স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে রোজগার করতে হয়। মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে শ্রম এবং পণ্যের দাম মেটানো হয় টাকায়। একজন মানুষ একবারে কিংবা বিভিন্ন দফায় যত টাকা আয় করে তার সবটাই সে খরচ করে ফেলে না। তাকে কিছু সঞ্চয়ও করতে হয়। সঞ্চয়ের প্রয়োজন একাধিক—আপৎকালীন প্রয়োজন মেটানো, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, জমি-বাড়ি ও গয়নাসহ নানা ধরনের সম্পদ সংগ্রহ, দানধ্যান ও উপহার প্রদান প্রভৃতি। ব্যক্তিগত অর্থ আগে পারিবারিক সিন্দুকে ভরে রাখা হতো। রাজকোষের অর্থও থাকত তেমনই কোনও ভাণ্ডারে। কিন্তু তার সমস্যা ছিল একাধিক—অর্থের হাত বদলের সুযোগ ছিল অতিসীমিত, টাকার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ছিল অচিন্তনীয়, আর ছিল অহরহ চুরি-ডাকাতির ভয়।
এতগুলির সমস্যার ‘এক জানালা’ সমাধান দিতেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছিল। ব্যাংকিং ব্যবস্থার আশীর্বাদকে বহুবর্ধিত করেছে লেনদেনের ডিজিটাল সিস্টেম। উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর এই নয়া ব্যবস্থা প্রতিটি লেনদেনের হিসেবকে নিখুঁতভাবে সংরক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ইলেক্ট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের সবচেয়ে উপযোগী ব্যবস্থার নাম ‘রিয়েল-টাইম পেমেন্টস’ (আরটিআর)। এই ব্যবস্থায় মুহূর্তের মধ্যে এবং ছুটির দিনগুলিসহ ২৪×৭ লেনদেন সম্পন্ন হয় বলে সময়ের সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিরাট আর্থিক লাভালাভও হয় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের। তার ফলে আর্থিক কারচুপি, দুর্নীতি, নথি জালিয়াতি প্রভৃতি সহজেই রুখে দেওয়া গিয়েছে। সরকারি তহবিল বণ্টনে স্বচ্ছতার প্রশ্নে একটি বড় ভরসা হল ডিজিটাল পেমেন্ট। আবার এর ভিতরেই বাসা বেঁধেছে মারাত্মক বিপদ। নগদ টাকার ব্যবহার সীমিত হতেই দুর্বৃত্তরা হানা দিচ্ছে ডিজিটাল লেনদেনে। এই নয়া ব্যবস্থার ফাঁকফোকর খুঁজে তারা হাতসাফাই অভিযানে নেমেছে বিশ্বজুড়ে। তার মধ্যে ভারত একটি উল্লেখযোগ্য নাম। ভারতের অর্থনীতি দুর্বল হলেও ডিজিটাল লেনদেনে এক অন্যতম চ্যাম্পিয়ন। গড় ভারতবাসীর বুদ্ধিসুদ্ধি যেমনই হোক দুর্বুদ্ধিতে এদেশের কিছু লোক যে যথেষ্ট দড় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ডিজিটাল লেনদেনের বিপদ সম্পর্কে প্রশাসন (কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলির সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ বিভাগ) আম জনতাকে লাগাতার সজাগ এবং সতর্ক করে চলেছে। তাতে প্রতারক চক্রগুলি বেকায়দায় পড়তেই নয়া নয়া ফন্দি বার করে লোকজনকে ঠকাচ্ছে। তাদের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে ফের কিছু লোক। লেনদেনের অ্যাপে ক্ষতিকারক ভাইরাস ঢোকানো, ভুয়ো ওয়েবসাইট ছেড়ে রাখা, ওটিপি এবং ব্যাংক লেনদেনের গোপন তথ্যাদি সংগ্রহ এসব চলছিলই। সব শেষে এসেছে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ নামক এক নতুন বিপদ। সব মিলিয়ে যা দেখা যাচ্ছে, জিজিটাল প্রতারকরা থেমে যাওয়ার পাত্র নয়, তাদের থমকে যাওয়াটা নিতান্তই সাময়িক, নয়া নয়া ফন্দি নিয়ে তারা ফের আসরে হাজির হচ্ছে এবং লোকজনকে বিপন্ন করে তুলছে। এমনই একটি বিপদ হল—ইন্টারনেটে ‘ব্যাংকের কাস্টমার কেয়ার’-এর নাম করে ভুয়ো নম্বর প্রচার। ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড হারিয়ে ফেলে অনেকে ইন্টারনেট ঘেঁটে নিরাপদ কাস্টমার কেয়ার নম্বর খুঁজে বার করেন এবং সেটির সাহায্যে হারিয়ে যাওয়া কার্ড ব্লক করেন। প্রতারকদের খপ্পর থেকে বাঁচতেই প্রচেষ্টা। দুর্বৃত্তরা এবার এই ব্যবস্থার মধ্যেই ফাঁদ পেতে রেখেছে। এরকম যাচাই না-করা নম্বরে ফোন করতেই যাবতীয় গোপন তথ্য জেনে নিচ্ছে ‘ব্যাংক অফিসার’ সেজে বসে থাকা দুর্বৃত্ত। সেখানে সরল বিশ্বাসে যোগাযোগ করা গ্রাহক কিছুক্ষণ পরেই মেসেজ পাচ্ছেন যে তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট মুহূর্তে সাফ হয়ে গিয়েছে!
এমন বিপদ দেশজুড়েই উত্তরোত্তর বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে জনসাধারণকে রক্ষার পথ বাতলে দিতে নতুন প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রের টেলিকম ডিপার্টমেন্ট। তাদের ‘সঞ্চার সাথী’ ওয়েবসাইট এবং অ্যাপেই মিলবে দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক সংস্থার যাবতীয় তথ্য। সেখানে যোগাযোগ সম্পূর্ণ নিরাপদ। আর্থিক প্রতারণা এড়াতে সুবিশাল তথ্য-ভাণ্ডারও তৈরি করেছে যোগাযোগ মন্ত্রক। সেখান থেকেই আম জনতা পেয়ে যাবে ব্যাংক ও আর্থিক সংস্থাগুলির আসল টোল ফ্রি নম্বর, ওয়েবসাইট, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ও ইমেল আইডি। সেগুলিতে নির্দ্বিধায় যোগাযোগ বা অভিযোগ জানাতে পারবে সকলে। এক্ষেত্রে প্রতারণার কোনও ভয় থাকবে না। এমনকী, ফোন, মেসেজ বা ইমেল মারফত প্রতারক হানার ক্ষেত্রেও রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়াল ‘সঞ্চার সাথী’ পোর্টাল এবং অ্যাপ। যে নম্বর থেকে ফোন বা মেসেজ কিংবা ইমেল আসছে, গ্রাহক নিজেই সেটি এই অ্যাপের মাধ্যমে যাচাই করে নিতে পারবেন। কিন্তু এবার গ্রাহককেও সমান সচেতন এবং উদ্যোগী হতে হবে। তবেই সরকারি ব্যবস্থার সুফল পৌঁছবে সবার কাছে। প্রতাকরদের ভবিষ্যৎ চাতুরির বিষয়েও সজাগ থাকতে হবে আমাদের। কারণ তারা কিন্তু সহজে হেরে এবং হটে যাওয়ার পাত্র নয়।