প্রীতম দাশগুপ্ত: ঘুম হয়তো উড়েছে নরেন্দ্র মোদির। সম্ভবত অক্টোবরের শেষে বা নভেম্বরে বিহারে বিধানসভার ভোট। অর্থাৎ হাতে আছে আর মাস চারেক। এর মধ্যেই অনুকূলে নিয়ে আসতে হবে ভোট ব্যাঙ্ক। কাজটা যে সহজ নয়, তা বিলক্ষণ জানেন মোদিজি। তাই তাঁর চেষ্টার অন্ত নেই। যেনতেনপ্রকারে বিহারবাসীর মন জয় করতে হবে।
গত কয়েকমাসে দফায় দফায় বিহার গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ঘোষণাও করেছেন প্রায় ১৫ হাজার কোটির প্যাকেজ। দিয়েছেন বিস্তর প্রতিশ্রুতি। তাতেও চিঁড়ে ভিজছে এমনটা বলা যাচ্ছে না। অপারেশন সিন্দুরের পর এই প্রথম কোনও রাজ্যের ভোট হবে। এই ঘটনাকে সামনে রেখে দেশাত্মবোধের ধ্বজা তুলেছেন মোদি। কিন্তু সেই ঘটনা কি আদৌ ডিভিডেন্ড দেবে? নিশ্চিন্ত নন তিনি। কারণ বিভিন্ন রাজ্যের সাম্প্রতিক ভোটের ট্রেন্ড বলছে, ইস্যু যতটা না জাতীয়, তার থেকে ঢের বেশি লোকাল, অর্থাৎ স্থানীয়। বিহার বিধানসভার ভোটেও মূল ইস্যু, সেই রাস্তাঘাট, পানীয় জল, মহিলাদের উন্নয়ন। ফলে ‘সিন্দুর’ দিয়ে মহিলাদের মন জয় করা যাবে কি না তাতে সন্দেহ রয়েছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা বলছে সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা। সি ভোটারের সেই সমীক্ষাতেও অপারেশন সিন্দুর নিয়ে তেমন আশার আলো দেখতে পাচ্ছে না বিজেপি।
সি ভোটার সমীক্ষায় প্রশ্ন করা হয়েছিল, মুখ্যমন্ত্রী পদে কাকে পছন্দ করছেন? সবচেয়ে বেশি মানুষ বলেছেন আরজেডি নেতা লালু-পুত্র তেজস্বী যাদবের নাম। তাঁর জনপ্রিয়তার গ্রাফ সামান্য কমলেও, তিনি এখনও শীর্ষে। আর তৃতীয় স্থানে নীতীশ কুমার। ইন্টারেস্টিং বিষয় দু’নম্বরে উঠে এসেছেন ভোটকুশলী বলে পরিচিত জন সুরজ নামে নতুন রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর। এহেন তথ্যে মোদিজির ঘুম উড়বে এটাই স্বাভাবিক। ফেলুদার ভাষায় তাই তাঁকেও বলতে হচ্ছে, আর তো নিশ্চিন্তে থাকা যাচ্ছে না...।
এনডিএ জোটের ঘোষিত মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী নীতীশ কুমার এখন কার্যত অস্তমিত সূর্য। পিংপং বলের মতো বারপাঁচেক এদিক-ওদিক করে নিজের ক্রেডিবিলিটি নষ্ট করেছেন। তার উপর তাঁর শারীরিক অসুস্থতা পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। বিভিন্ন সভায় তাঁর অপ্রাসঙ্গিক আচরণ অসুস্থতার প্রমাণ আরও বাড়িয়েছে। প্রশান্ত কিশোর থেকে শুরু করে তেজস্বী যাদব— বলেই দিচ্ছেন নীতীশের মস্তিষ্ক এখন নাকি সেভাবে কাজ করছে না। মেন্টালি আনফিট। তেজস্বী যেমন বলেছেন, ১৫ বছরের গাড়ি যেমন বাতিল করা হয়, তেমন ২০ বছরের পুরনো মুখ্যমন্ত্রীকেও এবার বদল করতে হবে। নীতীশের দলেও স্লোগান উঠেছে, বিহার কি মাঙ্গ, শুন লিয়া নিশান্ত। বহুত বহুত ধন্যবাদ। কে এই নিশান্ত? তিনি নীতীশ কুমারের পুত্র। এই স্লোগান দেওয়া পোস্টার পড়েছে পাটনায় জেডিইউয়ের দপ্তরেই। নিশান্তের ইলেকশন ডেবিউ শুধু সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করা হচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতেও বাধ্য হয়ে বিজেপিকে ঘোষণা করতে হচ্ছে নীতীশকে সামনে রেখেই ভোটে লড়বে জোট। কারণ বিজেপি এত বছর পরেও বিহারের মুখ্যমন্ত্রী পদে একজনও গ্রহণযোগ্য মুখ খুঁজে বের করতে পারল না। একসময় তাদের মুখ ছিলেন প্রয়াত সুশীল মোদি। এখন সম্রাট চৌধুরী। দু’জনেই পিছড়ে বর্গের নেতা। এই ভোট ব্যাঙ্ক আবার গেরুয়া শিবিরের পক্ষে নেই। তাই বিজেপির শেষ ভরসা সেই মোদিজি। তিনিই প্রধানমন্ত্রী, তিনিই এনডিএ জোটের কাণ্ডারী।
