হারাধন চৌধুরী: কংগ্রেস যেদিন কোয়ালিশন সিস্টেম মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে সেদিনই পূর্ণ যবনিকা পড়েছে দেশে একদলের সরকার তৈরির রাজনীতির উপর। একটা মিথ ছিল যে, আঞ্চলিক দলগুলির উত্থান যত হবে তত কমবে জাতীয় দলগুলির অন্যায় দাপট। কিন্তু আঞ্চলিক দলগুলি রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বিরাট ‘ক্ষমতার কেন্দ্র’ হয়ে উঠার পরেও জাতীয় দলগুলির দোর্দণ্ডপ্রতাপ নিশ্চিহ্ন হয়নি। দাপটের ‘কূল’ বদল হয়েছে মাত্র। অতীতে কংগ্রেস যে রোল প্লে করত সেই জায়গাটা আজ বিজেপির দখলে। আরও লক্ষণীয় যে, বহু ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলি কোনও না কোনও জাতীয় দলের হাতের পুতুলেই পরিণত হয়েছে। বড় দলের ইচ্ছাপূরণের সাথী হয়েছে তারা এবং মাৎস্যন্যায় নীতিতে বড় দলগুলি ছোট দলগুলিকে গিলে খেয়ে ফেলার প্রক্রিয়া সমানে জারি রেখেছে। কিছু ছোট দল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়েছে। উদাহরণ—অতীতের জনতা দল এবং সাম্প্রতিক অতীতের শিবসেনা ও এনসিপি। সব মিলিয়ে বেশিরভাগ আঞ্চলিক দল মেরুকরণের স্রোতে বাইপোলার পলিটিক্সের অংশমাত্র।
ঐতিহাসিকভাবেই ভারতবর্ষ বহুত্বের সাধনায় মগ্ন। তার ফলে ভাষাগত, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং নানাবিধ আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য বহন করে। তার থেকে অনেক সমস্যা এবং চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে সমাজজীবনে। এত এত সমস্যার নিরসন এবং চাহিদাপূরণ জাতীয় দলগুলির পক্ষে সম্ভব হয়নি। বিবিধ স্বার্থের সংঘাত তাদের বিরত রেখেছে। সেই চাপা পড়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরগুলি আইনসভায় পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকেই দেশের নানা প্রান্তে অসংখ্য ছোট বড় দল তৈরির ধারণা স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বাধীনতার আগে থেকে আজ পর্যন্ত কত সংখ্যক রাজনৈতিক দল এবং মঞ্চ গঠিত হয়েছে তার নিখুঁত খতিয়ান পাওয়া মুশকিল। ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়েই পুষ্ট হচ্ছে রাজনীতির এই অত্যাবশ্যক অনুশীলন।
সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য বৃহৎ পুঁজির বিরুদ্ধে লড়াই জরুরি। বড় এবং জাতীয় দলগুলির পক্ষে এই লড়াই চালিয়ে যাওয়া নীতিগতভাবে অসম্ভব। কেননা নির্বাচনসহ নানা প্রয়োজনে বৃহৎ পুঁজিই বড় দলগুলিকে বরাবর ফান্ড জুগিয়ে গিয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই, দেশের বাণিজ্য এবং শিল্পনীতি তাদের স্বার্থ ঘিরেই ওঠাবসা করবে। সেক্ষেত্রে ছোট ছোট পুঁজি বৃহৎ পুঁজির বিরুদ্ধে লড়াইতে মদত জোগাতে পারে। আঞ্চলিক দলগুলি, অন্তত রাজ্যে রাজ্যে সরকার গড়তে পারলে এই লড়াই শেষমেশ হয়ে উঠতে পারে অর্থবহ। সরকারে থেকেও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার চেহারাটা সেখানে পরিষ্কার হয়ে ওঠে অনেকসময়। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এবং তামিলনাড়ুতে এম কে স্ট্যালিনের সরকার এই কনসেপ্টের একটি দারুণ উদাহরণ।
