Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চাতুরিই মোদির মূলধন

নরেন্দ্র মোদির রাজনীতির মূলধন চমক। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশটাই ছিল চমকপ্রদ ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী পদ নিশ্চিত করেই সংসদে প্রবেশ করেন তিনি।

চাতুরিই মোদির মূলধন
  • ৩ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নরেন্দ্র মোদির রাজনীতির মূলধন চমক। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশটাই ছিল চমকপ্রদ ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী পদ নিশ্চিত করেই সংসদে প্রবেশ করেন তিনি। এদেশে এত বড় সৌভাগ্য অন্য কারও হয়নি। আর কুর্সি দখলের পর থেকে মোদি যত চমক দিয়েছেন, তার পাশে আর কোনও রাজনীতিককে রাখা যাবে না। রকমারি প্রতিশ্রুতি থেকে থালাবাটি বাজানো, নিজেকে ঈশ্বরের দূত বলে দাবি করা পর্যন্ত—কী নেই তাঁর চমকের তালিকায়? ওইসঙ্গে তিনি এবং তাঁর মন্ত্রিগণ কথায় কথায় দাবি করেন যে, দেশের জন্য দেশবাসীর জন্য তাঁর সরকার যা করেছে এবং করে চলেছে, তার কোনও নজির নেই। তাঁর আজগুবি দাবির কাছে নেহরু, ইন্দিরা, রাজীব তো বটেই বাজপেয়ির অবদানও খারিজ হয়েছে। তাঁর এই দাবিরই অন্যতম হল একের পর এক বাজেট। বাজেটে বিপুল বরাদ্দ দেখিয়ে প্রথমে কৃতিত্ব আদায় করা হয়। তারপর সেই বরাদ্দই কমিয়ে দেওয়া হয় চুপি চুপি। বাজেট ঘোষণা এবং তার বাস্তবায়নের মধ্যে নিয়ম করে বিরাট ফারাক রেখে চলেছে মোদি সরকার। কারণ কী? রাজকোষের অর্থ বাঁচিয়ে ঘাটতি কমানোর এটাই গেরুয়া কায়দা। এই অনৈতিক প্রবণতা দু’বছর যাবৎ তথ্য-পরিসংখ্যানেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। মোদি সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে এভাবে শুধু পরিকাঠামো উন্নয়ন খাতেই প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা বাঁচিয়ে নিয়েছে। পরিকাঠামো উন্নয়নে বাঁচানো হয়েছে ৯২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এছাড়া আরও প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে রাজ্যগুলির আর্থিক সহায়তা ছেঁটে দিয়ে। এই দুই ধরনের টাকার সবটাই পড়ে রয়েছে কেন্দ্রীয় রাজকোষে।

Advertisement

এখানেই প্রশ্ন, সরকারি মডেলটা কী? বাজেটে গালভরা নানাবিধ প্রকল্প এবং প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হবে। বাজেট নথিতেও বরাদ্দ দেখানো হবে সেইমতো। কিন্তু বাস্তবে ওই টাকা খরচ করা হবে না। অর্থবর্ষের মাঝপথে অথবা শেষ ত্রৈমাসিকে সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ প্রকাশ করা হবে। এই প্রবণতা সাম্প্রতিক কয়েক বছরের। সাধারণ বাজেট অথবা অন্তর্বর্তী বাজেটে তো বটেই, মোদি সরকারের ‘রেকর্ড ব্যয় বরাদ্দ’ নিয়ে ঢক্কানিনাদ চলে বছরভর। ওইসঙ্গে রাজ্যগুলির তরফে উত্থাপিত বঞ্চনার যাবতীয় অভিযোগও নস্যাৎ করা হয়। অথচ বাস্তবটা ভিন্ন। কেননা অর্থবর্ষের অন্তিম লগ্নে পৌঁছে দেখা যায়, এই দুই বরাদ্দই ছেঁটে ফেলা হয়েছে। মঙ্গলবার রাজ্যসভায় ঠিক এই প্রসঙ্গেই অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনকে তুলোধোনা করেন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরম। সস্তার কোনও রাজনৈতিক আক্রমণ ছিল না, তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে তিনি পর্যাপ্ত পরিসংখ্যানও পেশ করেন। সাবেক মনমোহন সিং সরকারের অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে বাজেটে কেন্দ্রীয় সরকার পরিকাঠামো নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় করবে বলেছিল, সেই লক্ষ্যমাত্রা নিজেই বছরের মাঝে কমিয়ে দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের বাজেটে পরিকাঠামো নির্মাণ খাতে অর্থমন্ত্রক বরাদ্দ করেছিল ১১.১১ লক্ষ কোটি টাকা। অথচ সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে করা হয়েছে ১০.১৮৪২৯ লক্ষ কোটি টাকা। আবার পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য রাজ্যগুলিকে ৩.৯০৭৭৮ লক্ষ কোটি টাকা দেবে বলে সরকার বাজেট নথিতে জানিয়েছিল। সেটাও কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দে দেখানো হয়েছে ২.৯৯৮৯১ লক্ষ কোটি টাকা।’ রাজ্যসভায় উপস্থিত অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে চিদম্বরম বলেন, ‘পরিকাঠামো উন্নয়ন ও নির্মাণে খরচ এক ধাক্কায় ৯২,৬৮২ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। আবার অন্যদিকে, রাজ্যগুলিকে প্রদেয় পরিকাঠামো উন্নয়ন খাতে আর্থিক সহায়তা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে ৯০,৮৮৭ কোটি টাকা। এভাবে কেন্দ্র সুকৌশলে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা শুধুমাত্র পরিকাঠামো নির্মাণ খাতে কমিয়ে রাজকোষকে সুরাহা দিয়েছে।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘কিন্তু এইভাবে বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ কমিয়ে দেওয়ার কারণ কী?’ 
কেন্দ্রীয় বাজেট বরাদ্দ এবং সংশোধিত বরাদ্দের তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরে সরকারকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দেন চিদম্বরম। তাঁর অভিযোগ খারিজসহ নির্মলা সীতারামন অবশ্য দাবি করেন, ‘গত অর্থবর্ষে পরিকাঠামো নির্মাণে ১১.২১ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আর রাজ্যগুলিকে প্রদেয় আর্থিক সহায়তাতেও সরকার কোনোরকম কোপ দেয়নি। এই অর্থ বরাদ্দ আমরাই বরং ধাপে ধাপে গত কয়েক বছরে বাড়িয়েছি।’ সংসদের অন্দরে পরিসংখ্যানের এই বাগযুদ্ধের পর প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় ফের বিস্তারিত ওই তথ্য প্রকাশসহ দাবি করেন, ‘রাজ্যগুলিকে বঞ্চনা করা হয়েছে। টাকা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় পরিকাঠামো খাতেও। অর্থমন্ত্রী এসব অস্বীকার করছেন কীভাবে? আমি হতবাক!’ চিদম্বরম বিস্মিত হতেই পারেন। কিন্তু দেশবাসী মোটেই বিস্মিত নয়। কারণ তারা জানে, এই সরকারের মূল হাতিয়ার চাতুরি। বছরে ২ কোটি চাকরি আর সবার অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েই তাদের শুভযাত্রা শুরু হয়েছিল। কোনও কথা না-রাখার জন্য যারা সামান্যতমও লজ্জিত নয়, দেশবাসীর কাছে এক দশকেও দুঃখ প্রকাশ করেনি, তারা বাজেটে তঞ্চকতার আশ্রয় নেবে এ আর বড় কথা কী!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