Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মিশন ৭৫ সফল করতে প্রত্যাঘাত চাই মোদিজি

আম জনতার ‘পালস’টা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বেশ ভালো বোঝেন। পহেলগাঁওয়ে পর্যটকদের উপর নৃশংস জঙ্গি হামলার পর আমরা আশা করেছিলাম, প্রধানমন্ত্রী সৌদি সফর কাটছাঁট করে ফিরে আসবেন। তিনি এসেছেন। আমরা আশা করেছিলাম, তিনি বদলার বার্তা দেবেন। দিয়েছেন।

মিশন ৭৫ সফল করতে প্রত্যাঘাত চাই মোদিজি
  • ২৯ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: আম জনতার ‘পালস’টা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বেশ ভালো বোঝেন। পহেলগাঁওয়ে পর্যটকদের উপর নৃশংস জঙ্গি হামলার পর আমরা আশা করেছিলাম, প্রধানমন্ত্রী সৌদি সফর কাটছাঁট করে ফিরে আসবেন। তিনি এসেছেন। আমরা আশা করেছিলাম, তিনি বদলার বার্তা দেবেন। দিয়েছেন। আমরা আশা করেছিলাম, তিনি মণিপুর যাননি... একবার অন্তত কাশ্মীর যাবেন। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত না গেলেও শোনা যাচ্ছে, মোদিজি যাবেন। পরিস্থিতি এবং প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে। কারণ, ওই যে শুরুতে বললাম... পাবলিক পালস তিনি দারুণ বোঝেন। মানুষ এখন ফুটছে। পর্যটকদের দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়েছে। দেখা হয়েছে আই কার্ড। 

Advertisement

জিজ্ঞেস করা হয়েছে ধর্ম। কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই মানবিকতার উপর এমন হামলা ভালোভাবে নেয়নি। নিতে পারেও না। আর সেটা মোদিজি বুঝেছেন। তাই বিহারের ‘নির্বাচনী মঞ্চ’ তো বটেই, রেডিওয় ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানেও প্রত্যাঘাতের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। কিন্তু একটা বিষয় তাঁকে আরও বুঝতে হবে, আম আদমি গরম গরম বাণীতে সন্তুষ্ট হবে না। ভারত অ্যাকশন চায়। প্রত্যেকটা জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিতে হবে। আঘাত এমন হবে, যাতে কাঁটাতার পেরিয়ে কোনও পাকিস্তানি জঙ্গি কাশ্মীর, পাঞ্জাব বা রাজস্থানে ঢোকার সাহস না পায়। তেমন কোনও প্ল্যানিংই কি মোদিজি করছেন? মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় না, দেখতে চায়। নরেন্দ্র মোদি নিজেও সেটা চান। কারণ, এটাই তাঁর শেষ সুযোগ। ৭৫’এর গেরো কাটাতে।
নতুন মুখের বিজেপি। শতবর্ষে এটাই সঙ্ঘের এজেন্ডা। বিজেপিকে বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত করতে চায় না তারা। ঠিক সেই কারণেই বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের দলীয় ও প্রশাসনিক পদে অদ্ভুতভাবে উঠে আসছে অজানা-অচেনা বহু নাম। অজানা কেন? নিজেদের কেন্দ্রে তাঁরা পরিচিত ঠিকই, কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে নয়। এখানেই ট্যুইস্ট চাইছে সঙ্ঘ। শুধু নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ বা নীতিন গাদকারি নন... এঁদের পর কারা? সেই প্রশ্নেরই উত্তরের খোঁজ চলছে। মুখ্যমন্ত্রী, উপ মুখ্যমন্ত্রী, বা রাজ্য সভাপতি... বয়স ৫০-৫৫ বছরের উপর যাবে না। আরএসএসের এই বার্তা পৌঁছে গিয়েছে বিজেপির কাছে। সেই মতো সিদ্ধান্ত কার্যকরও হচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় বয়সের সিলিং? সে তো প্রধানমন্ত্রী নিজেই ৭৫ বছরে বেঁধে রেখেছেন। মোল্লা নাসিরুদ্দিনের একটা গল্প মনে পড়ে যায়। একবার