Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিতর্ক নয়, সত্যাসত্য

হিন্দি বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য হরিয়ানা। সেখানে ৯০ আসনের বিধানসভার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে। এগজিট পোলে প্রায় প্রতিটি সমীক্ষক সংস্থা কংগ্রেসকেই এগিয়ে রেখেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা মিলেছিল বিপরীত ফল! বিজয়ী হয়েছিল মোদি-শাহদের বিজেপি। কংগ্রেস পেয়েছিল ৩৭টি আর ৪৮টি গেরুয়া শিবির।

বিতর্ক নয়, সত্যাসত্য
  • ৭ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিন্দি বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য হরিয়ানা। সেখানে ৯০ আসনের বিধানসভার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে। এগজিট পোলে প্রায় প্রতিটি সমীক্ষক সংস্থা কংগ্রেসকেই এগিয়ে রেখেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা মিলেছিল বিপরীত ফল! বিজয়ী হয়েছিল মোদি-শাহদের বিজেপি। কংগ্রেস পেয়েছিল ৩৭টি আর ৪৮টি গেরুয়া শিবির। এই প্রসঙ্গ টেনেই কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি একই অভিযোগ-তিরে বিঁধেছেন প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশন রাজীব কুমারকেও। লোকসভার বিরোধী নেতার সাফ কথা, ‘নির্বাচন কমিশন ও মোদি-শাহের আঁতাতেই মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, হরিয়ানার মতো একের পরের পর রাজ্যে জিতেছে বিজেপি। এইভাবেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ভারতের গণতন্ত্র। ভোটারদের সমর্থনে নয়, সিস্টেমের বাঁকাপথেই জিতছে দলটি।’ কেন এই মারাত্মক অভিযোগ রাহুলের? এর ভিত্তিই-বা কী? রাহুলের সোজা-সাপটা জবাব, ‘নির্বাচন কমিশনের থেকে পাওয়া তথ্য। নিজেদের মনগড়া কিছু নয়।’ বিহারে বিধানসভার নির্বাচন শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার। ঠিক তার ২৪ ঘণ্টা আগে, বুধবার হরিয়ানা ভোটের হাইড্রোজেন বোমা ফাটিয়েছেন রাহুল গান্ধী। চব্বিশে হেরে যাওয়া হরিয়ানা ভোটের সমীকরণে তাঁর মন্তব্য, ‘হরিয়ানায় হয়েছে। এবার বিহারেও হবে।’ রাহুলের অভিযোগ, ‘হরিয়ানায় গদিয়ান ভোটচুরির সরকার। মাত্র আটটি আসনের জন্য কংগ্রেস সেখানে সরকার গড়তে পারেনি।’ তাঁর দাবি, ‘হরিয়ানায় ২ কোটি ভোটারের মধ্যে ২৫ লক্ষই তো ভুয়ো! অর্থাৎ প্রতি আটটিতে একটি করে ভোট চুরি হয়েছে। একটি আসনে কংগ্রেস হেরেছে মাত্র ৩২ ভোটে।’ বিরোধী নেতার প্রশ্ন, ‘চুরি না হলে কি এই ভেলকি সম্ভব?’ 

