পরিবেশ রক্ষায় ভারতের স্থান একেবারে নীচের দিকে। সারা পৃথিবীর ১৮০টি দেশের উপর তৈরি রিপোর্টে ভারতের স্থান হয়েছে ১৭৬তম। ২০২৪ এনভায়রনমেন্টাল পারফর্ম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই) অনুসারে আমাদের মহান ভারতের পরিবেশ ভাবনার এক হতাশাজনক ছবিই দেখছে পৃথিবী। দু’বছর অন্তর এই সমীক্ষা রিপোর্ট যৌথভাবে তৈরি করে ইয়েল সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল ল অ্যান্ড পলিসি এবং কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল আর্থ সায়েন্স ইনফর্মেশন নেটওয়ার্ক। এই রিপোর্ট তৈরিতে অনেকগুলি ‘আউটকাম-ওরিয়েন্টেড ইন্ডিকেটর’ ব্যবহার করা হয়। যেমন—দৃশ্যমান পরিবেশগত ঝুঁকিসমূহ, বাতাসের কোয়ালিটি, প্রবাহিত বাতাস শ্বাস-প্রশ্বাসের পক্ষে কতটা নিরাপদ, বাতাসের দূষণমাত্রা, জলের অবস্থা, স্যানিটেশন, বাস্তুতন্ত্র, স্বাস্থ্য ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য জল পরিশোধনের পরিকাঠামো, সবুজায়নে বিনিয়োগ, সবুজায়নের জন্য উদ্ভাবনী কাজকর্ম এবং জলবায়ু পরিবর্তনে রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রভৃতি। সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে তিনটি বিষয়: ক্লাইমেট চেঞ্জ পারফর্ম্যান্স, এনভায়রনমেন্টাল হেলথ এবং ইকোসিস্টেম ভাইটালিটি। পুরো বিচারে সমীক্ষকদের সবচেয়ে হতাশ করেছে যেসব দেশ তাদের মধ্যে ভারত উল্লেখযোগ্য! মোট ১৮০টি দেশের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তালিকায় ভারতের ঠাঁই হয়েছে একদম নীচের দিকে! আমাদের নীচে মাত্র চারটি দেশ—মায়ানমার, লাওস, পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম। আর্থিক সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, সাংবাদিকের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, ধনবৈষম্য, লিঙ্গসমতা, নাগরিকের সুখানুভূতি প্রভৃতি কোনও সমীক্ষা রিপোর্টেই ভারতের মুখ উজ্জ্বল নয়। সবেতেই ভারত মাঝামাঝি কোনও স্থানে অথবা নীচের দিকেই। কিন্তু ভারতকে এতটা নিচুতে ঠেলে দেয়নি আগের কোনও রিপোর্ট।
ভারতের এই লজ্জাজনক র্যাঙ্ক নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল মোটেই বিস্মিত নয়। মোদি সরকারের ভয়াবহ পরিবেশ নীতিকেই দায়ী করে তারা। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, পুরনো পরিবেশ আইনকে সময়োপযোগী ও আরও কঠোর করা দরকার। এই সংক্রান্ত নতুন আইন প্রণয়নও জরুরি। তাঁদের অভিযোগ, তার পরিবর্তে পুরনো আইন আরও শিথিল করা হয়েছে। উপকূল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ ও বন্যপ্রাণ আইন, অরণ্য অঞ্চলে খনিজ উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ আইন প্রভৃতি জলাঞ্জলি যাওয়ার প্রহর গুনছে। পরিবেশ কর্মীরা মনে করেন—পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র, জলাভূমি প্রভৃতি অঞ্চলে নির্বিচারে শিল্পায়ন, পর্যটন প্রসার এবং নগরায়ণের সৌজন্যে পরিবেশ বস্তুত বলাৎকারের শিকার। এইসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেশের ভিতরে বহু আন্দোলন হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু একচক্ষু রাষ্ট্র সে-সবে কান দেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করেনি। আন্তর্জাতিক মহল দেশের পরিবেশ কর্মীদের আর্তনাদেই বারবার সিলমোহর দিয়েছে। তাদের মন্তব্য এবং আশঙ্কা যে কোনোভাবেই অমূলক নয়, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে উত্তর ভারতের হালফিল পরিস্থিতি। বৃষ্টি-ধসে বিপর্যস্ত বৈষ্ণোদেবী। মৃত ৩৬! বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। প্রকৃতির রুদ্ররোষে মুত্যুপুরী বৈষ্ণোদেবী! জখমও অনেক মানুষ। আটকেও আছেন বহু পুণ্যার্থী। উদ্ধার কাজে নেমে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি টিম। নাগাড়ে বৃষ্টিতে ভীত গোটা জম্মু। বাকি রাজ্যগুলিতেও চার-পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। বিপর্যস্ত পাঞ্জাব এবং হিমাচলও। ব্যাপারটাকে প্রকৃতির প্রতিশোধ ছাড়া কীই-বা বলা যাবে?
