Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মুনিরের দ্বিজাতি তত্ত্বে মোদিদের সিলমোহর!

হিন্দু, মুসলিম—দ্বিজাতি তত্ত্বের আর্টিটেক্ট ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমেদ খান। ধারণাটি জনপ্রিয় এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সফল হয়েছিলেন মহম্মদ আলি জিন্না।

মুনিরের দ্বিজাতি তত্ত্বে মোদিদের সিলমোহর!
  • ৪ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী: হিন্দু, মুসলিম—দ্বিজাতি তত্ত্বের আর্টিটেক্ট ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমেদ খান। ধারণাটি জনপ্রিয় এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সফল হয়েছিলেন মহম্মদ আলি জিন্না। ধর্মনিরপেক্ষ ভারত থেকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান’ ছিনিয়ে নিয়ে তিনি লাভ করেছিলেন ‘কায়েদ-ই-আজম’ খেতাব। কিন্তু মুসলিমদের এই গ্রেট লিডার বা মহান নেতার জন্য ভাগ্য দেবী কোন পরিহাস লিখে রেখেছিলেন? পাকিস্তানের মানুষ তাঁকে ওই রাষ্ট্রের ‘জনক’ মেনেছে। মানে, পাকিস্তান তাঁর একটি ‘সন্তান’। জৈবিক প্রক্রিয়াতেও জিন্নার একটি সন্তান হয়—তাঁর পার্সি স্ত্রী রতনবাই পিটিটের (ইসলামে ধর্মান্তরিত করে তাঁর নাম দেওয়া হয় মরিয়ম) গর্ভে। জিন্নার কন্যা দিনা পিতার 

Advertisement

পদাঙ্কই অনুসরণ করেন—বিবাহ করেন একজন পার্সি পুরুষকে। অমুসলিম জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার জন্য পিতা-পুত্রীর সম্পর্ক একেবারে তলানিতে চলে যায়। বাবার তৈরি দেশেও পা দেননি দিনা। ইসলামি আইনে পাকিস্তানে পিতার সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত করা হয় দিনাকে। নেভিল ওয়াদিয়ার সঙ্গে দাম্পত্যে তাঁদের দুটি সন্তানও হয় (একটি পুত্র এবং একটি কন্যা)। লক্ষণীয় বিষয় হল—জিন্নার বংশধরদের কেউই মুসলিম এবং পাকিস্তানি নন। তাঁরা সকলেই অমুসলিম এবং ভারতবাসী!
এটাই, যে দ্বিজাতি তত্ত্বের মাহাত্ম্য, সেটাকেই উসকে দিয়ে সম্প্রতি পহেলগাঁও গণহত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। তিনি নতুন করে দাবি করেছেন, হিন্দু, মুসলিম জাতি হিসেবে এতটাই পৃথক যে তাদের পক্ষে একত্রে থাকা অসম্ভব! ভাবা যায়, একটি স্বাধীন সাধারণতন্ত্রের সেনানায়ক সরাসরি বিভাজনের তাস খেলছেন! মুনির প্রমাণ করে দিয়েছেন, তিনি সেনানায়কের ছদ্মবেশে আসলে রাষ্ট্রনায়ক, শাহবাজ শরিফ তাঁর আজ্ঞাবহ দাস মাত্র। শরিফ তাঁর গদি বাঁচাতে সৈয়দ আসিম মুনির আহমেদ শাহকে ‘ফিল্ড মার্শাল’ পদে উন্নীত করতে বাধ্য হয়েছেন।    
দ্বিজাতি তত্ত্ব ছয় দশক আগে, পূর্ব পাকিস্তানে সুপার ফ্লপ হওয়ার পরেও মুনির সেই শব আগলে আছেন! তিনি কি বালুচিস্তানসহ পাকিস্তানের বিদ্রোহী এলাকাগুলির দিকে তাকাচ্ছেন না? 
