বিজেপি যে বাংলা ও বাঙালি বিরোধী, প্রতিনিয়ত তার প্রমাণ দিয়ে চলেছে। সাম্প্রতিককালে মূলত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে। বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে কোথাও কোথাও। এখন রাজ্য বিধানসভা ভোটের কয়েকমাস আগে হয়তো কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই তড়িঘড়ি ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের কাজ শুরু হয়েছে। এরসঙ্গেই ১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনা সহ বিভিন্ন প্রকল্পের ন্যায্য পাওনা আটকে রেখে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার বাংলাকে ‘টাইট’ দেওয়ার পথ নিয়েছে। এটা একটা দিক। অন্যদিকে আরএসএস-বিজেপির মতাদর্শ অনুযায়ী বাঙালি মনীষীদের পরিকল্পিতভাবে নগ্ন, কুৎসিত আক্রমণ করা শুরু হয়েছে। এবং তা হচ্ছে ইতিহাস ও সত্যকে বিকৃত করে। যেমন, বিজেপি’র সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা একবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মস্থানই গুলিয়ে দিয়েছিলেন! আবার বঙ্গ বিজেপির এক নেতার মতে, স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন বিভ্রান্ত বামপন্থী! ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রচারযাত্রা থেকে কেউ বা কারা বিদ্যাসাগর কলেজে ঢুকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনা ঘটিয়েছে। যার সাক্ষী রয়েছে এই বাংলা। হিন্দুত্ববাদীদের হাত থেকে রক্ষা পাননি রবীন্দ্রনাথও। খবরে প্রকাশ, উত্তরপ্রদেশে স্কুলের পাঠ্যবই থেকে বিশ্বকবিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগে রবি ঠাকুরের গান গাওয়ার ‘অপরাধে’ অসমে হিমন্ত বিশ্বশর্মার বিজেপি সরকার উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা রুজু করার নির্দেশ দিয়েছে।
এবার ‘টার্গেট’ রাজা রামমোহন রায়। কে তিনি? তাঁর প্রধান অবদান হল সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার জন্য আন্দোলন। যার জেরে ১৮২৯ সালে এই মধ্যযুগীয় প্রথা রদ হয়। রামমোহন ব্রাহ্মসভার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, যিনি আধুনিক বাংলা শিক্ষার প্রচলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। আবার নারীশিক্ষা, নারীর অধিকার, বিধবা বিবাহের পক্ষে, আধুনিক ভারতে সমাজসংস্কার, ধর্মীয় যুক্তিবাদ ও শিক্ষার আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। তাই সঠিকভাবেই ভারতীয় রেনেসাঁর জনক বলা হয় তাঁকে। এমন একজনকে ব্রিটিশের দালাল, ধর্ম পরিবর্তনের অন্যতম কুচক্রী, ভুয়ো সমাজ সংস্কারক বলে আক্রমণ করেন মধ্যপ্রদেশের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ইন্দর সিং পারমার। অর্বাচীন ওই শিক্ষামন্ত্রীর এই দুর্ভাগ্যজনক বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিতভাবেই সরব হয়েছে এ রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম এবং কংগ্রেস। রামমোহন সম্পর্কে এমন বিকৃত বক্তব্য হজম হয়নি বিজেপির অনেকেরও। বিশেষত বাংলার ভোটের মুখে এমন ধরনের কথাবার্তায় বিজেপির বিরুদ্ধে বাংলা-বিরোধী বলে প্রচার আরও জোরদার চলতে পারে বুঝেই গেরুয়া নেতারা সরব হয়েছেন। বাধ্য হয়ে এরপরেই মন্ত্রী তাঁর এই বক্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করে বলেছেন, রামমোহন রায় ছিলেন ভারতের এক প্রসিদ্ধ সমাজ সংস্কারক। বলা যায়, চাপে পড়েই বোধহয় মন্ত্রীমশাই রাতারাতি পালটি খেলেন! কারণ কোনও দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তির ‘ভুলবশত’ কোনও মনীষীকে অপমান করাটা ক্ষমার অযোগ্য বলেই বিবেচিত হয়।
আসলে এটাই এখন বিজেপির কৌশল। নিজেদের মতাদর্শ মেনে প্রথমে কিছু বিতর্ক তৈরি করা, তারপর নাটক করে ক্ষমা চাওয়া! তারপর হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার প্রচার করা। ফলে এসব কথা যেসব মন্ত্রী-নেতা বলছেন, এটা তাঁদের একার দায় নয়। বিজেপির মতাদর্শই বলে, তারা সনাতন হিন্দুধর্মের সংস্কারের বিরুদ্ধে। সতীদাহ রদ, বিধবার বিয়ে, স্ত্রীশিক্ষা চালু, বিবাহ বিচ্ছেদ চালু, বাল্য বিবাহ ও বহু বিবাহ রোধ, পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার— এসব মনে হয় আরএসএস-বিজেপির ঘোরতর অপছন্দ। এই রক্ষণশীল হিন্দুত্বকে কঠোর ধর্মীয় রীতি-অনুশাসন থেকে মেয়েদের বের করে আনতে চেয়েছিলেন বলেই এখন একুশ শতকেও রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথকে অপমান, অসম্মান ও আক্রমণের মুখে পড়তে হচ্ছে বারবার। স্বাধীনতার পরেও নারীদের আইনি অধিকার দেওয়ার বিরোধিতা করেছিল হিন্দু মৌলবাদীরা। এই স্বাধীন ভারতেই ১৯৮৭ সালে রাজস্থানের অষ্টাদশী, আটমাসের বিবাহিত নববধূ রূপ কানোয়ারের ‘সতী’ হওয়ার ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগ ওঠে মরুরাজ্যের বিজেপি নেতা ভৈরসিং শেখাওয়াতের বিরুদ্ধে। ভারতের লজ্জা সেই ঘটনার পর বিজেপি-র আরেক ডাকসাইটে নেতা কল্যাণ সিং গর্ব করে বলেছিলেন, সতী হওয়া নারীর অধিকার। রামমোহনকে অপমান করা মধ্যপ্রদেশের শিক্ষামন্ত্রী কিছুদিন আগেই সে রাজ্যের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দাবি করেন, ‘আমাদের ভুল ইতিহাস পড়ানো হয়েছে। ইউরোপ থেকে ভারতে আসার সমুদ্রপথ ভাস্কো ডা গামা নয়, চন্দন নামে এক বণিক আবিষ্কার করেছিলেন।’ আসলে ইতিহাস থেকে ধর্ম, সংস্কার থেকে আধুনিকতা— বিজেপি চলে তার নিজস্ব সনাতনী ভাবনায়। সেই চিন্তা-ভাবনার পরিপন্থী যাঁরা, যাঁরা বারেবারে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছেন বা ওঠেন— গেরুয়াবাহিনী তাঁদের শূলে চড়াতে চায়। মনীষীদেরও অসম্মান করতে ছাড়ে না। এমন মূখার্মির শেষ কোথায় জানা নেই।