছু উচ্চ বর্ণের লোকের প্রাধান্য রক্ষার স্বার্থে অন্যের অধিকার সংকোচ হওয়ায় মানব ধর্মের আধ্যাত্মিক ক্রমোন্নতির পথে ব্রহ্মজ্ঞান লাভের জন্য শাস্ত্রকারগণ পরব্রহ্মের বিভিন্ন মূর্তি বিষ্ণু শিব দুর্গা প্রভৃতি কল্পনাসহ তাঁদের ধ্যানমন্ত্র পূজাদির বিধান করিলেন।
জ্যোতির্ময় নন্দের ‘শক্তিপূজার মহত্ত্ব’ থেকে