‘মুসলমানের দেশ হয়ে পাকিস্তান দুনিয়ার যত মুসলিম হত্যা করেছে, এত আর কেউ মারেনি। ওরা উর্দি পরে গিয়ে দশ হাজার ফিলিস্তিনি মানুষকে মেরেছিল এক রাতেই। যেখানে পয়সা মিলবে সেখানেই পৌঁছে যাবে পাকিস্তানি ফৌজ। ওরা বালুচিস্তানে দু’লক্ষ মানুষকে খুন করেছে। পাকিদের হাতে বাংলাদেশে ৩০ লক্ষ বাঙালি নিহত হয়েছিল, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলমান। ওরা আফগানিস্তানে চার লাখ মানুষকে মেরেছে। পাকিস্তান এই পর্যন্ত যত মানুষ হত্যা করেছে, তা কি আর কেউ করেছে! এরপরও তুমি বলছ, ওরা মুসলমান? ওদের প্রতি তোমার প্রেম রয়েছে? তোমার মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাও। যে হিংস্র জানোয়ার কেবল রক্তপানই জানে, তার কোনও ধর্ম নেই। ধর্মের দোহাই দিয়ে ওরা তোমাকে স্রেফ উল্লু বানাচ্ছে। তোমার ধর্ম যেটাই হোক না কেন, তুমি ওদের বিরুদ্ধে লড়াই করো। বালুচিস্তানের সঙ্গে ওরা যেটা করেছে তা ‘নিউক্লিয়ার জেনোসাইড’ (নিউক্লিয়ার গণহত্যা), তারপর থেকে ছ’বছর বালুচিস্তানে বৃষ্টি হয়নি!’—এক বালোচ নেত্রীর ভাইরাল ভিডিয়োর অংশ এটি।
এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, পাক সেনানায়ক টিক্কা খান একইসঙ্গে পূর্ববঙ্গ এবং বালুচিস্তানে ‘কসাই’ নামে ঘৃণিত। ১৯৭১ সালে পূর্ববঙ্গে এবং ১৯৭৩ সালে বালুচিস্তানে বিদ্রোহ দমনের নামে হত্যাযজ্ঞ চালান এই কুখ্যাত ব্যক্তিটি। এই ‘বিরল কৃতিত্বের’ জন্যই তিনি ‘পূর্ববঙ্গের কসাই’ এবং ‘বালুচিস্তানের কসাই’ কুখ্যাতি কুড়িয়েছেন। 
ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের আবহে, বিখ্যাত সাহিত্যিক মির ইয়ার ৯ মে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে বালোচ লিবারেশন আর্মির একটি ভিডিও শেয়ার করেন। তার সঙ্গে মির লেখেন, ‘ভারত-পাক সংঘাতের আবহেই স্বাধীনতা পেল বালুচিস্তান! আমরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়েছি। ভারতের কাছে আবেদন, দিল্লিতে স্বাধীন বালুচিস্তানের দূতাবাস স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হোক। আমরা স্বাধীন 
রাষ্ট্রের স্বীকৃতি চেয়েছি রাষ্ট্রসঙ্ঘের কাছেও। 
ওইসঙ্গে শান্তিরক্ষা বাহিনী পাঠিয়ে হটানো হোক 
পাক সেনাকে।’
বাংলাদেশের কিছু উগ্র সাম্প্রদায়িক লোকজন ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ দখল করে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রেসিডেন্ট আসাদউদ্দিন ওয়াইসি পরিষ্কার বলেন, ‘বাংলাদেশ নামক যে মুলুক তোমাদের রয়েছে সেটা তোমরা পেয়েছ আমাদেরই (ভারতের) সৌজন্যে। নিজেদের মুলুকে নিজেরা সুখে শান্তিতে থাক। ভারত তোমাদের তখতের দিকে তাকাতে যাবে না। ভারতের দিকে নজর দেওয়ার ভুলটাও কোরো না তোমরা। ভারত যখন কারও বিরুদ্ধে তর্জনী উঁচু করে তখন কিন্তু এই দেশের সকলে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে একত্রে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।’ 
আসিম মুনির যখন দ্বিজাতি তত্ত্বে সিলমোহর দেন, তখন ওয়াইসি তা খারিজ করে জানিয়ে দেন, ‘এটা আমরা মানি না বলেই পাকিস্তানের বদলে ভারতকে বেছে নিয়েছি।’  
ব্রিটিশ ভারতে পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোর লাগোয়া কাসুরে জন্ম সঙ্গীতসাধক বড়ে গোলাম আলি খাঁর। দেশভাগের পর পাকিস্তানেই ছিলেন, পরে স্থায়ীভাবে চলে আসেন ভারতে। ১৯৫৭ সালে বম্বের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের সহায়তায় ভারতীয় নাগরিকত্ব নেন এবং মুম্বইয়ের বসবাস করতে থাকেন। লাহোর, বম্বে, কলকাতা ও হায়দরাবাদেও থেকেছেন নানা সময়ে। ১৯৬৮ সালে হায়দরাবাদে তাঁর মৃত্যু হয়। সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার এবং পদ্মভূষণ পদকে ভূষিত করা হয় তাঁকে। 
১৯২২ সালে পেশোয়ারে জন্ম মহম্মদ ইউসুফ খানের। দিলীপকুমার নামে মুম্বই চলচ্চিত্র 
