ফের রহস্য! রহস্য বাড়ছে ড্রিমলাইনার বিপর্যয়ের রিপোর্টেও। দুপুর ১টা ৩৮ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে টেক অফ ডিসিশন স্পিড পৌঁছে গেল ১৫৩ নটসে। অর্থাৎ ঘণ্টায় ২৮৩ কিমি। ঠিক এই গতিতে পৌঁছলেই টেক অফ করতে হয় পাইলটকে। টেক অফ করেই গতি নেয় ঘণ্টায় ৩৩৩ কিমি। বিমানের নোজ ঊর্ধ্বমুখী। এবার ল্যান্ডিং গিয়ার গুটিয়ে নেওয়া হবে। ফ্ল্যাপস বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে এসব কিছুই হল না! হঠাৎ পাইলট দেখলেন, ইঞ্জিন ওয়ান এবং টু—দুটিই ‘রান’ থেকে ‘কাট অফ’ মোডে চলে গিয়েছে! ২৪২ জন যাত্রী এবং বিমান ক্রু তখনও জানেন না, কী ঘটছে ককপিটে। বিস্মিত পাইলট প্রশ্ন করলেন, ‘এ কী! ফুয়েল সুইচ কাট অফ করেছ কেন?’ কো-পাইলটও বিস্মিত একই ঘটনায়। সহকর্মীকে তাঁর নার্ভাস জবাব, ‘আমি তো করিনি!’ আমরা জানি, এরপর বিমানটি নিয়ন্ত্রণের আর কোনও সুযোগই তাঁরা পাননি। আমেদাবাদ এয়ারপোর্টের অদূরেই ঘটে যায় বিরাট দুর্ঘটনা, যেটি বিশ্বইতিহাসের দশটি বীভৎতম বিমান দুর্ঘটনার পাশে বসে আলোচিত হচ্ছে। দুর্ঘটনার স্বরূপ উদ্ঘাটনের জন্য দ্রুত তদন্তও শুরু হয়। সেই রিপোর্টই সামনে এসেছে এবার। ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার থেকে তদন্তকারীরা জানতে পারছেন, ঠিক এক সেকেন্ডের ব্যবধানে আবার দুটি ইঞ্জিনই চালানো হয়। অর্থাৎ রান মোড। কিন্তু চালু হয়েও এক সেকেন্ডের ব্যবধানে ফের বন্ধ হয়ে যায় ইঞ্জিন দুটি। স্পিড ড্রপ করছে...। একে একে নিস্তেজ হচ্ছে ফ্রন্ট ফ্যান, কমপ্রেশার এবং টার্বাইনসহ প্রতিটি প্যারামিটার। বেলা ১টা ৩৮ মিনিট ৫২ সেকেন্ড। চালু করার চেষ্টা হচ্ছে ইঞ্জিন-১। ১টা ৩৮ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড। সামান্য যেন আশার আলো। এয়ারক্র্যাফটের এফএডিইসি সিস্টেম ইঞ্জিন-২’কে কিছুটা যেন বাঁচিয়ে তুলছে! একটু সময় চাই পাইলটের। তাহলেই ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং সম্ভব। কিন্তু অভিশপ্ত ১২ জুন কোনোভাবেই ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং হয়নি। ঘটে যায় ভয়াবহ এক বিস্ফোরণ। স্বভাবতই সঙ্গী হয় মৃত্যুমিছিল।
ওইসঙ্গেই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, কে বন্ধ করেছিল দুই ইঞ্জিনের ফুয়েল সুইচ? পাইলট এবং কো-পাইলটের কেউ নন। ককপিট ভয়েস রেকর্ডার সেই সাক্ষ্যই দিয়েছে। এয়ার ইন্ডিয়ার ড্রিমলাইনার ক্র্যাশের প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশিত একমাস পর। কিন্তু এয়ারক্র্যাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর তদন্ত রিপোর্ট দুর্ঘটনার মূল কারণ দর্শানোর থেকেও যেন রহস্যের জট বৃদ্ধির দিকেই আঙুল তুলছে। ইঞ্জিন বন্ধ এবং চালুর জন্য ড্রিমলাইনারে যে সুইচ থাকে, অতিরিক্ত সুরক্ষার লক্ষ্যে সেটির উপরও থাকে একটি করে বিশেষ শিল্ড। থাকে ডিজিটাল লক। অর্থাৎ ইনফ্লাইট অবস্থায় ওই শিল্ড ডিজিটালি সরিয়ে ম্যানুয়ালি সুইচ বন্ধ অথবা চালু করতে হবে। যাকে পরিভাষায় বলা হয় ‘কাট অফ’ এবং ‘রান’। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফুয়েল সুইচ অফ হয়ে গেল কেন? শনিবার কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রী রামমোহন নাইডু বলেছেন, ‘প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছে এএআইবি। কিন্তু তদন্তের একাধিক স্তর এখনও বাকি। আরও অনেক কিছু জানা যাবে। অতএব ধৈর্য ধরতে হবে।’ এয়ারলাইন্স পাইলট অ্যাসোসিয়েশন কিন্তু এই রিপোর্টে ক্ষুব্ধ। তাদের দাবি, পাইলটদের ঘাড়ে দোষ চাপানোর ইঙ্গিত মিলছে। তাদের গুরুতর প্রশ্ন, এটা কি তাহলে প্রকৃত ঘটনা বা সত্য ধামাচাপা দিতে? তেমনটা হলে মেনে নেওয়া হবে না।
ঠিক কী হয়েছিল অন্তিম মুহূর্তে? এয়ারক্র্যাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর রিপোর্ট বলছে, এই বিমান দিল্লি থেকে আমেদাবাদে ল্যান্ড করার পর ফ্লাইট কর্মীরা টেক লগে স্টেটাস রিপোর্ট জমা দেন। পরবর্তী ফ্লাইট, অর্থাৎ লন্ডনে উড়াল দিতে রেডি হয়। টেক অফ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া পর্যন্ত কোনও সমস্যা হয়নি। সমস্যা যা হওয়ার হয়েছে, তারপরই। ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডারে প্রকাশ, বেলা ১টা ৩৯ মিনিট ৫ সেকেন্ডে পাইলট চিৎকার করে এটিসিকে তাঁর শেষবাক্য জানান, ‘মেডে... মেডে... মেডে...(হেল্প মি... হেল্প মি... হেল্প মি...) ।’ তৎক্ষণাৎ কল সাইন ইস্যু করেছিল এটিসি। কিন্তু প্রত্যুত্তরে ককপিট থেকে কোনও শব্দ আসেনি। বেলা ১টা ৪৪ মিনিটে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল দেখল, বিমানটি ভেঙেই পড়ছে। এই হল প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট। কিন্তু এ তো রহস্যের সমাধান নয়, বরং নয়া রহস্য। কেন বন্ধ হল একত্রে দুটি ইঞ্জিনেরই সুইচ—এই রহস্যের দ্রুত কিনারা হওয়া জরুরি। প্রতিটি দুর্গত পরিবার এই একটি উত্তরের জন্যই অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করছে সারা দেশ, সারা পৃথিবীও। কেননা, আগামী দিনের বিমানযাত্রা সবার জন্য কতটা নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে, এই উত্তরের উপর নির্ভর করবে অনেকাংশেই।