Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মোদের গরব মোদের আশা

অতঃপর অমিত শাহের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন দিল্লি পুলিসের বদান্যতায় জানা গেল, ‘বাংলাদেশি ল্যাঙ্গুয়েজ’ বলে একটি ‘ভাষা’ আছে, যেটি বাংলা! নতুন আবিষ্কৃত এই ভাষা ইংরেজি বা হিন্দিতে অনুবাদ করিয়ে দেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে একটি চিঠিও পাঠিয়েছে দিল্লি পুলিস।

মোদের গরব মোদের আশা
  • ৫ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অতঃপর অমিত শাহের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন দিল্লি পুলিসের বদান্যতায় জানা গেল, ‘বাংলাদেশি ল্যাঙ্গুয়েজ’ বলে একটি ‘ভাষা’ আছে, যেটি বাংলা! নতুন আবিষ্কৃত এই ভাষা ইংরেজি বা হিন্দিতে অনুবাদ করিয়ে দেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে একটি চিঠিও পাঠিয়েছে দিল্লি পুলিস। এটা নিতান্তই দিল্লি পুলিসের কোনও ব্যক্তির অজ্ঞতা, নাকি এর পিছনেও কোনও অঙ্ক আছে—তা অবশ্যই ভেবে দেখা দরকার। কারণ, কিছুকাল যাবৎ দিল্লি সহ মূলত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে প্রামাণ্য নথি থাকা সত্ত্বেও বাংলাভাষী ভারতীয় (মূলত পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা)-দের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে যে আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরি করা হচ্ছে, বাংলাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’র আখ্যা সেই পথে নবতম সংযোজন। প্রত্যাশিতভাবেই এই চিঠিকে কেন্দ্র করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। তৃণমূল, সিপিএম সহ কেন্দ্র বিরোধী রাজনৈতিক দল তো বটেই, এ রাজ্যের বিদ্বজ্জনেরাও এই কুৎসিত অপচেষ্টার নিন্দায় মুখর হয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি বাঙালির মতো এই ‘বাংলা’কেও কৌশলে মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে? এই উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। রাজ্য সরকারকে চিঠিটা পাঠিয়েছেন দিল্লি পুলিসের অধীন একটি থানার একজন ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার অফিসার। থানা পর্যায়ের একজন অফিসার তাঁর একক সিদ্ধান্তে, নিজে ভাষ্য তৈরি করে একটি রাজ্য সরকারকে এমন চিঠি দিচ্ছেন— তা হতে পারে না। পুলিসের উচ্চপদস্থ কোনও কর্তা বা কর্তাদের নির্দেশ ছাড়া তিনি এই কাজ করবেন না, এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে চিহ্নিত করার পিছনে আসল অভিসন্ধি কী, এর পিছনে কে বা কারা আছে— তা খুঁজে বের করা দরকার। আর যদি অজ্ঞতাবশত এমনটা হয়েও থাকে এবং এজন্য দুঃখও প্রকাশ করা হয় তাহলেও অন্যায়টা লঘু হয়ে যায় না। কারণ একটি ধ্রুপদী ভাষাকে করা হল অপমান। 

Advertisement

বাংলা ভাষা। বিশ্বের কমবেশি ২৫ কোটি মানুষ এই ভাষাতে কথা বলেন। একটা আস্ত দেশ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা। এপারে পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, পড়শি রাজ্য ত্রিপুরা এবং অসমের বরাক উপত্যকার মানুষের যাপনের ভাষাও বাংলা। কিন্তু সব জায়গায় মুখে বলা বাংলা একরকম হয় না। কথ্য ভাষা একেক এলাকায় একেক রকম। কিন্তু ভাষাটা বাংলাই থাকে। ঠিক যেমন, ভাষাটা হিন্দি হলেও উত্তরপ্রদেশ, বিহার বা রাজস্থানের কথ্য হিন্দির রকমফের আছে। এ রাজ্যের বাংলা ভাষা শুধু সংবিধান স্বীকৃতই নয়, গত বছরের ৩ অক্টোবর মোদি সরকারের মন্ত্রিসভা বাংলাকে ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতি দিয়েছে। দাবিটা প্রথম উঠেছিল ২০০৪ সালে, বাজপেয়ি সরকারের আমলে। শেষপর্যন্ত চার খণ্ডে ২২০০ পৃষ্ঠার দাবিপত্রে স্বীকৃতির সিলমোহর দিতে বাধ্য হয়েছে মোদি সরকার। ধ্রুপদী ভাষার মাপকাঠি হিসেবে কোনও ভাষার দেড় থেকে দু’ হাজার বছরের পুরনো প্রত্নপুরাণকে ধরা হয়। বাংলার ক্ষেত্রে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে এই প্রাচীন ভাষার শিলালিপি মিলেছে গবেষণায়। এই যার ঐতিহ্য, সেই বাংলা কি না ‘বাংলাদেশি ভাষা’ হয়ে গিয়েছে শাহের পুলিসের কলমের খোঁচায়! সঙ্গতকারণেই মাতৃভাষার এমন অসম্মানে প্রতিবাদে গর্জে উঠে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, বিষয়টি অসাংবিধানিক ও দেশবিরোধী। বাংলা বিরোধী তো বটেই। 
বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে সম্প্রতি যে আটজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে দিল্লি পুলিস, তাদের কাছে পাওয়া সরকারি নথিপত্র নাকি লেখা বাংলায়। তদন্তকারী অবাঙালি অফিসার তারই ইংরেজি বা হিন্দি তর্জমা করার আবেদন জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে চিঠি পাঠিয়েছেন। সেই চিঠিতেই তিনি বাংলাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’(যেন বিদেশি ভাষা) হিসেবে উল্লেখ করেন। এটা নিছক ভুল হলে দিল্লি পুলিসের তৎক্ষণাৎ ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল। ভবিষ্যতে এমন ভুল হবে না বলে শাহের মন্ত্রকের মুচলেকা দেওয়া উচিত বলে দাবি উঠেছে। কিন্তু সেটা যে সহজে হওয়ার নয়, ঘটনার পর বিজেপি নেতাদের অন্যায় আস্ফালনেই তা স্পষ্ট। যে ভাষায় রবীন্দ্রনাথ জাতীয় সঙ্গীত রচনা করেছেন, বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন জাতীয় স্তোত্র, তার এমন অবমাননা, অসম্মান দেখেও কিছু বিজেপি নেতা ‘বেশ করেছে’ এমন আচরণ প্রকাশ করেছেন। তাতেই বোঝা যায়, এরা আসলে বাংলা ও বাঙালি বিরোধী। মুখেই শুধু ভোটের স্বার্থে বাঙালি অস্মিতার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি! আসলে ক্ষমতা দখলের মোহ তাঁদের অন্ধ করে রেখেছে। তাই বাংলা ভাষার এমন অসম্মানে চুপ করে থাকলে আরও হয়তো অনেক মূল্য দিতে হবে বাঙালিকে। রুটি-রুজির লড়াই যদি বাঁচার জন্য হয়, এ লড়াই তাহলে ঐতিহ্য ও আত্মসম্মান রক্ষার। এই বাংলার তাই সমস্বরে গর্জে ওঠার দিন দরজায় কড়া নাড়ছে। কারণ মাতৃভাষার এমন অসম্মান কোনওমতেই মেনে নিতে পারে না বাঙালি। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