জগতের মুকুটহীন সম্রাট হয়ে ওঠেন তিনি। অনন্যসাধারণ অভিনয় নৈপুণ্যের জোরে তিনি রাজ করেন ১৯৫০-৬০-এর দশক জুড়ে। ‘অভিনয় সম্রাট’ খেতাব পান। ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট অ্যাক্টর পান রেকর্ড আটবার—পরে শাহরুখ অবশ্য তা স্পর্শ করেছেন। দেশ তাঁকে দাদাসাহেব ফালকে এবং পদ্মবিভূষণেও ভূষিত করে।   
জন্মসূত্রে পাকিস্তানি হলেও, আদনান সামি ২০১৫ সালে ভারতের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের হয়েই সরব হন তিনি। ২০২২ সালে সমাজমাধ্যমে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের নিন্দা করেন আদনান। তিনি কেন ভারতপ্রেমী, তাও জানান 
গায়ক। জনপ্রিয় বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিনের প্রিয় দেশ ও শহর যথাক্রমে ভারত ও কলকাতা। রাজনৈতিক নেতা থেকে শিল্পপতি, 
শিল্পী থেকে শিক্ষক, লেখক, ক্রীড়াবিদ থেকে কৃষক প্রভৃতি অসংখ্য মুসলিম ব্যক্তি ও পরিবার স্বাধীনতার ভোরে জিন্নার পাকিস্তানের সামনে সপাটে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। 
পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করে অনেক মুসলিম দেশই ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেখানে বিপন্ন 
হিন্দু পর্যটকদের (অতিথি) পাশে দাঁড়াতে গিয়ে সাধারণ মুসলিম বাসিন্দা প্রাণও দিয়েছেন। প্রাণ গিয়েছে মুসলিম সেনা এবং সীমান্তরক্ষী জওয়ানেরও। সর্বোপরি, সোফিয়া কুরেশিদের মতো সেনা অফিসারদের জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। দুঃসময়ে পর্যটকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে 
যেতে নানাভাবে মদত করেছেন কাশ্মীরি জনগণ, বলা বাহুল্য তাঁরা মূলত মুসলিমই। ইউনুস জমানায় অমানুষিক অত্যাচার সয়েও বাংলাদেশে কিছু 
মানুষ এখনও স্বাধীনতার পক্ষে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ রক্ষার জন্য জীবনপাত করে চলেছেন। এঁরা কেউই ভারত বিরোধী নন। 
নবাব সিরাজের পতন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, একা মির জাফরের বেইমানিতে হয়নি। পলাশির যুদ্ধে আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—ঘসেটি বেগম (সিরাজের মাসি), জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ প্রভৃতি। তাঁদের মিলিত বেইমানিই ইংরেজকে শেষহাসি উপহার দিয়েছিল। 
যে দেশের সম্প্রীতির পরম্পরা সত্যিই সুন্দর, সেখানে ‘অপারেশন সিন্দুর’ নিয়ে উদ্বাহু হতে গিয়ে কেন বিভাজনের কদর্য রাজনীতি করা হচ্ছে? ‘অপারেশন মির জাফর’-এ নেমে কী দেখা গেল? দেশের ক্ষতি করতে যারা পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তারা সকলে মুসলিম নয়। হিন্দু দেবালয় চষে বেড়ানো মহিলাও মাতাহারির ভূমিকায়! পাকিস্তানের হয়ে চরবৃত্তিতে উঠে এসেছে আরও একাধিক নারী ও পুরুষের কীর্তি কাহিনি। তাদেরও সকলে কিন্তু মুসিলম কিংবা বিরোধী শাসিত রাজ্যের বাসিন্দা নয়। অমুসলিম আছেই, এবং অভিযুক্তদের বেশিরভাগই বিজেপি শাসিত রাজ্যের ‘রত্ন’! তাই রাষ্ট্রদ্রোহের প্রশ্নে কৌশলে একটিমাত্র ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দেগে দেওয়া এবং ‘তোষণের রাজনীতিকে’ দায়ী করাটা ঘোরতর অন্যায়। এই খেলায় বিজেপির ছুটকো নেতাদের পাশাপাশি, দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাওয়া যাচ্ছে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, এমনকী প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত! পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে রাজাকারদের হাত শক্ত করার সর্বনাশা খেলায় কেন নাম লেখাব আমরা? আসিম মুনিরের বক্তব্যে সিলমোহর দিতেই কি মরিয়া মোদির ভারত? অপারেশন সিন্দুরকে পূর্ণ সমর্থন। বীর সেনাদের কুর্নিশ। কিন্তু সেনাবাহিনীর বীরত্বের রাজনৈতিক মাহাত্ম্য ফেরি করা কেন? স্পর্শকাতর সিঁদুর শব্দটিকে সামনে রেখে ধর্মীয় ভাগাভাগির খেলা যার পর নাই বিপজ্জনক এবং নিন্দনীয়। দেশরক্ষায় একজনেরও অবদান খাটো করার চেষ্টা দুর্ভাগ্যজনক।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