প্রকৃতির যে অনির্বচনীয় আকর্ষণে বারবার ছুটে যায় মানুষ, সেই প্রকৃতিরই রুদ্র রোষের সাক্ষী হল দার্জিলিং ও ডুয়ার্স। শনিবার এক রাতের প্রবল বর্ষণ ও ধসে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত ও বিপন্ন এই বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকা। রাতভর দুর্যোগে অন্তত ২৮টি তাজা প্রাণ চলে গিয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা। জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে হস্তিশাবক, বাইসন, হরিণের মতো বন্যপ্রাণী। বিপর্যয়ের হাত থেকে রেহাই মেলেনি কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহারের মতো উত্তরবঙ্গের বাকি জেলাগুলিও। প্রকৃতির রোষে পাহাড়ের রানি দার্জিলিং-এ এমন বড় বিপর্যয় আগে কবে হয়েছে তা মানুষ মনে করতে পারছেন না। বৃষ্টিতে রাস্তা ধসে, সেতু ভেঙে কোথাও কোথাও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। জলের তলায় চলে গিয়েছে ঘরবাড়ি, জমি-জঙ্গল। সিকিম-কালিম্পংয়ের ‘লাইফ লাইন’ ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক কিংবা দার্জিলিংগামী ১১০ নম্বর জাতীয় সড়ক সহ ৫০টিরও বেশি জায়গা বিধ্বস্ত চেহারা নিয়েছে। অন্তত ৫০ হাজার মানুষ জলবন্দি হয়ে পড়েছেন। আটকে পড়েছেন হাজার হাজার পর্যটক। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিরিক। দুর্যোগের জেরে সঙ্গতকারণেই দার্জিলিংয়ের সবক’টি পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছে। উত্তরবঙ্গমুখী একাধিক ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৬৮ সালের ৪ অক্টোবর এমনই এক ভয়াবহ বন্যায় ভেসে গিয়েছিল উত্তরবঙ্গের জেলাগুলি। এবারের বিপর্যয় হয়তো তাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। তবে আশার কথা হল, সোমবার সকাল থেকে আবহাওয়ার খানিক উন্নতি হয়েছে। খুব ধীরে হলেও জল নামতে শুরু করেছে। কিন্তু যাবতীয় ক্ষত সারিয়ে পাহাড় কতদিনে স্বাভাবিক হবে— তা কেউ জানে না।
এই বিপর্যয়ের আশু কারণ কয়েকঘণ্টার প্রবল বৃষ্টি ও ধস হলেও বিশেষজ্ঞ থেকে স্থানীয় মানুষ একে প্রকৃতির প্রতিশোধ হিসেবেই দেখছেন। উন্নয়ন ও নগরায়ণের নামে যেভাবে পাহাড় ও জঙ্গল কেটে নির্বিচার ধ্বংসলীলা চালানো হচ্ছে— এই বিপর্যয় তারই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি সন্দেহ নেই। একদিকে পরিবেশ দূষণ, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহ ও তুষার শৃঙ্গগুলির অস্বাভাবিক গলন হচ্ছে, অন্যদিকে চলছে প্রকৃতি-ধ্বংসযজ্ঞ। অরণ্য ধ্বংস করে, পাহাড় কেটে বা ফাটিয়ে রাস্তা নির্মাণ ও তা চওড়া করা, টানেল নির্মাণ, এনজেপি-রংপো রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। তিস্তাসহ পাহাড়ি নদীগুলিকে বাঁধ দিয়ে জলাধার, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও পর্যটক টানতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বেআইনি নির্মাণ, বহুতল, নদীর চর দখল—সবই হচ্ছে দিনের আলোয়। এমনকী ধসপ্রবণ এলাকাগুলিও ছাড় পাচ্ছে না। আবার চীন-ভারত দুই দেশ সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকাগুলিতে নির্বিচার নির্মাণ চালাচ্ছে। সীমান্তে চীনের দিকে সিকিমের একাংশে পাহাড় কেটে সড়ক, রেল, সামরিক ঘাঁটি, বিমান ঘাঁটি, আধুনিক জায়গা তৈরির যে নির্মাণ কাজ চলছে, তার প্রভাব পড়ছে আশপাশে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনিতেই হিমালয় ভূমিকম্প ও ধসপ্রবণ এলাকা। তার পুবদিকের এই কর্মকাণ্ড সিকিম, দার্জিলিং সহ গোটা উত্তরবঙ্গকেই এক গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে। একই সংকটে বিপন্ন উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ। দেশের শাসক ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা এসব জানেন না, বোঝেন না— তা নয়। তবু এই বিপর্যয় ও ধ্বংসলীলা বন্ধ করতে তাঁদের তেমন কোনও আগ্রহ দেখা যায় না। এটাই যেন ভবিতব্য! অস্বীকার করার উপায় নেই প্রকৃতির এই রোষের জন্য মানুষ কম দায়ী নয়।
উত্তরবঙ্গের বিপর্যয়ের খবর পেয়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রবিবার সারাদিন কলকাতা থেকে সব কিছু ‘মনিটর’ করার পর সোমবার উত্তরবঙ্গ চলে গিয়েছেন। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধার কাজ শেষ করে দ্রুত স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন পথে নেমেছে। আটক পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা হচ্ছে। আশা করা যায়, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় কেন্দ্র-রাজ্য দুই সরকারই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এর আর্থিক দায়ভার নিতে হবে কেন্দ্রকে। এই বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে, যা এই মুহূর্তে আদৌ বাঞ্ছনীয় নয়। কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে চলছে পারস্পরিক দোষারোপের পালা, যা কাম্য নয়। কিন্তু এই ময়দানি রাজনৈতিক রাজনীতির লড়াইকে আপাতত দূরে সরিয়ে রেখে উত্তরবঙ্গের মানুষের পাশে দাঁড়ানোই রাজনৈতিক দলগুলির এখন মুখ্য কাজ হওয়া উচিত। বিশেষত বিরোধী দলগুলির কর্তব্য হল, এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুর্গতদের সেবার কাজে হাত লাগানো। কিন্তু যেটা না বললেই নয়, তা হল প্রশাসনের উদ্যোগে, সকলের সহযোগিতায় আজ না হয় কাল উত্তরবঙ্গ নিশ্চয়ই স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে। কিন্তু পাহাড়ঘেরা উত্তরবঙ্গকে বাঁচাতে হলে শুধু উদ্বেগ না দেখিয়ে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার খেলা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আর এই দুর্যোগের সুযোগকে যাতে কোনও অসাধু চক্র কাজে লাগাতে না পারে তা প্রশাসনকেই কড়া হাতে মোকাবিলা করতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করার বিষয়টি বন্ধ না হলে আরও বড় বিপর্যয় হয়তো-বা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা হবে।