হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: কলকাতা শহরের মতো ঢাকারও ‘আইকনিক সিম্বল’ রিকশ। তবে হাতে টানা নয়, চিত্র বিচিত্র হুডওয়ালা প্যাডেল চালিত রিকশ। তবে চালকরা অধিকাংশই ঢাকা শহরের স্থায়ী বাসিন্দা নন। কলকাতা শহরের হাতে টানা রিকশ চালকরা যেমন জীবিকা অর্জনের জন্য বিহার-উত্তরপ্রদেশ ইত্যাদি নানা স্থান থেকে কলকাতায় আসেন, তেমনই ঢাকা শহরের রিকশ চালকরাও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ঢাকাতে আসেন। তবে শহরের রাজপথে বছরখানেক আগেও দাপিয়ে বেড়াত সিএনজি। হয়তো বা এখনও তাই। ঢাকার দরজাওয়ালা অটো রিকশকে সে দেশের লোকজন ‘সিএনজি’ নামেই ডাকে। কলকাতা শহরের সঙ্গে ঢাকা শহরের যে ক’টি ব্যাপারে মিল আছে তার একটি ট্র্যাফিক জ্যাম। তবে এ ব্যাপারে ঢাকা আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে। অনেক সময়ই পাঁচ মিনিটের রাস্তা পেরতে পঞ্চাশ মিনিট সময় লাগে। এ সময় সাধারণ মানুষের বিপদের ত্রাতা সিএনজি অটোরিকশ। অদ্ভুত কৌশলে তারা রাস্তায় জ্যামে আটকে পড়া গাড়ি-বাস ইত্যাদি যানবাহনের ফাঁক গলে মানুষকে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
মাত্র দু’বছর আগের ব্যাপার, তখনও সে দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়নি। আমার সঙ্গী মাঝবয়সি সংবাদকর্মী ইফতি। আমার বাসস্থান গুলশনের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে যখন রওনা হলাম, তখন বেলা প্রায় দশটা বাজে। অফিস টাইম, রাজধানী শহরের ব্যস্ত জনপদ। তারই মধ্যে দিয়ে সিএনজি আমাদের নিয়ে ছুটল গন্তব্যর দিকে। ইফতি আমাকে নিয়ে চলেছেন আপামর বাঙালির কাছে পরিচিত তাদের হৃদয় বাস করা এক বিখ্যাত মানুষের সমাধি দেখাতে।
তিন চাকার বাহন আমাদের নামিয়ে দিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন প্রধান সড়কের গায়ে এক স্থানে। সেখানে রেলিং ঘেরা একটা জায়গা আর একটা মসজিদও দেখা যাচ্ছে। সেই রেলিং এর ধারে বসে আছে বেশ কিছু হকার। একজন ফুল বিক্রেতাও ছিল। তার কাছ থেকে একটা ফুলের তোড়া কিনে এগলাম সমাধিক্ষেত্রের গেটের দিকে। সমাধি সৌধের বাগিচায় পা রাখলাম দু’জনে। চারপাশে সবুজ গাছগাছালি। কেয়ারি করা গাছের গা বেয়ে পথ এগিয়েছে সামনের দিকে। সে পথও পরিচ্ছন্ন। সবচাইতে বড় ব্যাপার বাইরের নগর জীবনের কোলাহল যেন স্পর্শ করছে না এ জায়গাকে। অপরিসীম শান্তি আর নির্জনতা বিরাজ করছে চারপাশে। কিছুটা এগিয়েই প্রথমে চোখে পড়ল লাল টাইলসের ওপর খোদিত তাঁর বিখ্যাত কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি—
‘মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ ভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত,
আমি সেই দিন হব শান্ত।’
হ্যাঁ, এই কবিতার স্রষ্টা ‘বিদ্রোহী কবি’ ঘুমিয়ে আছেন অনতি দূরের সমাধি সৌধে। একাত্তরের স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবর রহমান কবি ও তাঁর পরিবারকে নিয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশে। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকাতেই প্রয়াত হন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও সঙ্গীতকার কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি তাঁর গানে লিখেছিলেন—
‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই।
যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।’
তাঁর এই ইচ্ছা অনুসারেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মসজিদের পাশে তাঁর মরদেহ কবর দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে সেই কবরের ওপর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম সেই স্মৃতিসৌধের সামনে। চারপাশ থেকে লাল রঙের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে উপরের সৌধ বেদীর দিকে। কিছু ফুলের স্তবক রাখা আছে সিঁড়ির ধাপে। আমিও শ্রদ্ধাবনতভাবে আমার হাতের ফুলগুলো নামিয়ে রাখলাম সেই সোপানে। কবর সংলগ্ন এক পাথরের ফলকে লেখা—
‘তোমাদের পানে জাগিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না।
