Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাগাড়ম্বর এবার অন্তত থামান মোদিজি

“...সাহিত্যের সার্কাসে আমার ভূমিকাটা একেবারেই আউটসাইডারের। ভালো ফুটবল খেলতে পারলে এলাইনে আসতাম না। আর কিছু হল না, কিছুটা slings and arrows of outrageous fortune, কিছুটা ফাঁকতাল বাকিটা ফুক, লেখক হলাম।...

বাগাড়ম্বর এবার অন্তত থামান মোদিজি
  • ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী: “...সাহিত্যের সার্কাসে আমার ভূমিকাটা একেবারেই আউটসাইডারের। ভালো ফুটবল খেলতে পারলে এলাইনে আসতাম না। আর কিছু হল না, কিছুটা slings and arrows of outrageous fortune, কিছুটা ফাঁকতাল বাকিটা ফুক, লেখক হলাম।...

Advertisement

‘শিল্পের জন্য শিল্প’-এ তত্ত্বে আমি বিশ্বাসী নই। আমি নিপীড়িত এবং বঞ্চিত মানুষের মধ্যে বড়ো হয়েছি। তাই তাদের কথা আমার সাহিত্যে বারবার এসেছে। এবং আমার মনে হয়, এদের কথা যদি না কলমে তুলে ধরি তাহলে নিজের জীবনটা একটা বেইমানের জীবন হয়ে যাবে।... আমার মনে হয় নিজের কতকগুলো কথা বলার আছে। সেগুলো আমি ছাড়া আর কেউ আমার মতো করে বলতে পারবে না। তাই আমি লিখি।...
...আমি লেখার ব্যাপারটা যেভাবে বুঝি সেটা নিছক আনন্দ দেওয়া বা নেওয়া নয়।
আরও গভীর এক অ্যালকেমি যেখানে বিস্ফোরণের ঝুঁকি রয়েছে।...
...গ্রামে মানুষের উপরে পুলিশ ও গুন্ডা টার্গেট প্র্যাকটিস করবে, বন্ধ কারখানার শ্রমিক হয় রক্তবমি করে মরবে বা ক্রিমিনাল হয়ে যাবে, কলকাতার বুকের উপরে কারখানা লোপাট করে রাক্ষুসে শপিংমল ও রাক্ষসদের থাকার রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স তৈরি হবে, রাস্তার কুকুরদের শীতকালের বরাদ্দ রোদ কেড়ে নেবে হাইরাইজ আর নিরাপদ সাহিত্যের ঢ্যামনামি করব বা ক্ষমতাসীন অক্ষমের চিয়ারলিডার হয়ে মজা মারব এটা হয় না।...”
—বলেছিলেন নবারুণ ভট্টাচার্য। 
‘সাহিত্য’-এর জায়গায় ‘রাজনীতি’ শব্দটি বসিয়ে নিলে আমাদের একাধিক চেনা নেতার মুখ ভেসে ওঠে, যাঁরা শুধুই ‘জনগণের সেবা’ করার দাবি করে থাকেন। এরপরই কানে আসে আস্ফালন, ‘‘অমুকে অমুকে (পূর্বসূরিগণ) কিচ্ছুটি করে নাই। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজটা আমিই শুরু করলাম।’’—ইত্যাদি প্রভৃতি। ইত্যবসরে যাঁর নামটি সবার আগে মনে আসছে তিনি আদি ও অকৃত্রিম এবং যাঁর কোনও শাখা নাই—নরেন্দ্র মোদি, আমাদের সম্মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়। কেননা, তাঁর বিচারে বিজেপি-ই হল ‘পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স’ এবং তাঁর পূর্বসূরিগণ—কেউই দেশের ভালো করেননি। নেহরু থেকে মনমোহনের মাঝখানে ‘বাজপেয়ি’ নামক ব্যক্তিত্বটি অন্তর্ভুক্ত হলেও কি মোদিজির বিশেষ আপত্তি আছে? মনে হয় না। যাই হোক, মোদিজির বিচারে ভারতের সাড়ে সর্বনাশের মূল কারণ কংগ্রেস এবং তাদের প্রধানমন্ত্রীরা। মোদিজি বারবারই দাবি করে থাকেন, বস্তুত এক অতল থেকেই ভারতকে তুলে এনেছেন তিনি একা এবং জগৎসভায় ভারতের জন্য শ্রেষ্ঠ আসন বরাদ্দ করার ব্যবস্থাটিও তিনি করে যাচ্ছেন। সোজা কথায়, তিনিই ভারতের ‘সবচেয়ে শক্তিমান’ প্রধানমন্ত্রী। 
এই প্রেক্ষিতেই আমরা বুঝে নিতে চাই, কাকে প্রকৃত শক্তিশালী দেশনেতা আখ্যা দিতে পারি। শক্তিসামর্থ্যের প্রশ্ন উঠলেই কোনও এককালে চীনের কাছে নেহরুর পরাজয়ের গ্লানি তুলে ধরে খোঁচা দেন মোদিজি। একাত্তরে পাক-ভারত যুদ্ধে শ্রীমতী গান্ধীর কৃতিত্বকে গুরুত্ব দিতে নারাজ তিনি। পাশাপশি তাঁর সরকার কার্গিল বিজয় দিবস উদযাপন করে। বস্তুত বিজেপি সরকারের যাবতীয় বুক বাজানো কারবার শুধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে, কিন্তু চীনা আগ্রাসন মোকাবিলার সময় পুরো দিশাহারা। ২০২০ সালের মার্চ-এপ্রিলে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) অতিক্রম করে লাল ফৌজের ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ নিয়ে দেশবাসী আজও সদুত্তর পায়নি। 
যুদ্ধ আমরা চাই না ঠিকই কিন্তু পাকিস্তান যখন ভারতকে যুদ্ধে নামতে বাধ্য করল তখন যুদ্ধ না করে উপায় কী। পাকিস্তান যখন পর্যুদস্ত, তাদের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা, ঠিক তখনই—গত ১০ মে ভারত যুদ্ধ থামাল কোন বুদ্ধিবলে কিংবা কোন চাপের কাছে মাথা নত করে? কেন আমরা পাক-অধিকৃত কাশ্মীর ফেরত নেওয়ার এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করলাম? কোনও জবাব নেই। জবাব একট‍াই—আমাদের ‘ডিসিসিভ ভিকট্রি’ হয়েছে! হায় রে, পচা মাছ ঢাকতে আর কত শাক চাই?  