Advertisement

বুধবার কোটলা মার্গে দলের নতুন সদর দপ্তর ইন্দিরা ভবনের প্রেক্ষাগৃহের বড় পর্দায় রাহুল গান্ধী ফুটিয়ে তোলেন একের পর স্লাইড। হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী নায়েব সিং সাইনির এক ভিডিয়ো বক্তব্যও দেখানো হল। সেখানে তাঁকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘ভোটে জেতার যাবতীয় ব্যবস্থা আমাদের করা আছে।’ সেই ‘ব্যবস্থা’ই আসলে বোমার বারুদ। বিস্ফোরণ শুরু হল রাহুলের। এক যুবতি ভোটারের ছবি প্রকাশ্যে আনলেন তিনি। সীমা, সুইটি, সরস্বতী! ওই মহিলারই একাধিক সচিত্র পরিচয়পত্র পর্দায় তুলে ধরলেন তিনি। দাবি করলেন, কমিশনের থেকে পাওয়া ভোটার তালিকাতেই মিলেছে এই তথ্য। রাই বিধানসভা কেন্দ্রের ১০টি বুথের ২২ জায়গায় একই মহিলার ছবি ব্যবহার করে এত ভোটার কার্ড। আরও চমকপ্রদ ব্যাপার এই যে, ওই নারী হরিয়ানভি দূরঅস্ত, তিনি ভারতীয়ই নন—একজন ব্রাজিলিয়ান মডেল! একইভাবে হরিয়ানার অন্য দুটি বুথে একই মহিলার ছবি সংবলিত ২২৩টি ভোটার কার্ডও ফাঁস করেছেন রাহুল গান্ধী! তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, কংগ্রেসকে হরিয়ানায় হারাতে ২৫ লক্ষ ভোটের কারচুপি হয়েছিল। তার মধ্যে ডুপ্লিকেট ভোটার কার্ড ইস্যু হয়েছিল ৫ লক্ষ ২১ হাজার ৬১৯টি। ৯৩,১৭৪টি ঠিকানা ভুয়ো। এক চিলতে ঘরের একই ঠিকানায় মিলেছিল ৫০০ জন পর্যন্ত ভোটার (বাল্ক ভোটার)! সব মিলিয়ে এরকম ভুয়ো ভোটার ছিল ১৯ লক্ষ ২৬ হাজার ৩৫১ জন। যে আটটি আসনের জন্য কংগ্রেসের পরাজয়, সেখানে মোট ভোটের তফাত মাত্র ২২,৭৭৯। রাহুল দেখিয়ে দিয়েছেন, উত্তরপ্রদেশের বিজেপি নেতাদেরও নাম রয়েছে হরিয়ানায়। আর এইসব কারচুপি আড়াল করতেই নির্বাচন কমিশন বুথের সিসি ক্যামেরা ফুটেজ নষ্ট করে ফেলেছে। এমনকি, বিহারে এসআইআরের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন তিনি। ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণের পর নাম বাদ পড়া কয়েকজনকেও এদিন মঞ্চে হাজির করেন রাহুল গান্ধী। 
যদিও রাহুলের এই বোমাকে ‘বকওয়াস’ বলেই উড়িয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রের সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। তিনি বলেছেন, ‘আসলে বিহার কংগ্রেস হারবে জেনেই দৃষ্টি ঘোরাতে তৎপর রাহুল গান্ধী।’ হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী নায়েব সিং সাইনিও বিষোদ্গারসহ কংগ্রেস নেতাকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলে তোপ দেগেছেন। তাঁর দাবি, হতাশা থেকেই এই ধরনের মন্তব্য করছেন রাহুল। যাবতীয় অভিযোগ ‘মিথ্যে’ বলে নির্বাচন কমিশনও দাবি করেছে। তাদের প্রশ্ন, ভোটার তালিকায় যদি এতই গোলমাল হয়ে থাকে, তাহলে হরিয়ানায় ভোটের সময় কেন অভিযোগ দায়ের করা হয়নি? কংগ্রেসের বিএলএ-রা কী করছিলেন? বিহারে এসআইআর পর্বেও কেন একটিও অভিযোগ জানায়নি রাহুল গান্ধীর দল? মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে নির্বাচন কমিশন প্রভৃতি যে সাফাই দিন না কেন, তাঁরা কিন্তু বিরোধী নেতার তুলে ধরা বিতর্কিত ভোটার তালিকাকে মিথ্যা বলে খারিজ করে দিতে পারেননি। ওই ভোটার তালিকার সত্যাসত্য অবিলম্বে প্রকাশ করা হোক। এই অনাচার সত্য হলে তা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। বৃহত্তম গণতন্ত্রের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থেই এটি জরুরি। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