Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দরকার সমস্যা সমাধানের সদিচ্ছা

মুখের সামনে মাইক থাকলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাধারণত অনেক চমকপ্রদ কথা বলেন। গত বছর লোকসভা ভোটের আগে দেশকে হতভম্ব করে বলেছিলেন, তিনি ঈশ্বরের দূত।

দরকার সমস্যা সমাধানের সদিচ্ছা
  • ২৭ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মুখের সামনে মাইক থাকলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাধারণত অনেক চমকপ্রদ কথা বলেন। গত বছর লোকসভা ভোটের আগে দেশকে হতভম্ব করে বলেছিলেন, তিনি ঈশ্বরের দূত। পহেলগাঁও কাণ্ডের জেরে ভারতীয় সেনার সফল সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের পর এই সেদিন রাজস্থানে দাঁড়িয়ে বললেন, আমার শিরায় গরম সিঁদুর বইছে। এবার ভিন্ন প্রেক্ষিতে নীতি আয়োগের বৈঠকে বললেন, যদি কেন্দ্র এবং সমস্ত রাজ্য একজোট হয় এবং ‘টিম ইন্ডিয়ার’ মতো একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে কোনও লক্ষ্যপূরণই অসম্ভব হবে না। বিকশিত ভারত প্রতিটি ভারতীয়েরই লক্ষ্য। যখন প্রতিটি রাজ্য বিকশিত হবে, তখন ভারতও বিকশিত হবে। এটাই ১৪০ কোটি নাগরিকের আকাঙ্ক্ষা। প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসার প্রায় এগারো বছর পরে মোদির মুখে এমন কথা শুনলে কল্পকাহিনি বলে মনে হতে পারে। কারণ, বিকশিত ভারত গড়ার মূল দায়িত্ব যার, সেই মোদি সরকারের হাতেই বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলির প্রতি বঞ্চনা, বৈষম্যের বারবার অভিযোগ উঠেছে। এককথায় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কাঠামোতেই আঘাতের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবছর একবার করে নীতি আয়োগের পরিচালন পর্ষদের বৈঠক বসে। অপারেশন সিন্দুরের পর দলমত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দল ও দেশবাসী মোদি সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেই আবহেই প্রধানমন্ত্রী চান, তাঁর ২০৪৭-এ বিকশিত ভারতের লক্ষ্যপূরণে রাজ্যগুলি সেইভাবেই কেন্দ্রের পাশে থেকে একসঙ্গে কাজ করুক। এর জন্য রাজ্যগুলিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে, মাথাপিছু আয় বাড়াতে হবে। বড় রাজ্যগুলিকে ‘ভিশন ডকুমেন্ট’ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি রাজ্যকে আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। উত্তম প্রস্তাব। 

Advertisement

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত, ২০৪৭-এর বিকশিত ভারতের লক্ষ্যপূরণে যা কিছু করা তা রাজ্যগুলিকেই করতে হবে। আর বাস্তবে কি তাঁর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার বঞ্চনা, বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলিকে আর্থিকভাবে দমনপীড়ন, যুক্তরাষ্ট্রীয় মর্যাদাকে পদদলিত করে চলবে? সেইসঙ্গে জারি থাকবে বিদ্বেষ ছড়িয়ে বিভাজন তৈরির চেষ্টা। অভিজ্ঞতা সেরকমই। প্রশ্ন হল, রাজ্যগুলিকে নিয়ে ‘টিম ইন্ডিয়া’ হিসেবে লড়াইয়ের কথা বললেও বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলিকে ঠিক কী চোখে দেখে মোদি সরকার? নীতি আয়োগের বৈঠকেই ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন অভিযোগ করেন, তাঁর রাজ্যে শুধু খনির জমি ব্যবহার বাবদ কেন্দ্রের কাছে পাওনা রয়েছে ১ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়াও একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা বকেয়া। কেন্দ্রের কাছে বাংলার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পাওনা ১ লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এ রাজ্যে ১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনা প্রকল্পের অর্থ দেওয়া বন্ধ করে রেখেছে দিল্লি। দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্রীয় ‘পিএম শ্রী’ প্রকল্পের সঙ্গে তাঁর রাজ্য সহমত না হওয়ায় প্রাপ্য ২২০০ কোটি টাকা দিচ্ছে না কেন্দ্র। স্ট্যালিনের আরও একটি দাবি যা প্রায় সব রাজ্যেরই তা হল, কেন্দ্রের কর বাবদ আয়ের ৫০ শতাংশ অর্থ রাজ্যগুলির মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হোক। এখন রাজ্যগুলি পায় ৩৩.৬ শতাংশ অর্থ। তেলেঙ্গানার কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি মুম্বই, কলকাতা, চেন্নাই, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরুর মতো মেট্রোপলিটন শহরগুলির সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে টাস্কফোর্স তৈরির দাবি জানান। পাঞ্জাবের আম আদমি পার্টির মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মানের অভিযোগ ছিল, পাঞ্জাবকে ইচ্ছাকৃতভাবে জলবণ্টনে বঞ্চিত করা হচ্ছে। কেন্দ্র ইচ্ছা করলেই এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। মোদি জমানায় ধনী-দরিদ্রের অসাম্য যে বেড়েই চলেছে তা নীতি আয়োগের সমীক্ষা রিপোর্ট থেকেই জানা যাচ্ছে। 
যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার মূল কথাই হল, রাজ্যগুলিকে দুর্বল করে রেখে শুধু কেন্দ্রকে শক্তিশালী করলে প্রকৃত উন্নয়ন হয় না। তাতে একটা দেশ ভালো থাকতে পারে না। বিকশিত ভারত মানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনযাত্রায় মানোন্নয়ন ঘটানো। ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি যোজনা কমিশন ভেঙে দেশের ভোলবদলাতে ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ট্রান্সফর্মিং ইন্ডিয়া’, সংক্ষেপে নীতি আয়োগ তৈরি করেন মোদি। ভাবা হয়েছিল, নীতি আয়োগ ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ হিসেবে কাজ করবে। উদ্ভাবনী পরিকল্পনা করবে মোদি সরকারের জন্য। আসলে ভোলবদলের কথা বলা হলেও নীতি আয়োগের কাজকর্মের সঙ্গে যোজনা কমিশনের ঠিক কোথায়, কী ধরনের পার্থক্য হল, তা বুঝতে পারছেন না অর্থনীতিবিদদের একাংশ। এ আসলে পুরনো নাম বদলে নতুন কিছু করে দেখানোর প্রচেষ্টা। কোনও সন্দেহ নেই যে, একটা শক্তিশালী দেশ, দেশের উন্নত অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে রাজ্যগুলিকে অনেক বেশি স্বাবলম্বী হতে হবে। তাদের নিজস্ব রোজগারের পথ বাড়াতে হবে। এ জন্য বহুক্ষেত্রে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের খোলনলচে বদলাতে হবে। শুধু মুখে ‘টিম ইন্ডিয়া’, কেন্দ্র-রাজ্যের হাতে হাত ধরে চলার মতো গরম গরম কথা বললে কেন্দ্রের তরফে সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সম্ভবত এই কারণেই দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস নীতি আয়োগকে একটি ‘অযোগ্য’ সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে আসল সমস্যা থেকে মুখ ঘোরানোর চেষ্টা বলে অভিযোগ তুলেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী ‘আপনি আচরি ধর্ম’ পালন করলেই তাঁর সদিচ্ছা প্রমাণিত হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