সমৃদ্ধ দত্ত: একজন জনপ্রিয়তম অভিনেতা সাধারণত চেষ্টা করেন ঠিক যে অস্ত্রগুলি ব্যবহার করে তিনি সুপারস্টার হয়েছেন, সেই ফর্মুলাই বারংবার ব্যবহার করে যেতে। কারণ, তাঁর ভক্তকুল তাঁকে ওইসব ভূমিকায় বারংবার দেখতে পছন্দ করে। তিনি পর্দায় হাজির হলে ‘গুরু’ ‘গুরু’ জয়ধ্বনি দেওয়া হয়েছে বহু বছর ধরে। এই সুপারস্টারদের কারও পরিচয় ছিল ট্র্যাজেডি কিং, কেউ বা রোমান্টিক হিরো, কেউ অ্যাংগ্রি ইয়ং ম্যান। কেউ চিরকালীন রাহুল অথবা আদরের ভাইজান। কিন্তু শুধুই যে দেহপট সনে নট সকলি হারায়, তাই নয়। সময়, কাল, যুগ এবং প্রজন্মের রুচি বদলে যায় এবং এই সুপারস্টারদের জনপ্রিয়তায় একসময় ভাটা পড়ে, তাঁরা পুরনো হয়ে যান। তাঁদের সেই চেনা ও সাফল্যের মোক্ষম ফর্মুলাগুলি ক্রমেই যেন ক্লিশে হয়ে যায়। নতুন যুগ চায় নতুন কিছু। অন্য কিছু। বিনোদন, রাজনীতি, সাহিত্য, গান, সিনেমা সবক্ষেত্রেই এই রীতি প্রযোজ্য। অর্থাৎ নতুন কিছু উপহার দিতে না পারলে শুধুই পুরনো মডেল আঁকড়ে পড়ে থাকলে ক্রমেই জনপ্রিয়তার মাটি আলগা হয়ে যায়। শেষ বিকেলে এই সুপারস্টারদের বহুবার দেখা গিয়েছে প্রাণপণ নিজের হারানো মাটি ফিরে পাওয়ার জন্য আকুল চেষ্টা করছেন। কিন্তু সময়, বয়স এবং আগ্রহ বড় নিষ্ঠুর। তাই আজ যে রাজা, কাল সে ফকির। সুপারস্টারদের অনেকেই বুদ্ধিমান, সংযত, মাত্রাজ্ঞানসম্পন্ন। তাঁরা সময় থাকতেই আর্কলাইটের আলো থেকে সরে যান। কেউ কেউ পারেন না। তাঁরা মনে করেন আমি তারকা ছিলাম, আছি এবং থাকব। আমার যে চরিত্রায়ন ১০ বছর আগেও সুপারহিট সিনেমা উপহার দিয়েছে, আগামী ১০ বছরও সেভাবেই চলবে। কিন্তু সেটা অলীক আশা। এরপর পড়ে থাকে নিছক হতাশা, নিরাশা এবং পরাজিত সম্রাটের ছদ্মভূমিকা!
নরেন্দ্র মোদি সুপারস্টার ছিলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেই প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি আর রাজনৈতিক ইভেন্ট সুপারহিট করতে পারছেন না। নরেন্দ্র মোদি রামমন্দির প্রতিষ্ঠার বছরে চরম ধাক্কা খেয়েছেন। একা আর সরকার গঠন করতে পারলেন না। আর এবার অপারেশন সিন্দুরকে প্রচার করা হলেও একটিও উপনির্বাচনে দাগই কাটতে পারল না মোদির সাফল্য। অর্থাৎ ওই সাফল্য সেনাবাহিনীর। মোদির নয়। এই ম্যাচিওরিটি দেখাল এই চার রাজ্যের ভোটার।
দক্ষিণে কেরল, উত্তরে পাঞ্জাব, পশ্চিমে গুজরাত এবং পূর্বে বাংলা। ভারতের চার প্রান্তের মানুষ চাররকম। তাঁদের সংস্কৃতি পৃথক। খাদ্যাভ্যাস ভিন্ন। ভাষার অমিল। ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি, আচার বিচারও সম্পূর্ণ ভিনধর্মী প্রকৃতির। অথচ এই চার রাজ্যের সম্পূর্ণ আলাদা ভাবনার ভোটাররা কয়েকটি ক্ষুদ্র উপনির্বাচনে একই প্যাটার্নে নিজেদের রাজনৈতিক অভিমত ও অবস্থান জানিয়ে দিল। যা সমমনস্ক। এই চার রাজ্যই ভারতীয় জনতা পার্টিকে প্রত্যাখ্যান করল বিধানসভার উপনির্বাচনে। সামান্য বিধানসভার উপনির্বাচনে হারজিত সেরকম রাজনৈতিকভাবে মোটেই তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু পাঞ্জাব থেকে কেরল। গুজরাত থেকে পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে একটি প্যাটার্ন। হিন্দুত্ব ইস্যু আর বিজেপিকে জয়ী করতে পারছে না। যে কোনও ইস্যুতে যদি খামতি থাকে, তাহলে সেই অপূর্ণতা মেটাতে আরও একটি অস্ত্র সদাপ্রস্তুত এবং নিশ্চিত কার্যকর ছিল। সেটি হল মোদিত্ব। অর্থাৎ হয় হিন্দুত্ব প্লাস মোদিত্ব। অথবা যে কোনও একটি হাতিয়ারে অন্তত বিজেপি সর্বত্রই জয়ী হয়ে এসেছে। এবার এই চার রাজ্যে দেখা গেল কোথাও কোনও ফর্মুলাই কাজ করল না।
এই ফলাফল বিজেপির জন্য একটি মহাসঙ্কটের বার্তা দিচ্ছে। কারণ প্রমাণিত হচ্ছে যে, আজ-কাল আর মোদির নামে বিজেপি ভোট পাচ্ছে না রাজ্যে রাজ্যে। আবার হিন্দুত্বের নামে ধর্মীয় বিভাজনকেও মানুষ সেরকম গুরুত্ব দিচ্ছে না।
কেন সঙ্কট? কারণ এই প্রতিটি ভোটে দেখা গেল বিজেপির ভোট কমে যাচ্ছে। বিজেপিকে সবথেকে বেশি ভোট কারা দেয়? অবশ্যই হিন্দুরা। তার অর্থ হল, বিজেপির থেকে হিন্দুরাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে? এর থেকে বড় সঙ্কট কী হতে পারে? গুজরাতে বিজেপি সরকার চালাচ্ছে তিন দশক ধরে। সেখানে আম আদমি পার্টির মতো একটি অল্পবয়সি দল বিজেপিকে গুজরাতের উপনির্বাচনে হারিয়ে দিল? পাঞ্জাবে বিজেপি ১০ বছর আগেও চার নম্বরে ছিল। এখনও তাই! কেরলে আজও এলডিএফ বনাম ইউডিএফ। বিজেপি আগেও ছিল না। এখনও লড়াইতে নেই! সর্বত্র বিজেপির ভোট কমে
গিয়েছে কেন?
নরেন্দ্র মোদি নিজের জনপ্রিয়তা নিয়ে নিজেই সন্দিহান। তিনি আর নিজের পারফরম্যান্স অর্থাৎ চটকদারি বক্তৃতা কিংবা নানাবিধ স্লোগানের জাদুতে বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। সেই কারণেই আমির খানের নতুন সিনেমা ‘সিতারে জমিন পর’ প্রদর্শিত হওয়ার অনুমোদনের আগে সেন্সার বোর্ড শর্ত দিয়েছে, এই সিনেমা শুরু হওয়ার আগে টাইটেল কার্ডে নরেন্দ্র মোদির একটি বার্তা দেখাতে হবে। দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিটে অপারেশন সিন্দুরের সাফল্য জানিয়ে মোদিজির ছবি লাগানো হয়েছে। এসব করতে হচ্ছে কেন? কারণ প্রায় ৭৫ বছরের দোরগোড়ায় থাকা মোদি সম্ভবত বুঝতে পারছেন যে, তাঁর তূণীরে আর কোনও পাশুপত অস্ত্র নেই। ছিল মোদিত্ব এবং হিন্দুত্ব। দুটির ব্যবহার এত স্থূলভাবে করা হয়েছে যে, আর সেই দুই ফর্মুলা নতুন করে আকর্ষণ করতে পারছে না জনসমাজকে। মোদির ভাষণে এখন সবথেকে বেশি মুগ্ধ হন মোদি নিজেই। তাই তিনি প্রতিটি ভাষণে বলে থাকেন যে, মোদি কী করেছেন এবং মোদি কী করতে পারেন। তিনি আর নিজেকে ‘আমি’ বলেন না। বলেন ‘মোদি’। মোদি নিজেই নিজের ফ্যান। কিন্তু তাঁর প্রকৃত ফ্যানবেস কমে যাচ্ছে। তাই মোদি এবার পুরনো সুপারস্টারদের মতোই মরিয়া হয়ে অনেক কিছু হয়তো করবেন। কিন্তু নিশ্চিন্তে বলা যায় যে, মোদি আর সুপারস্টার নেই। তাঁর জনপ্রিয়তার শীর্ষ সময় পেরিয়ে গিয়েছে। এখন ক্রমক্ষীয়মাণ।
