Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চাকরি নেই, যুবসমাজের কর্মসংস্থান সঙ্কটে

ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয় ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পক্ষেত্রকে (এমএসএমই)। কিন্তু সাম্প্রতিক বিভিন্ন রিপোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, এই সেক্টরের হাল যতটা ভালো বলে দাবি করছে সরকার, ততটাও নয়।

চাকরি নেই, যুবসমাজের কর্মসংস্থান সঙ্কটে
  • ২৬ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয় ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পক্ষেত্রকে (এমএসএমই)। কিন্তু সাম্প্রতিক বিভিন্ন রিপোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, এই সেক্টরের হাল যতটা ভালো বলে দাবি করছে সরকার, ততটাও নয়। বরং এই শিল্পক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতাই ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ। সম্প্রতি এমএসএমই নিয়ে দু’টি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। দু’টিই সরকারি। একটি স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক বা সিডবি’র। অন্যটি খোদ নীতি আয়োগের। এছাড়াও অ্যানুয়াল সার্ভে অব আনইনকর্পোরেটেড সেক্টর এন্টারপ্রাইজেসের (এএসইউএসই) তথ্য তো রয়েছেই। সেগুলি বিশ্লেষণ করলে এই সেক্টরের বর্তমান চিত্রটি স্পষ্ট হয়।

