মৃণালকান্তি দাস: তেহরানের দক্ষিণে পাঁচ হাজার বছরেরও পুরনো শহর শাহর-ই-রে। পাহলভি রাজবংশের রেজা শাহকে এখানেই সমাধিস্থ করা হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর, রেজা শাহের সেই সমাধিস্থল কুখ্যাত ধর্মগুরু সাদেঘ খালখালির নির্দেশে ধ্বংস হয়ে যায়। এমনই বহু ইতিহাস বুক আগলে রেখেছে শাহর-ই-রে শিল্পাঞ্চল। দীর্ঘদিন আত্মগোপনের জন্য এমন শহরই বেছে নিয়েছিল ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা। আর ইরানের চোখে ধুলো দিয়ে দু’দশক ধরে মজবুত নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলেছিল মোসাদ। যারা বছরের পর বছর টার্গেট কিলিং চালিয়ে ইরানকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে।
মোসাদের সেই এজেন্টদের কাঁধেই ছিল তেহরানের ‘আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ ধ্বংসের গুরুদায়িত্ব। যুদ্ধ শুরুর দিনেই এয়ার ডিফেন্স ধ্বংস করায় ইরানি আকাশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছিল ইজরায়েলি বিমানবাহিনীর হাতে। ফলে ১২ দিনের সংঘর্ষে ইরানের আকাশে দাপিয়ে বেড়িয়েছে ইহুদি যুদ্ধবিমান। আঘাত হানা হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলিতে। বেছে বেছে ইরানের শীর্ষ কমান্ডার এবং পরমাণু বিজ্ঞানীদের নিকেশ করেছে। মোসাদের প্রাক্তন গবেষণা পরিচালক এবং বর্তমানে ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের বিশ্লেষক সিমা শাইন সংবাদসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-কে বলেছেন, এই হামলা বছরের পর বছর ধরে মোসাদের অপারেশনের চূড়ান্ত পরিণতি। টার্গেট একটাই— ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। হামলার কৌশলটি ইউক্রেনীয় অভিযানের মতো। গোপন ওই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মাকড়সার জাল’। ১১৭টি ড্রোন ব্যবহার করে ওলেনিয়া, বেলায়া এবং মস্কোর পূর্বে অবস্থিত ইভানোভো ও দিয়াগিলেভো বিমানঘাঁটির ক্ষেপণাস্ত্রবাহী বিমানগুলিতে আঘাত হেনেছিল ইউক্রেন। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ৪০টিরও বেশি রুশ সামরিক বিমান।
তবুও সতর্ক হয়নি ইরান। তেহরান ভেবেছিল, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা চলাকালীন ইজরায়েল কোনও আক্রমণ চালাবে না। কিন্তু ওমানে ষষ্ঠ দফা আলোচনার দু’দিন আগেই ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ সক্রিয় করেন। নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক মোসাদ গোয়েন্দা এপি-র তেল আভিভের সাংবাদিক স্যাম মেডনিককে জানান, মোসাদ এবং ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী কমপক্ষে তিন বছর একসঙ্গে কাজ করে অপারেশনাল ভিত্তি তৈরি করে। তেহরানের ‘আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ উড়িয়ে দেওয়ার নীলনকশা বাস্তবায়নে ঢুকে পড়ে স্থানীয় ইরানিদের মধ্যে। আমেরিকার তৈরি এআই-ভিত্তিক বেশ কিছু প্রযুক্তি এই যুদ্ধে ব্যবহার করে ‘ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্স’ বা আইডিএফ। ইরানের উপর গুপ্তচরবৃত্তি এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে এগুলি দারুণ সাহায্য করে তাঁদের। পাশাপাশি, কৃত্রিম উপগ্রহের পাঠানো ছবি বিশ্লেষণ করে তেহরানের ‘আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’র হদিস খুঁজে নেয় ‘মোসাদ’। সেই অনুযায়ী হামলার পরিকল্পনা ছকে ফেলে তারা।