কিন্তু প্রান্তিক অবহেলিত বঞ্চিত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সবসময় যে আঞ্চলিক দলগুলি পূরণ করতে পারেনি এবং পারে না, তার দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন এদেশের সবচেয়ে আলোচিত নির্বাচন কমিশনার টি এন সেশন। দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে সেশন ‘জাল-জুয়াচুরির রাজনীতি’ শীর্ষক একটি অধ্যায় উপহার দিয়েছেন। সেখানে গত শতকের নয়ের দশক প্রসঙ্গে বলেছেন, রাজনীতিকদের মুখের বুলি হল, নতুন যুগের প্রবর্তন। সেই নতুন যুগ যাঁদের আনার কথা তাঁরাই আনছেন অধিকতর হিংসা, উৎপীড়ন। নতুন যুগই বটে! ভ্রষ্টাচার, অসাধুতা, পাশবিকতা, হৃদয়হীনতার নতুন এক জামানা। ... একটি সাড়া জাগানো খবর এইরকম: নাগপুরে দলে দলে আদিবাসী লোক কিছু দাবি নিয়ে নানা দিক থেকে এসে জড়ো হয়েছেন। রাজ্যের আদিবাসী কল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য ধৈর্য ধরে বসে আছেন তাঁরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরয়, কিন্তু মন্ত্রী মহোদয়ের দেখা মেলে না। ক্লান্ত হতাশ দর্শনার্থীরা একসময় ধৈর্য হারাতে থাকেন। শুরু হয় ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি। অমনি পুলিস লাঠিচার্জ করতে নামে। মানুষগুলি প্রাণভয়ে পালাতে গেলে সৃষ্টি হয় চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। পদপিষ্ট হয়ে মারা যান শিশু ও নারীসহ অন্তত ১২৮ জন! এই কাহিনি শোনাবার পর সেশনের প্রশ্ন, এসবের মূলে কী? উত্তরও দিয়েছেন অতঃপর: একজন মন্ত্রীর, তাঁর ভোটারদের কথা শোনার অনিচ্ছা! ওই মন্ত্রীই হয়তো গরিবের ঘর থেকে উঠে এসেছেন। কিন্তু রাজনীতি করে এবং ক্ষমতা ও ভোগ-ঐশ্বর্যের স্বাদ পেয়ে ভুলে গিয়েছেন, ‘এলেম আমি কোথা থেকে।’ শুধুমাত্র নিজ পদে ইস্তফা দিয়েই মন্ত্রী নিস্তার পেয়ে গেলেন। কিন্তু সেইসব গরিব মানুষ, যাঁরা জনগণের দাবিতে সোচ্চার হয়ে গণতন্ত্রকে হাতেকলমে কাজে লাগাতে এসেছিলেন, তাঁদের মূল্য চোকাতে হল নিজ নিজ প্রাণ দিয়ে!
নাগপুরের ঘটনা ভারতের রাজনীতিতে নিশ্চয় ব্যতিক্রম নয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গরিব প্রান্তিক মানুষকে যুগে যুগে চরম মূল্য গুনে যেতে হচ্ছে। মণিপুর-সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের রকমারি সমস্যা এবং অশান্তির ক’টার নিরসন হয়েছে? দূর হয়েছে কি কাশ্মীরবাসীর হতাশা কিংবা মাওবাদী অশান্তি? এই যে এত ব্রিজ, বহুতল বাড়ি ভেঙে পড়ছে, লোপাট হয়ে যাচ্ছে নদীবাঁধ, গঙ্গার ভাঙন বিরামহীন—এর কোন জবাব আদায় করছে ছোট দলগুলির দাপাদাপি? আসলে, রাজনীতি যখন জনসেবার নীতি থেকে সচেতনভাবে সরে গিয়ে শাঁসালো পেশা কিংবা ব্যবসার আকার নেয় তখনই কায়েম হয় এমনসব অনাচার। পাড়ার মোড়ে চপের দোকান খুলে বসার মতো দিকে দিকে রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড শোভা দেয়। বেশিরভাগ ছোট দল জানে, তাদের একার দমে একটি পঞ্চায়েত কিংবা পুরসভার সিটও জেতা অসম্ভব। তবু তারা বিধানসভা, এমনকী লোকসভার ভোটের আসরেও অনুপ্রবেশ করে।
১৯৫১-৫২ সালে প্রথম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৪৮৯টি আসনের জন্য। কংগ্রেস, সোশ্যালিস্ট পার্টি, সিপিআই, শিডিউল্ড কাস্টস ফেডারেশন, ভারতীয় জনসঙ্ঘ-সহ ৫৩টি রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থী দিয়েছিল। এছাড়া নির্দল প্রার্থী ছিলেন ৫৩৩ জন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার প্রার্থী ছিলেন। ওই নির্বাচনের আগে মোদি ৩৮ পার্টির এনডিএ ঘোষণা করেন। শেষমেশ এনডিএ’র ১৫টি দল থেকে এমপিরা নির্বাচিত হন। এই দলগুলির মধ্যে মাত্র একজন করে এমপি সাতটি দলের। সম্মিলিত বিরোধীদের ‘ইন্ডিয়া’ ভোটে লড়েছিল ২১ দলের শক্তি নিয়ে। তাদের মাত্র একজন করে এমপি ছ’টি দলের। এই দুই প্রধান জোটের বাইরে আরও আট দলের এমপিরা চলতি লোকসভায় আছেন। তাঁদের মধ্যে একজন করে এমপি আছেন চার দলের। সব মিলিয়ে মোট ৪৪টি দলের প্রতিনিধিরা বর্তমান নিম্নকক্ষে রয়েছেন।