প্রথাগত যুদ্ধের দিন অতীত। বাহু বা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে আর নিজেকে ক্ষমতাশালী বলে জাহির করার সুযোগ নেই। আজকের দুনিয়া প্রকৃতই অর্থনীতির যুদ্ধে লিপ্ত। ইউক্রেন, প্যালেস্তাইন, ইরান প্রভৃতি অঞ্চলে আকাশপথেও যে যুদ্ধ এখন জারি রয়েছে তারও নেপথ্যে সেই আর্থিক আধিপত্যবাদ। অর্থনীতির যুদ্ধে যে দেশ অন্যদের টেক্কা দিতে পারে না তার যত বিপুল বিশাল বিরাট সামরিক শক্তি থাক না কেন তাকে কেউ ক্ষমতাবান বলে গণ্য করবে না। তাই আর্থিক দিক থেকে অগ্রণী হয়ে ওঠার ব্যাপারে যে দেশ যত্নবান সে দেশেরই ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। 
পাকিস্তানকে এখনই বিরাট গুরুত্ব না দিলেও চলবে। কিন্তু চীন ও ভারতের মধ্যেকার অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির ব্যবধান যে চীনের অনুকূলেই বেড়ে চলেছে—তা অস্বীকার করার উপায় কই! এই দুঃসময়ে সামরিক এবং কূটনৈতিক খোঁচা সরিয়ে রেখে সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে ভারতবাসীর আর্থ-সামাজিক সমস্যাগুলিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জাতীয় রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির উত্থান নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। একেবারে দেশের প্রধানমন্ত্রিত্ব নিশ্চিত করেই সংসদ কক্ষে পা রেখেছিলেন তিনি। অর্থাৎ ২০১৪ সালে একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার থেকে মোদি উঠে এসেছিলেন ভারতেশ্বরের রাজসিংহাসনে! এদেশের রাজনীতিতে এ এক বেনজির দৃষ্টান্ত। এই চমকই পরে পেয়ে বসেছে তাঁকে নেশার মতোই। তিনি একের পর এক চমক দিয়ে চলেছেন তাঁর প্রশাসন পরিচালনাতেও। তার মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে নোট বাতিল, করোনা খেদাতে থালা-বাটি বাজানোর দাওয়াই, তড়িঘড়ি জিএসটি চালু, দেশে তিন তালাক নিষিদ্ধকরণ, কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদাহরণসহ সেখানকার রাজ্যের স্বীকৃতি বাতিল, পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে বিনানিমন্ত্রণে নওয়াজ শরিফের প্রাসাদে পৌঁছে যাওয়া, চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে জিনপিংয়ের সঙ্গে দোলনায় দোলা, মার্কিন মুলুকে গিয়ে নির্বাচনে সরাসরি ট্রাম্পের পক্ষ অবলম্বন প্রভৃতি। 
কিন্তু এগুলির কোনটি দেশের জন্য কতটা ভালো হয়েছে—এই বিচার করতে বসলে এখনও পর্যন্ত ইতিবাচক উত্তর একটিও মেলেনি। প্রধানমন্ত্রিত্ব পাওয়ার জন্য মোদি সবচেয়ে বড় যে চমকটি দিয়েছিলেন, তা হল—তিনি সরকার তৈরি করলে বছরে ২ কোটি নতুন চাকরি দেবেন! দেশবাসী তাঁর কথা বিশ্বাস করেছিল। ২০১৪ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তবে শুধু ওই একবারই নয়, উপর্যুপরি তিনবার প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছে তাঁকে। 