কোলাহল করি’ সারা দিনমান, কারও ধ্যান ভাঙিব না।
নিশ্চল নিশ্চুপ
আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ।’
—কবিরই কবিতার পঙ্ক্তি। পাঠ করে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় মন ভরে গেল। কবির কবরের কিছুটা তফাতেই দাঁড়িয়ে আছে শ্বেতশুভ্র মসজিদ। এই নির্জন কাননে একাকী শুয়ে কবি হয়তো প্রতীক্ষা করছেন মসজিদ থেকে ভেসে আসা মোয়াজ্জিনের আজান শোনার জন্য। বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম কবির সমাধি সৌধের সামনে। কাঁটাতারের বেড়া বাঙালিকে ভৌগোলিকভাবে ভাগ করতে পারে, কিন্তু তা কখনওই বাঙালির মন থেকে নজরুলকে ভাগ করতে পারে না। এই সমাধি সৌধের কাছেই ছিল আরও দু’জন কৃতী পুরুষের সমাধি। চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন এবং বাংলাদেশের বর্তমান পতাকার প্রণেতা কামারুল হাসানের সমাধি। তাঁদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির উদ্দেশে। যা সেদিন ছিল আজ আর নেই।
বেশি সময় লাগল না সে জায়গায় পৌঁছতে। প্রাকার ঘেরা বাংলো ধরনের সেই দ্বিতল বাড়িটা রাস্তা থেকেই দেখা যেত। তবে গাড়ি যেখানে গিয়ে দাঁড়ায় সে জায়গা থেকে কিছুটা হেঁটে যেতে হয়েছিল সেই বাড়ির সামনে। একসময় তো এই বাড়ি ঘিরেই আবর্তিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস, বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। শেখ মুজিবের বাড়ি। ইতিহাসের পাতায় যিনি অন্যতম বাঙালি রাজনৈতিক নায়ক। তিনি জীবনের শেষ দিন কাটিয়েছিলেন এই ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাড়িতেই। পরিবারের সদস্য-সদস্যাদের সঙ্গে নিহত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের পর বাড়িটিকে স্মারকস্থলের রূপ দেওয়া হয়েছিল। বাড়ি সংলগ্ন অংশে একটি মিউজিয়ামও গড়ে তোলা হয়েছিল। বাড়ির চৌহদ্দির প্রবেশ মুখে সেন্ট্রি হাউসে সামান্য সিকিউরিটি চেকিংয়ের ব্যবস্থা। প্রথমে সেই বাড়িতে না ঢুকে উপস্থিত হলাম বাড়ির পিছনের অংশে তিনতলা মিউজিয়াম। সেখানে প্রতিটা তলে সাজানো আছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতার ছবি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের নানা আলোকচিত্র। তাঁর ও তাঁর পরিবারের ব্যক্তিগত বিভিন্ন ছবি, শেখ মুজিবের বিভিন্ন বিখ্যাত বক্তৃতামালার অংশ। তাঁর ব্যবহৃত ও তাঁকে নিয়ে লেখা বেশ কিছু বইও রাখা আছে দেখলাম সেই সংগ্রহশালাতে।
সেই সংগ্রহশালা দেখার পর আমরা প্রবেশ করলাম সেই বিখ্যাত বাড়িতে। একসময় সে বাড়ি থেকে রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের বহু বিখ্যাত ঘটনাবলি। বহু রাষ্ট্রপ্রধানেরও পদার্পণ ঘটেছিল এই বাড়িতে। আর পরিসমাপ্তি ঘটেছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকবাহিনীর হাতে বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার মাধ্যমে। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম বাড়ির দোতলায়, কোনও বিলাসবহুল বাড়ি নয়, নিতান্তই সাদামাটা ঘর বারান্দা। আরও বেশ কিছু পর্যটক ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছেন সেখানে। কিন্তু এক অদ্ভুত নীরবতা আর বিষণ্ণতা বিরাজ করছে চারপাশে। দেওয়ালে টাঙানো আছে বঙ্গবন্ধু আর তাঁর পরিবারের সদস্যদের নানা ছবি। আর রয়েছে দেওয়ালের গায়ে গুলির ক্ষতচিহ্ন রক্তাক্ত ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে। পরপর বেশ কয়েকটা ঘর সেখানে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাস করতেন সে ঘরের দরজাগুলোতে কাচ বসানো যাতে বাইরে থেকে ঘরের ভিতরের অংশ দর্শনার্থীরা প্রত্যক্ষ করতে পারে। ঠিক আগের মতোই সাজানো রয়েছে সেই ড্রইংরুম। সোফাসেট, সাদাকালো টেলিভিশন, টেলিফোন তার ব্যবহৃত চশমা। খাবার ঘরে সেদিনের মতোই সাজানো টেবিল-চেয়ার-বাসনপত্র, শোওয়ার ঘরের বিছানা-বালিশ অবশ্য কিছুটা অবিন্যস্ত সেই ভয়ঙ্কর রাতের সাক্ষী হিসাবে। ঘরের ছাদ আর দেওয়ালে বুলেটের ক্ষত আর রক্তের দাগগুলোও ফলক