হিমাংশু সিংহ: কথায় আছে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। আমাদের মহামান্য প্রধানমন্ত্রী থুড়ি বিজেপি’র শীর্ষ নেতা শান্ত আলিপুরদুয়ারে দু’দণ্ডের জন্য এসেও সঙ্কীর্ণ রাজনীতি ভুলতে পারলেন না? পাকিস্তানকে তোপ দাগতে বিরোধীদের বিদেশে পাঠিয়ে নিজে ঘুরে ঘুরে আমরা-ওরা করেন। ক্ষমতা দখলের অলীক গল্প ফেরি করে বেড়ান বাংলায়, বিহারে। দীর্ঘ বিরতির পর রাজ্যে এসে বুঝিয়ে দেন, তাঁর সিঁদুর যতটা না পাকিস্তানকে শিক্ষা দিতে তার চেয়ে ঢের বেশি বঙ্গ দখলের জন্য সমর্পিত। নোট বাতিল, বছরে দু’লক্ষ চাকরি, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে পদাঘাত এবং কৃষকের আয় দ্বিগুণের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির পর কেন্দ্রের নয়া জুমলা!
অলিপুরদুয়ারে তাঁর টার্গেট নিমেষে পাকিস্তান থেকে ঘুরে গেল ছাব্বিশে বাংলায় ক্ষমতা দখলের কিস্সায়। খালি হাতে এসে স্রেফ ভোটের প্রচার করে দিল্লি ফিরে গেলেন। ঢাক পেটালেন জোরে কিন্তু রাজ্যের পৌনে দু’লক্ষ কোটি টাকা বকেয়া নিয়ে একটা কথাও খরচ করার সময় পেলেন না। একশো দিনের কাজের টাকা বন্ধ সাড়ে তিন বছর। আবাসের টাকা দেওয়া হচ্ছে না। কেন্দ্রের এই সীমাহীন বঞ্চনায় প্রলেপ দেওয়ার বদলে তিনি উল্টে এখানকার নির্বাচিত সরকারকেই ‘নির্মম’ বলে দেগে দিয়ে কয়েক ঘণ্টার সফর সেরে ফিরে গেলেন। বঙ্গের মানুষ দেখল বিধানসভা ভোটের ৯ মাস আগে আবার নতুন করে ডেলি প্যাসেঞ্জারি শুরু। মোদিজির পিঠোপিঠি হাজির অমিত শাহও। জেলায় জেলায় বিজেপি’র সংগঠন ভেঙে চৌচির। বুথে বসার নেতা নেই। প্রার্থীও বাড়ন্ত! এই কঠিন সময়ে এবারের নয়া সংযোজন সেনার বীরত্বকে ষোলোআনা নিজের বলে চালিয়ে মা বোনেদের নিঃশর্ত সমর্থন আদায়। সিঁদুর হিন্দু সমাজের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। তবে তাকে নিয়ে রাজনীতি কোনওমতেই বরদাস্ত নয়। ভোট কিনতে তার উচ্চকিত বিপণন কতটা সমীচীন স্বয়ং রাষ্ট্রনেতার মুখে?
নিঃসন্দেহে বর্তমান সময়টা বাংলার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৯ মাস পর বঙ্গ অস্মিতা আবার পরীক্ষার মুখে। বাঙালির শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষার অগ্নিপরীক্ষা। এই সুযোগটারই অপেক্ষায় ছিল গেরুয়া শিবির। দলবদলু আর পুরনো আরএসএস পন্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র। বহু ক্ষেত্রে মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত নেই। জেলায় জেলায় সংগঠন তলানিতে। আর মোদিজি দেখাচ্ছেন নতুন বাংলার স্বপ্ন! তাঁর কথায়, বহু রকমের সংকট নাকি বাংলাকে ঘিরে রেখেছে। প্রথম সংকট, হিংসা ও অরাজকতা। দ্বিতীয়, মা বোনেদের নিরাপত্তাহীনতা। তিন, নতুন প্রজন্মের হতাশা। কর্মসংস্থানের অভাব। চতুর্থ সংকট, বেলাগাম দুর্নীতি। সব শেষে—‘গরিবের অধিকার ছিনিয়ে নিতে শাসক দলের স্বার্থপর রাজনীতি’। প্রধানমন্ত্রীর কথায়,‘মুর্শিদাবাদ, মালদায় যা হয়েছে তা রাজ্য সরকারের নির্মমতার উদাহরণ।’ প্রধানমন্ত্রীর এই ন্যারেটিভে কতটা দুধ আর কতটা জল রয়েছে তার বিচার করবেন বাংলার মানুষ। আগামী নির্বাচনে। তবে দুর্নীতি, বিশেষ করে নিয়োগ দুর্নীতি, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় গরমিল শুধু বাংলাতেই হয়েছে একথা কেউ বিশ্বাস করবে না। গত বছর সর্বভারতীয় নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় কার? পশ্চিমবঙ্গ সরকারের? এখনও পর্যন্ত কেন্দ্রের পক্ষে কেউ দায় নিয়েছেন? গত বছর ডাবল ইঞ্জিন উত্তরপ্রদেশে পুলিসের কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষা শেষ মুহূর্তে বাতিল করতে হয় প্রশ্নফাঁসের ধাক্কায়। বিজেপি’র শীর্ষ নেতৃত্ব তা নিয়ে কি একটা বিবৃতিও দিয়েছে? দোষীদের কি চিহ্নিত করা গিয়েছে? তেইশ সালে একই কারণে পুলিসে নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল হয় আর এক ডাবল ইঞ্জিন রাজ্য বিহারে। মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারির কথা বোধহয় আজকাল মোদিজি বিশেষ মনে রাখতে চান না। তিনি সম্ভবত এটাও মনে রাখতে আগ্রহী নন, তাঁর জমানাতেই দেশে রেকর্ড বেকারত্ব যুব সমাজকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। দশ লক্ষ সরকারি পদ ফাঁকা। রেল, ব্যাঙ্কের চাকরি পর্যন্ত ষোলোআনা নিরাপদ নয়। এসব ভুলে তিনি মাঝে মাঝে স্টার্টআপ সম্মেলন করেন। বলি, ওতে সাধারণের পেট ভরবে? মা বোনেদের নিরাপত্তার কথা নয় নাই বললাম। হাতরাসে কী হয়েছে? রাতের অন্ধকারে ধর্ষিতা নারীর সৎকার করল কারা? সেই খবর সংগ্রহে গিয়ে সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পানকে দু’বছর জেলে কাটাতে হল কেন? সরকারের বিরোধিতা করলেই ইউএপিএ ধারা দিয়ে শ্রীঘরে! উত্তরাখণ্ডে ১৯ বছরের অঙ্কিতাকে খুন করেছিল যারা, প্রমাণ হয়ে গিয়েছে তারা গেরুয়া দলের লোক। কে না জানে গত ১১ বছরে ভারতীয় ব্যাঙ্ক থেকে প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষ কোটি টাকা গায়েব হয়ে গিয়েছে। এর দায়ও কি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের? তাই বাংলাকে দুর্নীতির দোষে দুষ্ট ঘোষণা করার আগে তাঁর উচিত ছিল নিজের দিকে তাকানো। দিল্লির সীমানায় বসে কত কৃষকের প্রাণ গিয়েছে? ওই ঘটনা কার নির্মমতার প্রমাণ? সব জায়গায় ছুটে যাচ্ছেন অথচ ব্রাত্য শুধু হিংসাদীর্ণ মণিপুর! বিহার ও উত্তরপ্রদেশে লক্ষ কোটির প্রকল্প উদ্বোধন। বাংলায় নামমাত্র হাজার কোটির। সচেতনভাবে এই অবহেলা কেন?
২২ এপ্রিল পহেলগাঁও কাণ্ড ইস্তক জাতীয় স্তরে দলাদলির রাজনীতি প্রায় বন্ধ মোদিজির কৌশলে। ব্যাখ্যা, দেশ বিপদে পড়লে বাইরের শত্রুর মোকাবিলার সময় সরকার বিরোধী বিভেদ কোনওমতে কাম্য নয়। এটাই রীতি। অথচ বাইরের শত্রুর মোকাবিলায় দেশকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরামর্শ দিয়ে নিজেই বিভাজনের বিষ ছড়িয়ে গেলেন দৃষ্টিকটুভাবে। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই দেখছিলাম আলিপুরদুয়ারের প্যারেড গ্রাউন্ডে গেরুয়া দলীয় পতাকাকে ঢেকে চারদিকে জাতীয় পতাকার বর্ণাঢ্য বিজয় যাত্রা। মনটা বেশ পুলকিত হয়েছিল। উপস্থিত জনতা সেনার বীরগাথা স্মরণে আপ্লুত। পহেলগাঁও হামলার পর থেকে সবাইকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে ওঠার পরামর্শ দিয়ে চলেছেন তিনিই। তাঁর ডাকে বিরোধীরাও রাজনীতি ভুলে কোমর বেঁধে বিদেশে পাকিস্তানের মুখোশ খুলতে নেমেছেন। ওই প্রতিনিধিদলে বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতানেত্রীরা একের পর এক দেশ সফর করছেন। তাঁদের কাছেও নরেন্দ্র মোদির দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে হঠাৎই দলের ‘সামান্য’ নেতায় নেমে আসা নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক। প্রধানমন্ত্রী পদের একটা আলাদা সম্মান আছে, গাম্ভীর্যও অপরিসীম। একগুচ্ছ সরকারি প্রকল্পের সূচনা করতে এসে তিনি যদি টানা সস্তার রাজনীতি করেন তা দেশের পক্ষে দুর্ভাগ্যজনক। কেন্দ্রীয় সরকার যে ক’জন জাতীয় স্তরের