এর বাইরেও দেশজুড়ে রাজনৈতিক দলের ভিড়ে যা তা অবস্থা! এর অনেকটাই বোধহয় বাঞ্ছিত নয়। স্বীকৃতি না-থাকলেও জাতীয় নির্বাচন কমিশনে নথিভুক্ত দলের সংখ্যা ছিল ২,৮৫৪। তার মধ্যে ৩৩৪টি দলকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। তারপরও আড়াই হাজারের বেশি পার্টি থেকে গিয়েছে। তাদেরও নাকি ছাঁটা হবে। আগামী দিনে নতুন দলের আবেদন গ্রহণের সময় বিশেষ সতর্ক হবে কমিশন। মূল কারণ, এই দলগুলি গত ছ’বছরে কোনও ভোটে অংশ নেয়নি। রহস্যজনক কারণে স্রেফ ‘রেজিস্টার্ড’ দলের তকমা নিয়ে বসে আছে। দলগুলির অফিসের ঠিকানারও হদিশ মেলেনি। আবেদনকারীর অতিরিক্ত কোনও নেতা বা কর্মী পর্যন্ত নেই বহু দলের। প্রাথমিকভাবে ৩৪৫টি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়। তার মধ্যে ৩৩৪টি দলকে ছাঁটা হল। গণতন্ত্রের কোয়ালিটি রক্ষার স্বার্থে কমিশনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাতেই হয়।
ভোট ভাগাভাগির খেলায় অংশগ্রহণই কিছু দলের একমাত্র ‘অবদান’। যোগসাজশ মতো কোনও বড় দলকে জিততে সাহায্য করে কেউ কেউ। বিনিময়ে তারা আর্থিক ফায়দা তোলে বলেও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যায়। ‘অধিকন্তু ন দোষায়’—কথাটি এখানে খাটে না। ভোটাররা বহুলাংশে বিভ্রান্ত হন। পরিষ্কার জনমত মেলে না। কোয়ালিশন কোনও ভুল বা অন্যায় নয়। তবে এমন সরকারের ভবিষ্যৎ বহুক্ষেত্রেই ভাগ্যের সুতোয় ঝোলে, মদত পায় ব্ল্যাক মেইলের রাজনীতি। মোরারজি থেকে বাজপেয়ি সকলেই টের পেয়েছিলেন তা হাড়ে হাড়ে। চাণক্যগিরি চালাতে হয়েছিল সংখ্যালঘু সরকারের নেতা রাওকে। মনমোহনেরও নাকানিচোবানি হয়েছিল বিস্তর। মোদিও টের পান প্রায়ই। অনাবশ্যক বড় মন্ত্রিসভার দায় বইয়ে হয় নানাভাবে—অঞ্চল বা রাজ্যের কোটার পাশে শরিকি কোটার বোঝাও চাপে।
ভারতের বহুত্ববাদী গণতন্ত্র একদলের শাসন বা একনায়কতন্ত্র নিশ্চয় চায় না। বহুদলীয় রাজনীতির অনুশীলন অবশ্যই দরকার কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট না-হয়ে যায়, তা খেয়াল রাখতে হবে। নয় তো বৃহত্তম গণতন্ত্র শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে আরও দুর্বল হবে নিশ্চিতভাবেই। মনে রাখতে হবে, প্রকৃত গণতান্ত্রিক দুনিয়া, ভারতকে এখনও ‘ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি’র ঊর্ধ্বে মর্যাদা দিতে নারাজ। গণতন্ত্রের অনুশীলনের নামে অযৌক্তিক ‘বিচ্ছিন্নতার চর্চা’ আমাদের আরও নীচে নামিয়ে দিতে পারে। এর নীচের ধাপেই ‘ইলেক্টোরাল’ বিশেষণ-বিযুক্ত ‘কমপ্লিট অটোক্রেসি’র নিবাস! তাই অসংখ্য ছোট দলকে নিয়ে নির্বাচন কমিশনের এই ঝাড়াই বাছাই প্রক্রিয়াটিকে স্বাগত জানাতেই হচ্ছে।
ভারতের সমস্ত সমস্যার মূলে বৈষম্য। এই বৈষম্য ভাঙার প্রক্রিয়ায় জোর দিতে হলে নির্বাচনে লিঙ্গবৈষম্য দ্রুত দূর করা দরকার। এখন ভোটার তালিকায় নারী-পুরুষের সংখ্যার তফাত অনেক কমে এসেছে। ভোটের লাইনেও মহিলাদের উপস্থিতি এখন অনেক বেশি এবং তাঁরা সোৎসাহেই ভোট দিচ্ছেন। একাধিক রাজ্যে মহিলাদের ভোটদানের হার পুরুষের তুলনায় বেশি। কিন্তু প্রার্থী নির্বাচনের বেলা তাঁরা রীতিমতো বৈষম্যের শিকার। এই ব্যাপারে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট, অতিবাম কিংবা উগ্র দক্ষিণপন্থী দলে কোনও ভেদ নেই। আঞ্চলিক দলীয় রাজনীতির বৃত্তও অবিকল। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভোটে প্রার্থীদের গুণগত মান বৃদ্ধিও জরুরি। তাঁদের কাজ এবং চিন্তা চেতনার একটা বয়স বিবেচনায় রাখা দরকার। একজন সুইপার থেকে আইএএস পর্যন্ত সকলেরই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সর্বোচ্চ বয়সসীমা আছে। রাজনীতিকে এই নিয়মের বাইরে রাখার অর্থ, সরকার এবং প্রশাসনের গুণগত মানের সঙ্গে সচেতনভাবেই আপস করা।