দিয়ে চিহ্নিত করা ছিল। নিস্তব্ধভাবে এসব দেখতে দেখতে একসময় গিয়ে দাঁড়ালাম সেই সিঁড়ির সামনে। যেখানে শেষবারের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সিঁড়ি নেমে গিয়েছে নীচের দিকে। ঘাতকদের গুলির আঘাতে সে সিঁড়িতে গড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। তবে এ সিঁড়ি দিয়ে নামা যায় না। সিঁড়ির ধাপে কাচ বসানো। যার ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে কালচে রক্তের দাগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রক্ত। দেওয়ালে টাঙানো আছে তাঁর গুলিবিদ্ধ ছবি। সেই সিঁড়ির দিকে আমরা যারা তাকিয়েছিলাম তারা সবাই নিশ্চুপ। কারও চোখে জল। তবে সেই সিঁড়ি আর বাড়ি আজ আর নেই। রাজনীতি আর ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি বড় বিচিত্র আর নিষ্ঠুর। সময় কখন কোন মানুষকে দেবতা বানায় আর কখন দানব বানায় তা বলা মুশকিল। তবে ইতিহাসকে হঠাৎ করে মুছে ফেলা যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে ৩২ নম্বর রোডের বাড়িটা।
ধানমণ্ডি রোড ছেড়ে বাসায় ফেরার আগে ভাবলাম একবার দেখে যাই ভাষা শহিদ স্মারক স্থলটা। সিএনজি চেপে পৌঁছে গেলাম সেখানে। চারপাশে রাস্তা ঘেরা বিশাল একটা আইল্যান্ড বা মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির চিরপরিচিত সেই স্মারকস্তম্ভ। সিঁড়ি বেয়ে বেশ কিছু ধাপ অতিক্রম করে মূল স্মারক বেদীতে উঠতে হয়। এই কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার বা ভাষা শহিদ স্মারক স্থল নির্মাণ করা হয়েছে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে শহিদ হওয়া রফিক, বরকত, জব্বারসহ আরও অগণিত মানুষের স্মরণে। এই কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার বাঙালি তো বটেই সারা পৃথিবীর মাতৃভাষাপ্রেমী মানুষের আন্দোলনের প্রতীক। প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এ জায়গা জন অরণ্যে পরিণত হয় ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। দুই বাংলার বাঙালিরা তো বটেই অন্য নানা দেশ থেকেও বহু মানুষ উপস্থিত হন শহিদ স্মারকে। শ্রদ্ধার্ঘ্যের ফুল মালায় ভরে ওঠে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের চত্বর।
এদিন একুশে ফেব্রুয়ারি নয়, তাই লোকজনের ভিড়ও নেই। ফুল-মালাতেও সাজানো নয় জায়গাটা। বরং শহিদ মিনারের বেদীকে ঘিরে যে মাঠ তাকে যেন বেশ অপরিচ্ছন্নই মনে হল। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের কাছে যাওয়ার জন্য সিঁড়িতে ওঠার আগে যখন আমি আর ইফতি জুতো খুলছি, তখন আমাদের পাশ দিয়ে একদল ছেলেমেয়ে জুতো পরেই গটগট করে ওপরে উঠে গেল। ইফতি বিষণ্ণ হেসে বললেন, ‘সময় বদলাচ্ছে। তার সঙ্গে বদলাচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মর মূল্যবোধ ও চেতনা। দোষ অবশ্য আমাদেরই, পরবর্তী প্রজন্মকে আমরা আমাদের ভাবনার উত্তরাধিকার দিয়ে যেতে পারছি না। শুধু অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার তৈরি করার চেষ্টা করছি তাদের।’
ইফতির কথা শুনে মনে হল এ ব্যাপারটা আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও সত্যি। আন্দামানের সেলুলার জেলে একবার কয়েকজন যুবক-যুবতীকে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে ফোটো শ্যুট করতে দেখেছিলাম।
খালি পায়ে ওপরে উঠে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভাষা শহিদ স্মারক, বাংলা ভাষার আত্মমর্যাদা ও গৌরবের প্রতীক। যে ভাষায় গান বেঁধেছিলেন রবীন্দ্রনাথ-নজরুল, যে ভাষার জন্য শহিদ হয়েছিলেন রফিক-জব্বারসহ অগণিত মানুষ। যে ভাষাকে সামনে রেখে এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ঢাকার সমাধিস্থলে ঘুমিয়ে থাকা কবি নজরুল, ৩২ নম্বর ধানমণ্ডি রোডের বাড়ি আর এই শহিদ স্মারক এ সবই তো বাংলা ভাষার একই সুতো দিয়ে গাঁথা। স্মারক বেদীতে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল অতুলপ্রসাদ সেনের গান ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা—।’