সবথেকে চমকপ্রদ বার্তা দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। ২৯৪ আসনের কোথাও উপনির্বাচন হল না। হল এমন এক স্থানে যা মুর্শিদাবাদ সংলগ্ন। অর্থাৎ যে মুর্শিদাবাদকে বিরাট ইস্যু করে বিভাজনের রাজনীতি প্রচারিত হয়েছিল। রীতিমতো বঙ্গবিজেপির জন্য আতঙ্কের বার্তা দিয়েছে মুর্শিদাবাদ। মানুষ ধর্মীয় বিভাজনকে গুরুত্বই দিচ্ছে না সেটা তো ভোটের ফলাফলেই প্রমাণিত। কিন্তু বিজেপির বিপুল সংখ্যক ভোট কমে যাওয়ার অর্থ হিন্দুদের বড়সড় অংশ বিজেপির উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। হিন্দু এবং মুসলিমদের যৌথ ভোট বরং তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিপুলভাবে বাম-কংগ্রেস প্রার্থীর কাছেও গিয়েছে। কংগ্রেস প্রার্থী মাঝেমধ্যেই দ্বিতীয় স্থানে চলে গিয়ে যেরকম টেনশন বিজেপিকে এই কালীগঞ্জ উপনির্বাচনে দিয়েছে গণনার সময়, সেটা এতাবৎকালের মধ্যে বিজেপি কখনও অনুভব করেনি।
বিজেপি কেন্দ্র থেকে বাংলাকে কোনও প্যাকেজ দেয়নি। প্রকল্প দেয়নি। অর্থাৎ উন্নয়ন করেনি। একমাত্র যে ইস্যুতে বিজেপি এতদূর উঠে এসেছে, সেটি হল, ধর্মীয় বিভাজন এবং মোদির ম্যাজিক। কালীগঞ্জে দুটোই ফেল করল। সবথেকে বড় সঙ্কট হল ২০২৬ সালে তাহলে বঙ্গবিজেপির আর হাতে রইল কী? কিছুই নয়। আগামী কাল বাংলায় বিধানসভা ভোট হলেও কী ফলাফল হবে, সেটা কমবেশি এই রাজ্যের ভোটার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও জানে।
তাহলে কি মোদিযুগ শেষ হয়ে গিয়েছে? একেবারেই নয়। এখনও মোদিযুগই চলছে। কিন্তু মোদি যুগের শেষের শুরুর একটি সময়কাল প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। চোখের সামনে কীভাবে মোদিত্ব এবং উগ্র হিন্দুত্ব ধীরে ধীরে অস্তমিত হয়ে যাচ্ছে, এটাই আপাতত চমকপ্রদ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ পর্যবেক্ষণের একটি সময়কাল অতিবাহিত হচ্ছে ভারতের সামনে। কোনও রাজ্যে বিজেপি হয়তো জয়ী হবে। অথবা কোথাও পরাজিত হবে। কিন্তু সেইসব জয় পরাজয়ে নরেন্দ্র মোদি অথবা উগ্র হিন্দুত্বের আর কোনও ভূমিকা থাকবে না। উন্নয়ন থাকতে পারে, ভোটার তালিকার কারসাজি হতে পারে, বিরোধীদের দুর্বলতা অন্যতম কারণ হতে পারে। কিন্তু মোদিত্ব ও হিন্দুত্ব রাজনীতির সুপারহিট স্বর্ণযুগ ভারত পেরিয়ে এসেছে। মোদি চেয়েছিলেন নতুন ভারত গড়তে। কিন্তু নতুন ভারতে মোদি ক্রমেই ব্যাকডেটেড হয়ে যাচ্ছেন। লক্ষ করা যাচ্ছে, মোদির কোনও আহ্বানে আর ভারতবাসী আগের মতো আন্দোলিত, আলোড়িত, উদ্বেলিত হয় না। মোদিত্ব রাজনীতির এক্সপায়ারি ডেট কি চলে এল?