নেতানেত্রীকে বিদেশে পাঠিয়েছে তাঁদের মধ্যে তিনজন ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছেন। প্রথম জন বৈদেশিক বিষয়ে প্রাজ্ঞ কংগ্রেসের শশী থারুর। দ্বিতীয়জন আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এবং সবাইকে চমকে দিয়ে অত্যন্ত দক্ষ ও সদর্থক ভূমিকা পালন করছেন তৃণমূল এমপি, দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এঁরা কেউ এই আবহে রাজনীতির কথা মনে রাখছেন না। ভোটের কথাও মাথায় নেই। অথচ মোদিজি? সবাইকে দেশপ্রেমে ডুবিয়ে এই সুযোগে ভোটের কড়ি গুনে নিতে নেমেছেন। তিনদিনে চার রাজ্য। এই কাজটাই অন্য কেউ করলে এতক্ষণে গেরুয়াবাহিনী ধিক্কার দিত। দলের সোশ্যাল মিডিয়া সেল রে রে করে ঝাঁপিয়ে পড়ত হরেক কিসিমের মিম নিয়ে, অথচ সেই তিনি যখন ন্যারেটিভটাই বদলে দিলেন তখন সঙ্ঘ পরিবার আশ্চর্যজনকভাবে চুপ। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কোনও ভুল বলেননি। আক্ষরিক অর্থেই আলিপুরদুয়ারে তিনি সেনাবাহিনীর বীরত্বকে ভোট যন্ত্রে ‘কমল খিলানো’র কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। বাংলায় এসে তাল ভাঙার এই দায় নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রীর। এটা কি শিষ্টাচার? ভদ্রতা? না সৌজন্য? তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। বারবার তিনি বলছেন, অপারেশন সিন্দুর এখনও শেষ হয়নি। অর্থাৎ তিনি চান, বিরোধীদের মুখে চাবি দেওয়া থাকবে। আর সেই সুযোগে তিনি সঙ্কীর্ণ রাজনীতির গুপ্ত মন্ত্র জপে যাবেন একা!
গণতন্ত্রে কোনও অঙ্গ রাজ্যে কোন দলের সরকার থাকবে তা ঠিক করার দায়িত্ব জনগণের। পাঁচ বছর অন্তর সেই নির্বাচন সম্পন্ন হয় সংবিধান মেনে। নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনায়। আসন্ন নভেম্বরে প্রতিবেশী বিহারে ভোটের পরই বাংলায় জনসমর্থন যাচাইয়ের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে যাবে। তাই পাক অধিকৃত কাশ্মীর নয়, মোদিজির পাখির চোখ বিহার ও বাংলা। একেবারে লুক ইস্ট পলিসি আর কী! আলিপুরদুয়ারের প্যারেড গ্রাউন্ডে রাষ্ট্রনেতার গলা যতই সপ্তমে চড়ুক, মাঠে ময়দানে দাঁড়িয়ে আগামী দিনে বাংলার শাসনভার কার হাতে যাবে তার ফয়সালাও হওয়ার নয়। বাংলা একুশের লড়াই দেখেছে, চব্বিশের আস্ফালন দেখেছে। নতুন করে মোদি-অমিত শাহ জুটির হাতে বঙ্গ অস্মিতাকে ঘায়েল করার মতো কোনও মারণ ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা নেই। আবার কট্টর জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু-মুসলিম রাজনীতির ধারাপাতেও ছাব্বিশে বিজেপি’র বঙ্গ বিজয় দূর অস্ত! অগত্যা ভরসা বাহাদুর সেনার বীরত্ব ও মা বোনেদের সিঁদুর!
মোদিজি ভাষণ শুরু করেছিলেন তেনজিং নোরগের এভারেস্ট বিজয় প্রসঙ্গ দিয়ে। ২৯ মে তেনজিংয়ের অতুল কীর্তির ৭২ তম বর্ষবরণের পবিত্র ক্ষণ ছিল। প্রশ্ন এখানেই, তিনি কি রাজনীতির সব হার্ডল পেরিয়ে নিজেকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারলেন? বোধ হয় না। যতই উপর দিয়েই যাই না কেন আমাদের মতো সাধারণের নজর থাকে ভাগাড়ে। আর তিনি তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, স্বঘোষিত ‘বিশ্বগুরু’ হয়েও ভোটের ত্র্যহস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে পারলেন না। কারণ তাঁর নজর সদা ইভিএমে। কিন্তু সিঁদুর পবিত্র। সেনার শৌর্য ও ত্যাগের কোনও তুলনা হয় না। দয়া করে তাকে ভোটের পণ্য করবেন না। রাজনীতি থেকে আলাদা রাখুন।