বিরাট বড়ো খবর। অবশেষে মণিপুরে পা রেখেছেন নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রী দেশের একটি অঙ্গরাজ্য পরিদর্শনে গিয়েছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, এতে অবাক হওয়ার কী আছে? ভারতের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে এটাই তো স্বাভাবিক এবং এটা বরং আনন্দের ব্যাপার। কিন্তু বিস্ময়টা এখানেই—প্রধানমন্ত্রীর পা পড়েছে উত্তর-পূর্বের ক্ষুদ্র রাজ্য মণিপুরে। ব্যাপারটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়, রীতিমতো অস্বাভাবিক। এই অস্বাভাবিকতা এতটাই যে, তাঁর মণিপুর পরিদর্শনের খবর সবার কাছে, সব মিডিয়াতে ‘বড়ো খবর’ হিসেবেই গণ্য হচ্ছে। ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্য মণিপুরে এথনিক ভায়োলেন্স বা জাতিদাঙ্গার শুরু ২০২৩ সালের ৩ মে। সংঘর্ষের কেন্দ্রে হিন্দু মেইতেই সম্প্রদায় এবং কুকি জনজাতি। প্রথমোক্ত শ্রেণি ইম্ফল উপত্যকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণিটি তার বাইরে পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে লাগাতার সংঘর্ষে দুই অঞ্চলেই যে বিরাট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার প্রকৃত হিসেব হয়তো কোনোদিনই পাওয়া যাবে না। তবে গত ২২ নভেম্বর পর্যন্ত পাওয়া সরকারি হিসেবে, ২৬০ জনের মতো নাগরিকের প্রাণ চলে গিয়েছে। শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ মানুষসহ এগারোশোর বেশি নাগরিক জখম হয়েছেন। গৃহহীন হয়ে গিয়েছেন ৬০ হাজারের বেশি নরনারী। ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি। দৃর্বৃত্তদের তাণ্ডবের বলি পাঁচ শতাধিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও। হামলার শিকার বহু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। পুলিশের পক্ষেও আত্মরক্ষা করা সম্ভব হয়নি সব ক্ষেত্রে। ধর্ষণসহ নানাবিধ নিপীড়নের শিকার হয়েছেন কত যে নারী, তা হলফ করে বলা মুশকিল। নারীর বেনজির লাঞ্ছনা দেখে শিউরে উঠেছে সারা দেশ, এমনকি গণতান্ত্রিক দুনিয়াও।
বলা বাহুল্য, এত কাণ্ড একদিনে বা অল্পদিনে হয়নি—এজন্য সময় নিয়েছে দুবছরের বেশি! অশান্তির শুরুতেই দাবি উঠেছিল, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বীরেন সিং সরকারকে বরখাস্ত। মণিপুরবাসী বারবার দাবি করেছিল, প্রধানমন্ত্রী অন্তত একবার মণিপুরের আসুন। মণিপুর মোটে ভালো নেই। সেই খারাপ কতটা, তিনি নিজের চোখে দেখে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিন। কিন্তু যে প্রধানমন্ত্রী নিত্য বিশ্ব চষে বেড়ান, তিনি ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া মণিপুরে পৌঁছোবার প্রয়োজন বোধ করেননি। মণিপুর জ্বলতে পুড়তে থেকেছে তাঁরই পার্টি ও সরকারের চোখের সামনে! তবু মোদি সরকার এবং শাসক দল বিজেপি এই ঘটনার দায় নেয়নি। প্রধানমন্ত্রী সীমাহীন নীরবতার নীতি আঁকড়ে ছিলেন। এজন্য তাঁর ছবি ও বিবরণসহ ‘নিখোঁজ’ পোস্টারও পড়েছিল মণিপুরের নানা স্থানে! প্রতিবাদী নাগরিকদের আক্ষেপ ছিল, মোদি সরকার হয়তো মণিপুরকে ভারতের অঙ্গরাজ্য বলে আর স্বীকার করে না! সরকার অবশ্য তাতেও দমেনি। ভারত এবং সরকারের বদনাম করা হচ্ছে দাবি করে, উল্টে বিরোধীদের দিকেই আঙুল তুলেছিল তারা। নানাভাবে চেষ্টা হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিংকে বাঁচাবার। কিন্তু শেষমেশ গদিরক্ষা হয়নি তাঁর। গত ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি ওই রাজ্যে জারি হয় রাষ্ট্রপতির শাসন।
ঠিক তার সাতমাস পর, গত ১৩ সেপ্টেম্বর এবং ২০২৩ সালের মে থেকে ধরলে ২৮ মাস পর মণিপুরে পা পড়ল মোদির! এরপরও বুঝতে বাকি থাকে কি, কেন মোদির মণিপুর পরিদর্শন অস্বাভাবিক ঘটনা এবং বেশ বড়ো খবর? যথারীতি মণিপুরবাসী তাঁকে পেল একেবারে নাটকীয় চরিত্রে। মণিপুরে পৌঁছে তিনি যা যা বললেন, তাকে মুফতে মানুষের মনজয়ের ছক ছাড়া কীই-বা বলা যায়? মোদি বলেছেন, ‘‘মণিপুর নামের সঙ্গে মণি শব্দটি আছে। মণি অর্থাৎ রত্ন। উত্তর-পূর্ব ভারতের মাথার উজ্জ্বল মণি হবে মণিপুর। শান্তিপূর্ণ মণিপুরে হিংসা ছড়িয়ে পড়েছিল। শান্তি ফিরেছে। স্বাভাবিক অবস্থা ফেরাতে আমরা নিরন্তর কাজ করছি। আমি আক্রান্তদের সঙ্গে কথা বলেছি। আর আশ্রয় শিবিরে গিয়ে দেখেছি, শান্তি আর আশার সূর্যোদয়ের ইঙ্গিত।’’ এমনকি সংঘর্ষের অন্যতম ভরকেন্দ্র চূড়াচাঁদপুরে এক জনসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এও দাবি করেন, ‘‘অতীতে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ছিল অশান্ত এবং হিংসাদীর্ণ। গত এগারো বছরে আমরা মণিপুরের নানাবিধ সংঘাত এবং সমস্যা দূর করে শান্তি ফিরিয়ে এনেছি। মণিপুরকে শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীকে পরিণত করতে চলেছি আমরা। মণিপুরের সামগ্রিক উন্নয়নে যা করেছি, সেটা স্বাধীনতার পর থেকে আর কোনও সরকার করেনি।’’ প্রধামন্ত্রীর এই দাবি কতটা বাস্তব আর কতখানি মোদিসুলভ বাগাড়ম্বর, সেখানকার মানুষের যন্ত্রণাই তার সাক্ষ্য দিচ্ছে নাকি? তাই, তাঁর এহেন ভাষণে প্রধানমন্ত্রী পদের মর্যাদা কতটা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে সেটা নরেন্দ্র মোদিকেই ভেবে দেখতে হবে। তিনি তা পারবেন কি না, কেবল তিনিই জানেন। আমরা সবাই চাই—মণিপুর আবার শান্ত হোক। দ্রুত শান্তি ফিরুক সেখানে। মণিপুরে মেঘমুক্ত আকাশ, অভিনন্দনের রঙে সূর্যোদয় এবং একের পর এক সুন্দর সকাল।