কিন্তু কীভাবে সেই আত্মঘাতী ড্রোনগুলি শত্রুদেশের ভিতরে নিয়ে গেলেন ইহুদি গুপ্তচরেরা? এপি-র দাবি, রাজধানী তেহরানের ভিতরে শাহর-ই-রে এলাকায় একটি ড্রোন ঘাঁটি তৈরি করতে সক্ষম হন মোসাদের এজেন্টরা। তিনতলা একটি বাড়ি থেকেই অপারেট করা হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এমনই এক চিত্র প্রকাশ করে। সেখানে ছ’জন ইরানি ‘মোসাদ সদস্য’ কোয়াডকপ্টার তৈরি করছিল। এসব কোয়াডকপ্টারের নীচে ছোট ছোট বোমা লাগানো ছিল। তথ্যের ভাণ্ডার দ্রুত খুঁজে বের করতে এআই ব্যবহার করা হয়েছিল। শত্রুদের গতিবিধি জানতে এর আগে গাজা এবং লেবাননেও ব্যবহার করা হয়েছিল এই মার্কিন এআই মডেল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, এই অভিযানে ‘কোয়াডকপ্টার’ নামে একটি বিশেষ ধরনের ড্রোন ব্যবহার করে মোসাদ। স্যুটকেস, ট্রাক এবং মালবাহী জাহাজের কন্টেনারে করে সেগুলির টুকরো টুকরো অংশ তেহরানের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডারদের একটি তালিকা তৈরি করে তাঁদের উপর নজরদারি শুরু হয়েছিল এই এআই দিয়েই। একইসঙ্গে তেহরানের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল মোসাদের অ্যাসেটরা।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজা আত্তার লুক্সেমবার্গ থেকে আল–জাজিরাকে জানান, সম্ভবত ইরানের ভিতর ইজরায়েলের ৩০ থেকে ৪০টি গুপ্তচর সেল সক্রিয়। অনেক ইরানি মোসাদের দোসর হিসেবে দেশের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছেন। তেহরান বুঝতেই পারেনি, ইদ্রিস আলি, আজাদ শোজাই ও রসুল আহমদের মতো ইরানিদের কেউ কেউ ইজরায়েল থেকে অস্ত্র পাচারের দায়িত্বে, কেউ হামলার কাজে নিয়োজিত এবং অন্যরা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে যুক্ত। তুরস্কের সীমান্তের কাছে উরমিয়া কিংবা খুজেস্তান প্রদেশ— সর্বত্র মোসাদের পায়ের ছাপ স্পষ্ট! আত্তার বলেন, ‘গুপ্তচরবৃত্তির প্রচার মানসিক যুদ্ধও। আমি যদি বারবার বলি, আপনার ঘরে ঢুকে পড়েছি, আর আপনি সেটা অস্বীকার করতে থাকেন, তার পরিণতি মারাত্মক। এরপর একদিন যখন প্রমাণ হবে, আমি সত্যিই আপনার ঘরে ঢুকেছিলাম— তখন আপনাকে দুর্বল দেখাবে।’ ব্রিটেনের ‘দ্য অবজারভার’ পত্রিকাকে ইজরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ মিরি আইসিন দম্ভভরে বলেছেন, ‘মোসাদের কোনও টার্গেটের গতিবিধি শনাক্ত হওয়া এড়াতে অবশ্যই সব ইলেকট্রনিক যন্ত্র ও ইন্টারনেট সংযোগ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে। নয়তো তার অবস্থান ইজরায়েলি গোয়েন্দাদের কাছে ধরা পড়বেই। অধিকাংশ মানুষই গ্রিডের (ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা) বাইরে নিজেদের রাখতে পারেন না। ফলে মোসাদ যে কারও কাছে পৌঁছে যেতে পারে।’ হয়েছেও তাই!
ইরান আক্রমণের জন্য নেতানিয়াহুর নাটকীয় সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিলেন দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ইজরায়েলি গোয়েন্দাবাহিনী মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া এবং বিমানবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল তোমার বার। মোসাদের স্থলভাগের অপারেশন এবং বিমানবাহিনীর আকাশপথে হামলার নিখুঁত সমন্বয়ে এক মিলিমিটারও এদিক-সেদিক হয়নি। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বার্নিয়া ও তাঁর সহকর্মীরা গুপ্তচর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিজেদের পরিকল্পনা সাজান। অসাধারণ অপারেটর বার্নিয়া মোসাদকে আমূল বদলে দিয়েছেন। মোসাদের কাজের ধারা পাল্টে দিয়েছেন এবং স্মার্ট নজরদারি ক্যামেরা ও চেহারা শনাক্তকরণের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। তা টের পাওয়া গিয়েছে ১৩ জুন।
ইজরায়েলের যুদ্ধবিমানগুলি যখন ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক ঘাঁটির দিকে উড়ে যাচ্ছিল, তখন ইরানের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা মোসাদের সশস্ত্র গোয়েন্দা দল, একঝাঁক সশস্ত্র ড্রোন এবং সাধারণ যানবাহনের মধ্যে লুকিয়ে রাখা বিস্ফোরক খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে। এসব অস্ত্র কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ইরানের ঘাঁটিগুলির দিকে অগ্রসর হতে থাকে। অনেকেই তখনও নিজের বিছানায় ঘুমিয়ে কিংবা নিজের বাড়িতে ছিলেন। ভোর হওয়ার আগেই তাঁদের ঠিকানায় আছড়ে পড়ে ঘাতক ড্রোনগুলি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনেইর ঘনিষ্ঠ বলয়ের বিভিন্ন সদস্য এবং পারমাণবিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নিহত হন। এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল ইজরায়েলি হামলার প্রথম ধাপ। এই অভিযানের আরও একটি লক্ষ্য ছিল ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহনকারী ট্রাক। প্রতিটি ট্রাক ধ্বংস করা মানে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র নির্মূল করে দেওয়া। এরপরই শুরু হয় আকাশপথে সামরিক অভিযান।
ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরু করার পাশাপাশি আরও একটি হামলা চালিয়েছিল ইজরায়েল। মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুরুর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ইজরায়েলি গোয়েন্দারা ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্তাদের কাছে অন্তত ২০টি ফোন করেছিলেন। ইজরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি ছিল ভয়াবহ। তাঁরা শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্তাদের ফোন করে বলেছিলেন, ১২ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে গিয়ে তাঁদের ইজরায়েলের কাছে আত্মসমর্পণ করার ভিডিও বার্তা রেকর্ড করে সেগুলি পাঠাতে হবে, না হলে তাঁদের পরিবারকে ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হবে।
ফাঁস হওয়া অডিওতে শোনা যায়, এক ইজরায়েলি গোয়েন্দা ইরান রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) এক জেনারেলকে ফোন করে বলছেন, ‘আমরা আপনাকে হত্যা করব, আপনার পরিবার, আপনার সন্তানদের— সবাইকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলব। এই মুহূর্তে আমরা আপনার গলার শিরার চেয়েও কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছি।’ এভাবেই ভয় দেখিয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে জিততে চেয়েছিল ইজরায়েল। তাদের লক্ষ্য ছিল ইরান সরকারকে বিভক্ত করে ফেলা, যেন তারা দুর্বলতার মুহূর্তগুলিকে কাজে লাগাতে পারে। কিন্তু ইরানের একজন জেনারেলও আতঙ্কের কাছে মাথা নত করেননি। কেউ পালাননি, কেউ দেশদ্রোহিতা করেননি। ইরানি কর্তাদের কেউ দরজার নিচ দিয়ে চিঠি পেয়েছেন, আবার কেউ ফোন পেয়েছেন কিংবা কারও স্ত্রীকে ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এসব বার্তার লক্ষ্য ছিল পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেওয়া— মোসাদ জানে, ওই কর্তারা কে কোথায় আছেন এবং তাঁরা মোসাদের নাগালেই আছেন। একই সময়ে ইজরায়েলপন্থী হ্যাকিং গ্রুপগুলি ইরানে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালায়। এতে ইরানের সবচেয়ে বড় দু’টি ব্যাঙ্ক ও ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে। ফলে শুরুতে ‘নীরব দর্শক’ হওয়া ছাড়া তেহরানের আর কোনও পথ ছিল না।
পশ্চিম এশিয়ায় আপাতত যুদ্ধের কালো মেঘ সরলেও ক্ষত-বিক্ষত শিয়া মুলুকের ঘুম নেই। তেহরান জানে, মোসাদকে চিরতরে উৎখাত না করতে পারলে ফের আছড়ে পড়বে ইহুদিদের বিষাক্ত ছোবল। তবে ইজরায়েলের জন্য অস্বস্তির খবর একটাই, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শিয়া মুলুকটিতে যে হিজাব-বিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল, যুদ্ধ আবহে তা বিলীন হয়ে গিয়েছে। ইজরায়েল যখন আমেরিকাকে দোসর করে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ হেনেছে, তখন দেশের মাটি বুকে আগলে রাখারই বার্তা দিয়েছেন ইরানের বিশ্ববন্দিত চলচ্চিত্র পরিচালক জাফর পানাহির মতো ‘সরকার বিরোধী’ ব্যক্তিত্বরা। পানাহি সিডনি থেকে লিখেছেন: প্রতিদিন চেষ্টা করছি দেশে ফেরার। আমার পরিবার, বিশেষ করে আমার মায়ের কাছে যাওয়ার পথ খুঁজছি। কিন্তু সব পথ যেন বন্ধ। যখন নিজের মানুষগুলি প্রতিদিন যুদ্ধের শিকার হচ্ছে, তখন নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগে...
আসলে নেতানিয়াহু ১০দিনের যুদ্ধে ইরানকে ঐক্যবদ্ধ করে ফেলেছেন!