বস্তুত তিনি এক বিরল সুযোগের অধিকারী। কিন্তু বিনিময়ে বেকার যুবসমাজের ভাগ্য কতটা ফিরেছে? বছরে ২ কোটি নতুন চাকরি দূর, হাজারে হাজারে মানুষ নতুন করে বেকার হয়েছে মোদি জমানায়। করোনা পর্বের হিসেব সামনে রাখলে শিউরেই উঠতে হবে। সাড়ে চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বেকারত্বের হার প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে তো মোদির আমলেই। আর্থিক বৃদ্ধির হার ঘুরেফিরেই তলানিতে যায়। মাঝেমধ্যে আরবিআই, এসবিআই, এমনকী বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফ-ও আশার কথা শোনায়—কিন্তু সেই আশার আলো মিলিয়ে যায় বুদবুদের মতোই। আর দেশের অর্থনীতি এগোনোর পরিবর্তে পিছনে হাঁটা শুরু করলেই, সপার্ষদ মোদিজি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার কৌশলেই চ্যাম্পিয়ন হতে চান। 
২০০৫ সালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মোদিজি বলেছিলেন, ‘‘আমি সেদিনের অপেক্ষায়, যেদিন ভারতের ভিসা নেওয়ার জন্য লাইন দেবেন আমেরিকানরা।’’ ট্রাম্প সাহেবের নয়া গুঁতোয় সেই ভিডিয়ো এখন ভাইরাল। নেটিজেনদের কটাক্ষ, ১১ বছরের মোদিযুগে ঠিক এর উলটো দিন এসেছে। কিন্তু মোদি যে ভাঙলেও মচকাতে জানেন না! ফের ‘আত্মনির্ভরতা’র পক্ষে সওয়াল করেছেন তিনি। গুজরাতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন,  ‘‘ভারত এখন বিশ্ববন্ধু হওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছে। সারা বিশ্বে আমাদের কোনও বড়ো শত্রু নেই। আমাদের যদি কোনও শত্রু থাকে, সেটা অন্য দেশের উপর নির্ভরতা মাত্র। যত বেশি অন্য দেশের উপর নির্ভর করব, ততই ব্যর্থতার পথে এগিয়ে যাবে দেশ।’’
কিন্তু এই পরজীবিতার পরম্পরা কাটাব কী করে আমরা? আমাদের সংবিধান এবং গণতন্ত্রকে পাথেয় করে। বহুত্ববাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নির্দেশক আমাদের সংবিধান। ভারতের যাবতীয় সমস্যার মূলে রকমারি বৈষম্য। সংবিধানেই রয়েছে  বৈষম্য দূর করার দিগ্‌নির্দেশ। কিন্তু সাম্যবাদ, গণতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সৌন্দর্যকে অস্বীকার করে চলেছে মোদিযুগ। বাড়বাড়ন্ত এখন ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের। এজন্য প্রতিবছর কয়েকজন ধনাঢ্য (মিলিয়নেয়ার) ব্যক্তির চমকপ্রদ উত্থানের পাশে বেড়ে চলেছে ক্ষুধার্ত লোকজনের ভিড়। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন-অর্থায়নের দাপটে ধ্বংস হচ্ছে বহু দলীয় ব্যবস্থা এবং ভয়ংকর উত্থান ঘটছে একনায়ক বা স্বৈরতন্ত্রের। রাজ্যগুলির ক্ষমতাকে পুর কর্পোরেশনের স্তরে নামিয়ে দিতে মরিয়া কেন্দ্রীয় শাসনের ঔদ্ধত্য। সব মিলিয়ে জনগণের কণ্ঠ সংসদ ভবন পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়াই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 
তার ফল যা হওয়ার হয়ে চলেছে সেটাই। শতাধিক কোটি ভারতবাসী আটকা পড়ে গিয়েছে এক দুষ্টচক্রে: অশিক্ষা - দুর্বল স্বাস্থ্য - বেকারত্ব - দারিদ্র্য - চরম নিপীড়ন - সীমাহীন বঞ্চনা। তাই কী মোদিজি, কী রাহুল গান্ধী, কারোরই লম্বা-চওড়া ভাষণের কানাকড়িও মূল্য নেই—যদি না আপনি দায়িত্ব নিয়ে আর্থিক সংকট এবং সমস্ত ধরনের বৈষম্য থেকে ভারতবাসীকে দ্রুত মুক্তি দিতে পারছেন। দেশবাসী ইতিমধ্যেই ৭৮ বছর সময় দিয়েছে। এবার হয় কাজ করে দেখান নয়তো বাগাড়ম্বর থামান দয়া করে। এনাফ ইজ এনাফ। 
পুনশ্চ: “একা মহৎ হতে চাওয়ার মতো বিরাট নির্বুদ্ধিতা আর নেই। সৎ হওয়ার যোগ্যতা নেই নির্বোধদের।”
—বলেছিলেন ইউরোপের প্রথম ক্লাসিক মনস্তাত্ত্বিক, সপ্তদশ শতকের ফরাসি মরালিস্ট লা রোশফুকো।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