Advertisement

তথ্য ও‌ বাস্তবতা
ওই দু’টি রিপোর্ট কী কী তথ্য উঠে আসছে?
বর্তমান শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, ক্ষুদ্র শিল্প হল সেই সব‌ প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিনিয়োগের অঙ্ক আড়াই কোটি টাকার মধ্যে এবং বার্ষিক টার্নওভার ১০ কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ। ছোট শিল্পের ক্ষেত্রে এই সীমা যথাক্রমে ২৫ কোটি ও ১০০ কোটি টাকা, আর মাঝারি উদ্যোগের জন্য ১২৫ কোটি ও ৫০০ কোটি টাকা। এই সংজ্ঞা অনুসারে, ভারতের প্রায় সব ক’টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানই এমএসএমই-র আওতায় পড়ে।  
তবে এই সেক্টর অত্যন্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ। মোট এমএসএমই-র মধ্যে ৯৮.৬৪ শতাংশই হল ক্ষুদ্র শিল্প। যেখানে ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের অংশ মাত্র ১.২৪ ও ০.১২ শতাংশ। মালিকানার দিক থেকে দেখলে, ৫৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান একক মালিকানাধীন, ১৬ শতাংশ অংশীদার ভিত্তিক, ২৩ শতাংশ প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি এবং মাত্র ১ শতাংশ পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি।  
২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারতে মোট এমএসএমই-র সংখ্যা প্রায় ৭.৩৪ কোটি। এর মধ্যে ৬.২০ কোটিই ‘উদ্যম’ 
পোর্টালে নথিভুক্ত হয়েছে। তবে এই বিশাল পরিসংখ্যানের বিপরীত চিত্র রয়েছে। তাই হল আর্থিক সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক ঘাটতি। এমএসএমই সেক্টরে মোট ৩০ লক্ষ কোটি টাকার ক্রেডিট গ্যাপ বা ঋণ ঘাটতি রয়েছে, যা মোট চাহিদার ২৪ শতাংশ। পরিষেবা সাব-সেক্টরে এই ঘাটতি ২৭ শতাংশ আর নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত।  
রপ্তানির ক্ষেত্রে এমএসএমই-গুলির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারতের মোট পণ্য রপ্তানির ৪৫ শতাংশ এসেছে এই ক্ষেত্র থেকে। তবে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ১,৭৩,৩৫০টি। সংখ্যাটা মোট এমএসএমই-র ১শতাংশেরও কম। প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে রেডিমেড পোশাক, রত্ন ও গহনা, চামড়াজাত দ্রব্য, হস্তশিল্প, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং অটো কম্পোনেন্ট—যেগুলির বেশিরভাগই সেভাবে প্রযুক্তি নির্ভর নয়।  
সরকারি স্তরে এমএসএমই-র জন্য নানা ধরনের সহায়তা প্রকল্প চালু রয়েছে। বিভিন্ন রিপোর্টে অন্তত দু’টি ভর্তুকি প্রকল্প, চারটি ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম এবং অন্তত ১৩টি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়। ২০২৫-২৬ সালের বাজেটে প্রথমবারের মতো ছোট উদ্যোগপতিদের জন্য বিশেষ প্রকল্প, একটি ক্রেডিট কার্ড স্কিম, নতুন ফান্ড অব ফান্ডস, ডিপ টেক ফান্ড অব ফান্ডস এবং হকারদের জন্য সংশোধিত পিএম স্বনিধি প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে।  
এই সেক্টরকে ভারতের কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আনুমানিক ২৬ কোটি মানুষ এমএসএমই-তে কাজ করে, যা দেশের শ্রমবাজারের একটি বিশাল অংশ। তবে এই কর্মসংস্থানের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, কারণ বেশিরভাগ ক্ষুদ্র শিল্পেই কাজের পরিবেশ ও স্থিতিশীল আয়ের সুযোগ নিশ্চিত নয়। স্থায়ী চাকরি এবং দক্ষতা বৃদ্ধির অভাব এই ক্ষেত্রের বড় সীমাবদ্ধতা।
সংক্ষেপে বলা যায়, এমএসএমই সেক্টরের সঠিক বিকাশ ছাড়া ভারতের যুবকদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা সরলীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নীতিগত সহায়তার সমন্বয়।
কাজ আছে, কর্মী নেই
এমএসএমই সেক্টরই হয়তো যুবকদের কর্মসংস্থানের মূল চাবিকাঠি—কিন্তু সেটি তখনই সম্ভব, যখন এই শিল্পের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি গুণগত উন্নয়নও নিশ্চিত করা যাবে।
ভারতের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) নিয়ে সমীক্ষাগুলি একটি মৌলিক সমস্যার দিকে আঙুল তুলছে– ‘দক্ষ কর্মীর অভাব, দক্ষতার ফারাক এবং প্রতিভা আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা।’ এটাই দেশের বেকারত্বের আসল কাহিনি। তথ্য বিশ্লেষণ করলে একটা‌ বিষয় স্পষ্ট যে, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলি (যেখানে বিনিয়োগ ১২৫ কোটি টাকার বেশি এবং টার্নওভার ৫০০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে) সাধারণত উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী নিয়োগ করে। সেই দক্ষতা কিংবা শিক্ষা বেশিরভাগ বেকার যুবকের পক্ষে অর্জন করা কার্যত অসম্ভব। অন্যদিকে, এমএসএমই-গুলি সাধারণত শ্রমিক চায়। কিন্তু তারপরও কেন তারা দক্ষ কর্মী পায় না? উত্তর দু’টি: প্রথমত, চাকরিপ্রার্থীদের শিক্ষা ও দক্ষতা চাহিদার সঙ্গে মানানসই নয়। দ্বিতীয়ত, অপ্রতুল বেতন বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ন্ত্রিত কাঠামো চাকরিগুলিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে না।
ভারতের কর্মসংস্থানের আসল চিত্র
২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারতের জনসংখ্যা ছিল ১৪৬ কোটি। এর মধ্যে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার (এলএফপিআর) ৫৫.৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় 
৮১ কোটি মানুষ কাজ করতে সক্ষম বা সক্রিয়ভাবে চাকরি খুঁজছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কর্মরত মানুষের সংখ্যা (ডব্লুপিআর) ৫২.৮ শতাংশ বা ৭৭ কোটি। অর্থাৎ, সক্রিয়ভাবে চাকরি খুঁজছেন ৪ কোটি বেকার। এই সংখ্যাটি আরও ভয়াবহ যখন আমরা জানি, অসংখ্য মানুষ চাকরি খোঁজাই ছেড়ে দিয়েছেন হতাশায়। সরকারি হিসাবে বেকারত্বের হার ৫ শতাংশ, ৮১ কোটির মধ্যে ৪ কোটি, কিন্তু প্রকৃত চিত্রটি এর চেয়েও জটিল।
সমাধানের পথ
এমএসএমই সেক্টরের ৯৮.৬৪ শতাংশই ক্ষুদ্র শিল্প, যার ৭৫% একক মালিকানার বা পারিবারিক ব্যবসা। ২৬ কোটি নিযুক্ত কর্মীর বেশিরভাগই পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়-স্বজন। প্রকৃত চাকরি সৃষ্টি হয় মাত্র ১০ লক্ষ ছোট ও মাঝারি শিল্পে (এমএসএমই-র ১.৩৬ শতাংশে)।
এখানেই চাকরির বাজারের মূল সমস্যা নিহিত। একদিকে চাকরির জোগান আসতে হবে পুরো ১০ লক্ষ এমএসএমই থেকে। অন্যদিকে স্কুল ড্রপআউট থেকে সাধারণ স্কুলপাস বা সাধারণ কলেজ ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীদের চাকরির চাহিদা থাকতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই দুই প্রান্তের মধ্যে একটি বিশাল ফারাক কাজ করছে।
সমস্যার মূল দিক দু’টি। এক, চাকরিদাতাদের সঙ্কট। ঋণের অভাব, জটিল নিয়মকানুন এবং সরকারি স্কিমগুলির জটিলতার বোঝায় এমএসএমই-গুলি জর্জরিত। দুই, চাকরিপ্রার্থীদের সীমাবদ্ধতাও প্রকট। নিম্নমানের শিক্ষা, দক্ষতার অভাব এবং প্রশিক্ষণের সুযোগের অভাবে যুবকেরা চাহিদামাফিক কাজ পায় না। সংক্ষেপে বলতে গেলে, প্রতিষ্ঠানগুলি ‘দক্ষ কর্মী’ পাচ্ছে না, আর চাকরিপ্রার্থীরা ‘উল্লেখযোগ্য মেধা’ও দেখাতে পারছে না।
তাহলে কী করা প্রয়োজন? এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য প্রশাসনের দু’টি মৌলিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন। স্কুলস্তর থেকেই কারিগরি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও ছোট শিল্পের জন্য 
ঋণ প্রক্রিয়ার সরলীকরণ। একাধিক স্কিমের বেড়াজালে না গিয়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থাই যথেষ্ট। একটি মাত্র সহজ-সরল ঋণ ও সুদভর্তুকি স্কিম 
চালু করতে হবে, যাতে বিনিয়োগের টাকা পেতে সমস্যায় না হয়। তৃতীয়ত, নিয়মকানুনের বোঝা কমানো। এমএসএমই-গুলিকে এ থেকে মুক্তি 
দিতে হবে, যাতে তারা শুধু ব্যবসা বাড়ানোর দিকে মন দিতে পারে।
এমএসএমই সেক্টরই ভারতের যুবশক্তির কর্মসংস্থানের মূল স্তম্ভ। কিন্তু এই ক্ষেত্রে শুধু 
সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, গুণগত উন্নয়ন জরুরি। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সরকারি নীতির সমন্বয়ে এই সঙ্কট 
কাটানো সম্ভব—নইলে চাকরি থাকলেও কর্মী পাওয়া যাবে না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