মোল্লা কাজি হয়েছে। এক গরিব বৃদ্ধা তার কাছে এসে বলল, আমার ছেলে রোজ মুঠো মুঠো চিনি খায়। আমি গরিব মানুষ, কোথা থেকে জোগাব? আপনি বারণ করে দিন, তাহলে ও শুনবে। মোল্লা তাকে আর একদিন আসতে বলল। তারপর আর একদিন। তৃতীয় দিনে বৃদ্ধা আসার পর মোল্লা বলল, নিয়ে এসো তোমার ছেলেকে। সে আসার পর মোল্লা চিৎকার করে তাকে নির্দেশ দিল, আর একবারও চিনি খাওয়ার নালিশ পেলে তোমাকে শূলে চড়াব। বৃদ্ধা তারপর মোল্লাকে জিজ্ঞেস করল, এই হুকুম তো আপনি প্রথম দিনই দিতে পারতেন। তিনদিন সময় নিলেন কেন? মোল্লা নাসিরুদ্দিনের উত্তর ছিল, আরে তোমার ছেলেকে হুকুম দেওয়ার আগে আমার নিজের চিনি খাওয়ার অভ্যাসটা তো ছাড়তে হবে! না হলে অন্যকে নির্দেশ দেব কীভাবে? নরেন্দ্র মোদি অন্যদের উপর হুকুম-নিয়ম চাপিয়েছেন। এবার তাঁর নিজের পালা। তাঁর ৭৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে। বিজেপির একটা অংশ থেকে তাঁর সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বের জন্য লাগাতার দাবি উঠছে। একদিকে যখন তাঁর নাগপুর সফর ‘ব্যর্থ’ বলে কটাক্ষের হাওয়া উঠেছে, তখন দেবেন্দ্র ফড়নবিশ পাল্টা জবাব দিয়েছেন, মোদিজি ২০২৯ সালের পরও প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। কিন্তু এই সবই আবেগের কথা। মোদিজি নিজে ‘কাজি’ হয়ে তো আর নিয়ম ভাঙতে পারবেন না! সেক্ষেত্রে এমন কোনও পদক্ষেপ চাই, এমন অ্যাকশন... যাতে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে তাঁকে সরানোর প্রসঙ্গই আর উঠবে না। জনমানসে স্লোগান উঠবে, মোদিকেই চাই। ফিকে হয়ে যাওয়া মোদি ম্যাজিক আরও একবার চাগাড় দেবে। আওয়াজ শোনা যাবে, মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়। সেই ‘মুমকিন’টা কী? সন্ত্রাসবাদকে ঝাড়েবংশে নির্মূল করে দেওয়া। এটুকুই এখন ক্ষিপ্ত ভারতবাসীর চাহিদা, আর এটুকুই তাঁর বিশল্যকরণী। তাই ধরে নেওয়াই যায়, কিছু একটা মোদিজি করবেন। এখনও করতে পারেন, কিংবা এই হাই অ্যালার্ট ব্যাপারটা থিতিয়ে যাওয়ার পর... দিন ১৫-২০ বাদে। কিন্তু করবেন। নভেম্বরে বিহারে ভোট। এই মুহূর্তে বাংলার এই পড়শি রাজ্যের যা পরিস্থিতি, তেজস্বী যাদব এনডিএ’র ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে। আর প্রতিদিন তাঁর সম্ভাবনাটা আরও বাড়ছে। এরই প্রধান কারণ অবশ্যই মোদি ম্যাজিক হাওয়া হয়ে যাওয়া। নিন্দুকে বলতে পারে, বিহারে বিজেপি কবে আর মোদিজিকে সামনে রেখে জিতেছে! বরং এখানে নীতীশ ফ্যাক্টরই প্রবল। হক কথা। বারবার নৌকা বদল সত্ত্বেও নীতীশ কুমারের একটা আলাদা ক্যারিশ্মা বিহারে আছে। কারণ, এই রাজ্যের বহু মানুষ বিশ্বাস করে, তিনি রাজ্যবাসীর জন্য অনেক কিছু করেছেন। যদিও নীতীশ ভক্তের সংখ্যাটা ১০ বছর আগে যা ছিল, তার তুলনায় এখন অনেক কম। আর সেই ভোটব্যাঙ্ক আজ বিজেপির জন্য বিরক্তও। বালাকোট জাতীয় কিছু একটা করে ফেলতে পারলে দেশাত্মবোধের সেই হাওয়াতেই বিহার বেরিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিজেপির উঁচুতলার একটা বড় অংশ। সঙ্গে মোদিজি অন্তত বছর চারেকের একটা লাইফলাইন তো পাবেনই। আর বাকি রইল বাংলা।
আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। এবং ফিরে আসা নরেন্দ্র মোদির দুঃস্বপ্ন। এই একটি রাজ্যে কিছুতেই অঙ্ক মেলাতে পারেননি তিনি। চেষ্টা নানাবিধ হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবাসীর মন পাননি। কেন? সোজা উত্তর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প তাঁরা হয়ে উঠতে পারছেন না। আগামী দিনেও কতটা পারবেন, সন্দেহ আছে। কারণ, মোদিজির দলে বাংলাকে ভরসা জোগানোর মতো মুখ একটিও নেই। তাহলে উপায় কী? মুখ না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ভোটের যন্ত্রে বাজিমাত করা যায়? আছে একটা পরীক্ষিত ফর্মুলা... মেরুকরণ। ধর্ম। এখানেও বিধি বাম। বহু চেষ্টা করেও ধর্মের রাজনীতিকে বাংলায় একটা আবাস দিতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দল। এইবার একটা সুযোগ এসেছে। পহেলগাঁওয়ের ঘটনা কট্টরপন্থী গেরুয়া শিবিরের কাজ জলভাত করে দিয়েছে। এ যেন মেঘ না চাইতেই জল। ধর্মের নামে মেরুকরণের চিত্রনাট্য এখন শোনা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের মুখে। বাংলার বহু শিক্ষিত মানুষকে দেখা যাচ্ছে চায়ের দোকান থেকে সেলুন, কিংবা লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালের ভিড়ের মধ্যেও ধর্মের নামে গাল পাড়ছেন। প্রত্যেকে বিশেষজ্ঞ। আর প্রতি মুহূর্তে বিষ ঢেলে চলেছেন তাঁরা। একবারও ভাবছেন না, এর পরিণাম কত খারাপ হতে পারে। একটা বস্তার চালে পোকা ধরেছে মানে এই নয় যে, পুরো ধানখেতটাই পচে গিয়েছে। আমরা এখন তেমনটাই মনে করছি। জঙ্গি ঘাঁটিতে যেভাবে কৈশোরে সদ্য পা রাখা ছেলেমেয়েদের মগজ ধোলাই করা হয়, আমরা নিজেরাই নিজেদের ব্রেন ওয়াশ করছি... একইভাবে। নিজেরাই ঢুকে পড়ছি মগজ ধোলাই যন্ত্রের ভিতর। বুদ্ধি, বিবেচনা ঝেড়ে ফেলে দাঁড় করাচ্ছি অমানবিকতার ইমারত। ভুলে যাচ্ছি, আমাদের এই বাংলাতেই গফুর মিঞা তার ষাঁড়ের নাম দিয়েছিল মহেশ। নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু... রবি ঠাকুর রাখি বন্ধনের সময় দেখেননি উল্টোদিকের মানুষটার ধর্ম কী। সীমান্তে যুদ্ধ করতে যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। কিন্তু গৃহযুদ্ধের মতো একটা পরিস্থিতি তৈরি করছি... আমরাই। এটাই তো চায় হিন্দুত্বের নামে বিভাজনের খেলায় নামা কট্টরপন্থী গেরুয়া বাহিনী। এটাই তো চায় সীমান্তের ওপারে বিভেদের ঘুঁটিতে শান দেওয়া সন্ত্রাসবাদ। পাকিস্তান খেতে না পেলেও সন্ত্রাসের জন্য টাকা আটকায় না। কারণ এ এমন ব্যবসা, যার রিটার্ন সুদূরপ্রসারী। একটা মুদি দোকান খুলতে গেলে তার ক্যাপিটাল জোগাড় করতে এখন কালঘাম ছুটে যায়, কিন্তু একটা জঙ্গি হামলার জন্য ফান্ডিংয়ের অভাব হয় না। রাষ্ট্র হোক বা রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি... প্রত্যেকের এই একটাই উদ্দেশ্য—সাধারণ মানুষকে ঘেঁটে দেওয়া। বিবাদ বাঁধিয়ে রাখা। নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকলে আমরা প্রশ্ন করব না। জানতে চাইব না, আমার এলাকার রাস্তাটা এখনও পাকা হয়নি কেন? দেশে বেকার সংখ্যা বাড়ছে কেন? গত মাসের তুলনায় এ মাসে চালের দাম ১০ টাকা বেড়ে গেল কেন? আজ বাদে কাল খাব কী? আপনাদের ভোট দেব কেন?
নাঃ, ওসব এখন থাক। সীমান্তে বড় টেনশন। আজ বাদে কাল যুদ্ধ হতে পারে। সেদিকে মন দেওয়াই ভালো। আম আদমি মন দেবে, আর মোদিজিও দেবেন। পশ্চিম সীমান্তে কাঁটাতার পেরলে তাঁর ৭৫’এর পথের কাঁটা সরবে। অটোমেটিক্যালি। সঙ্ঘ না চাইলেও ভারত চাইবে... মোদিজিই থাকুন। তাই আপাতত ফোকাস ‘মিশন ৭৫’-এ। ওই যে মোদিজি বলেছেন, ১৪০ কোটি ভারতবাসী একতাই তাঁর শক্তি। সীমান্তে... আর ঘরেও। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