এবার কি সংবিৎ ফিরবে সরকার বাহাদুরের? ঘটা করে প্রতিবছর পরিবেশ দিবস পালিত হয়, শোনা যায় লম্বা-চওড়া ভাষণ। ওটাই সার। সুরাহা মেলে না কিছুই। প্রধানমন্ত্রীর দাবি, পরিবেশরক্ষায় বিশ্বে নজির গড়েছে ভারত! ২০২২ সালের জুন মাসে দিল্লির বিজ্ঞান মঞ্চে ‘মাটি বাঁচাও’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদি বলেন, পরিবেশরক্ষায় ভারতের চেষ্টা বহুমাত্রিক। মৃত্তিকারক্ষায় পাঁচটি বিষয়ের উপরে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, গত আটবছরে দেশের ২০ হাজার বর্গ কিমি এলাকায় গড়ে উঠছে সমৃদ্ধ বনাঞ্চল। রেকর্ড সংখ্যায় বেড়েছে বন্যপ্রাণী। মাটি বাঁচাতে সরকার মূলত পাঁচটি বিষয়ের উপরে জোর দিচ্ছে: মাটিকে রাসায়নিক মুক্ত করা। মাটিতে বসবাসকারী প্রাণীকুল রক্ষা। মাটিতে জলের পরিমাণ বৃদ্ধি। ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণ হ্রাসের কারণে মাটির যে ক্ষতি হচ্ছে তা লাঘব করা। বনভূমি হ্রাসের দরুন মৃত্তিকার ক্ষয় বন্ধ করা। দেশে ১৩টি বড় নদীর রক্ষণাবেক্ষণও শুরু হয়েছে। কমেছে নদীর দূষণমাত্রা। ‘নমামি গঙ্গা’ প্রকল্প অধিক গতিলাভ করেছে। কিন্তু তিনবছর পেরিয়ে এসে আজ এই সরকারের কীর্তি-কাহিনি ‘রিভিউ’ করে ধ্বংসলীলার অধিক কী দেখছে আতঙ্কিত ভারত? ১৯৭৩ সাল থেকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হচ্ছে। ‘লাইফ’ (লাইফস্টাইল ফর দি এনভায়রনমেন্ট) চালু করছেন মোদি ২০২২-এ। দেশের সমস্ত পরিবেশ ও অরণ্য আইন, বিধি ও প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার পর গালভরা ‘লাইফ’ প্রকল্প দিয়ে ইকো-চ্যাম্পিয়ন হওয়া কি সম্ভব আদৌ? না। সেটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে উত্তর ভারতের বেনজির ধ্বংসলীলা ও মৃত্যু মিছিল। মনে রাখতে হবে, পরিবেশ আর যাই হোক কোনও সস্তার রাজনৈতিক তরজার সাবজেক্ট নয়, দ্রুত এবং আন্তরিকভাবেই ভাববার বিষয় এটা। সেই কাণ্ডজ্ঞান হোক সরকারের এবং আমাদের সকলেরও।