


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: জন বললেন, ‘জর্জ এসেছে। ভাই অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করে। ক্রিসমাস বলে কলকাতায় এসেছে।’ জন রোজারিওরা বো বারাকের পাঁচ পুরুষের বাসিন্দা। ফেলিক্স অগাস্টিনরাও তাই। তাঁর ভাগ্নি তৃষা সেডিন থাকেন টরোন্টোতে। সেখান থেকে কলকাতায় এসেছেন পরিবারের সঙ্গে বড়দিন কাটাবেন বলে। এ সব কারণেই বো বারাক খানিক কলার উঁচিয়েই বলে, ‘শুধু দুর্গাপুজোয় বিদেশ থেকে কলকাতায় আসে না। ক্রিসমাসেও আসে, বুঝলেন। আমাদের এখানে এ সময় বিদেশ থেকে প্রায় সকলেই চলে আসে। বো বারাকের ক্রিসমাসের মতো এত ওয়ার্ম সেলিব্রেশন কোথাও হয় না।’
তা সত্যি বটে। বিদেশি পোশাক পরে নাচছে কিশোরীরা। তাদের কেউ ইংল্যান্ডে থাকে। কেউ কানাডায়। কেউ অস্ট্রেলিয়ায়। কলকাতার ভাই-বোনদের সঙ্গে নাচানাচি পাশ্চাত্য গানের সঙ্গে। এখন বো বারাকজুড়ে দুর্গাপুজোর মতো আলো। সেই আলো আরও ঝলমলে হয়ে উঠেছে তাদের পোশাকের ঔজ্জ্বল্যে। আর আলোর সঙ্গে গিয়ে মিশছে কেকের গন্ধ। আর সসেজ, পর্ক ভিন্ডালু, নুডলস, চিকেন ভাজা, কাবাব, ওয়াইনের গন্ধ তাতে গিয়ে মিশে গোটা বারাকটাকে এমন করে ফেলেছে যেন একটা পিকনিক স্পট।
এমনিতে বো বারাকের ইতিহাস সকলেরই অল্পবিস্তর জানা। বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাদের থাকার জন্য বারাক তৈরি হয়েছিল। তারপর সেনা চলে যায়। তারপর মূলত অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা ভাড়া নিয়ে থাকা শুরু করেন। তাঁদের বংশধররাই মূলত এখনও থাকছেন। কথা বলেন ইংরেজিতে। ভাঙা ভাঙা বাংলা-হিন্দি বলেন বটে তবে খুব কম। এখন সাড়ে তিনশোর মতো পরিবার থাকে। অধিকাংশ কালো সাহেব-মেম। বো বারাক দেখার মতো একটি জায়গা। চারপাশে গলি। মধ্যিখানে ব্লক। তার মধ্যে ফ্ল্যাট। একটি গলিতে বৌদ্ধদের উপাসনালয় আছে। অন্য গলিটি দিয়ে বেরলে পার্ক। আর একটি গলিতে পার্সিদের ধর্মশালা। মধ্যিখানে মূলত খিস্টান অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের বাসস্থান বো বারাক। লাল ইটের বাড়ি। সবুজ জানলা। এর ডিজাইন করেছিলেন রিকার্ডো সাহেব। তিনি সে যুগের বিখ্যাত স্থপতি। বউবাজার থানার পাশে বো বারাক এসব নিয়ে পড়ে রয়েছে প্রায় ১০০ বছর আগের সময়ে। এখানকার জীবনযাত্রা পাল্টালেও বারাকের আদ্যিকালের নকশাটার বিশেষ বদল হয়নি। শত বছর আগের কলকাতাটা এখানে স্থিরচিত্র হয়ে ফ্রেমে সেঁটে রয়েছে। গলিতে পা রাখলে সেই অনুভুতি টের পাওয়া যায়।
এখন এখানে ক্রিসমাস। এখন এখানে মেরি অ্যানের গানের যিশুর চোখ ছলছলে নয়। তিনি এখন খুশি খুশি। সন্তানদের প্রাণভরে আশীর্বাদ করছেন। যাঁরা ঘুরতে যাচ্ছেন, দেখতে যাচ্ছেন, তাঁরাও পাচ্ছেন যিশুর আশীর্বাদ। সে গলি এখন গমগম করছে গান-বাজনায়। নাচে পা মেলাচ্ছেন, বৃদ্ধা-বৃদ্ধা থেকে কিশোর-কিশোরীরা। বারান্দাগুলিতে ঝুলছে তারা, ক্রিসমাস ট্রি ঝলমল করছে সব জায়গায়। ভিড়ে তিল ধারণের জায়গা মেলার উপায় নেই। উৎসব সবে শুরু। চলবে আরও কয়েকদিন।