মোদিজিরও চেষ্টার অন্ত নেই। দফায় দফায় বিহারে যাচ্ছেন। আবার যাবেন। অন্তত ভোট পর্যন্ত তাঁকে যে বারেবারে মগধভূমে দেখা যাবে তা নিশ্চিত। কিন্তু সবচেয়ে আকষর্ণীয় বিষয় হল, শুধু দেশের মাটিই নয়, বিহারের ভোট প্রচারে রাষ্ট্রীয় সফরকেও কাজে লাগাচ্ছেন মোদিজি।
পাটনা থেকে পোর্ট অব স্পেনের দূরত্ব কত? গুগল বলছে, প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের একটা ছোট্ট দেশ ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো। লোকসংখ্যা আমাদের গোয়ার চেয়েও কম। ত্রিনিদাদ বিখ্যাত তার সমুদ্র সৌন্দর্য আর ক্রিকেটের জন্য। ত্রিনিদাদ বললেই চোখে ভাসে বাঁহাতি এক ক্রিকেটারের মারমুখী ব্যাটিং। ব্রায়ান লারা। এহেন ত্রিনিদাদে রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়েছিলেন মোদি। যেতেই পারেন। কিন্তু সেখানে গিয়েও মোদির মুখে শোনা গিয়েছে পাটনার কথা। বিহারের কথা। ত্রিনিদাদের সংস্কৃতির সঙ্গে বিহারের যোগের কথা বারবার তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।
ত্রিনিদাদের প্রধানমন্ত্রী কমলা প্রসাদ বিশেশ্বর নিজেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত। আরও স্পষ্ট করে বললে তাঁর আদি বাড়ি বিহারেই। কমলাকে পাশে বসিয়ে এক অনুষ্ঠানে মোদি তাঁকে সম্বোধনই করেছেন বিহার কি বেটি বলে। বলেছেন, কমলার পূর্বপুরুষ বিহারের বক্সারে থাকতেন। তিনিও ওই জায়গায় গিয়েছেন। তাঁকে সেখানকার মানুষ বিহারের মেয়ে বলেই মনে করে। আসলে বিহার থেকে শ্রমিক হিসেবে এদেশে আসা রামলখন মিশ্রের বংশধর ত্রিনিদাদের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী কমলা। শুধু কমলার প্রশংসাই শোনা যায়নি মোদির গলায়, বলেছেন, ভারতে বেনারস, পাটনা, কলকাতা, দিল্লির মতো শহর রয়েছে। কিন্তু এখানে রয়েছে পাটনার নামে রাস্তা।
ত্রিনিদাদের ১৫ লক্ষ মানুষের মধ্যে অন্তত ৪৫ ভাগ ভারতীয় বংশোদ্ভূত। আবার তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই বিহারী। বহুদিন আগে তাঁদের পূর্বপুরুষরা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে এদেশে এসেছিলেন। বিহারের মন জয়ে সূক্ষ্মভাবে মোদি সেই প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন। বলেছেন, এঁরা দেশের মাটি ছেড়ে এসেছেন, কিন্তু হৃদয় নয়। এঁদের শুধুমাত্র পরিযায়ী হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এরা সভ্যতার বার্তাবাহক।
আসলে বিহার ভোট এখন মোদির কাছে এতটাই চ্যালেঞ্জের যে, বিহারবাসীর মন জয়ের কোনও সুযোগই হাতছাড়া করতে রাজি নন তিনি। রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়েও তাই বিহার ভজনা করতে শুরু করেছেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছেন বিহারের ঐতিহ্যের কথা। তাঁর ভাষণের প্রতিটি ছত্রেই স্পষ্ট হয়েছে, ভাষণ তিনি দিচ্ছেন ত্রিনিদাদে ঠিকই, কিন্তু তাঁর সামনে রয়েছেন ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরের জনতা। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিহারের এই ঐতিহ্য শুধু ভারতের গর্ব নয়, সমগ্র বিশ্বের। গণতন্ত্র, রাজনীতি থেকে শুরু করে কূটনীতি—সমগ্র বিশ্বকেই পথ দেখিয়েছে এই রাজ্য। এমনকী তাঁর বিহার প্রেম দেখাতে গিয়ে নৈশভোজের ছবিও শেয়ার করেছেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীকে সোহারি পাতায় খেতে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ এখানেও বিহার যোগ। কোনও শুভ কাজ সম্পন্ন করার সময় বিহারে এই পাতা ব্যবহারের চল রয়েছে। মোদি সেই রীতিই অনুসরণ করেছেন। ঐতিহ্যবাহী ভোজপুরী চৌতালের মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানানোর ভিডিও আপলোড করেছেন মোদি। গত মার্চে মরিশাস সফরে গিয়েও মোদি বিহার বার্তা দিয়েছিলেন। কারণ মরিশাসকে লোকে মিনি বিহারই বলে। মোদি ভাষণ শুরুই করেছিলেন ভোজপুরীতে। রাজধানী পোর্ট লুইসে নামার পর তাঁকে স্বাগত জানাতেও মহিলারা গেয়েছিলেন ভোজপুরী গান ‘গাওয়াই’। মরিশাসের প্রধানমন্ত্রী নবীন রামগুলামের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বিহারের মাখানা। আসলে মরিশাসের ৫০ শতাংশ মানুষই ভোজপুরীতে কথা বলেন। বিহার ভোটে অন্তত ৭৩টি আসনে ভোজপুরী ভাষাভাষীদের প্রভাব বেশি। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে এই ভোজপুরী বলা ১০টি জেলা যেমন বক্সার, আরা, সাসারাম প্রভৃতিতে এনডিএ-এর ফল খারাপ হয়েছিল। তাই মোদি বেছে বেছে জোর দিয়েছেন ভোজপুরী ভাষাকেই। মরিশাস সফরে তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাও বলেছিলেন। উদ্দেশ্য বিহারকে শিক্ষা-সংস্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে তুলে ধরা। গুয়ানা, সুরিনাম, ফিজি,সেশলস সফরেও মোদির লক্ষ্য ছিল বিহার ভোট। গত বছর গুয়ানা সফরে গিয়ে সেখানকার প্রেসিডেন্ট ইরফান আলির হাতে বিহারের বিখ্যাত মধুবনী পেন্টিং তুলে দিয়েছিলেন।
বিহার ভোট বলে নয়, এটাই মোদির স্ট্র্যাটেজি। ভোট থাকলে বিদেশ সফরে গিয়ে অনাবাসী ভারতীয়দের সামনে দলের কথা প্রচার করা। বিদেশের মঞ্চকে বহুবার ব্যবহার করেছেন মোদিজি। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের আগে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরকে নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের মতুয়া মন্দিরে। উদ্দেশ্য ছিল রাজ্যের মতুয়া ভোটকে নিজের দিকে টেনে আনা। কর্ণাটক ভোটে হেরেছিল বিজেপি। সেই বছরই অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিলেন মোদি। সুযোগ যথারীতি ছাড়েননি। ইন্ডিয়ান ডায়াসপোরার সামনে সাধারণ নির্বাচনের প্রস্ততি সেরে ফেলেছিলেন। সিডনির বিখ্যাত ইন্ডোর স্টেডিয়ামে অনাবাসী ভারতীয়দের সামনে তাঁর আমিত্বের বার্তা দিয়েছিলেন। এবারের আর্জেন্তিনা সফরে গিয়েও ভারতীয়দের উদ্দেশে মোদিকে বলতে শোনা গিয়েছে, সংস্কৃতির মেলবন্ধনের ক্ষেত্রে দূরত্ব কখনওই বাধা হতে পারবে না। আসলে অনাবাসী ভারতীয়দের সংখ্যা কম করেও তিন কোটি। এরা ভারতে এসে ভোট দেবেন না ঠিকই, কিন্তু দেশে আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে এই ভোটারদের কম প্রভাব নেই। তার উপর ভোট ফান্ডিংয়ে এই অনাবাসী ভারতীয়দের অবদান সবচেয়ে বেশি। তাই প্রতিটি রাজনৈতিক দলই চায় বিদেশে বসবাসকারী এই ভারতীয়দের মধ্যে নিজেদের একটি শক্তিশালী সংগঠন থাকুক। তবে এই ক্ষেত্রে মাস্টারপিস নিঃসন্দেহে বিজেপি।
ইতিমধ্যেই নীতীশ কুমারকে বিহারের রাজপাট থেকে গদিচ্যুত করতে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে বিরোধী আরজেডি। তেজস্বী যাদব আগ্রাসী ভূমিকায় বিহারের রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। কংগ্রেসও এবার তেমন একটা বাগড়া দেবে বলে মনে হচ্ছে না। এর আগে গুজরাত, হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্রে বড় ধাক্কা খেয়েছে তারা। বিশেষ করে বিরোধী ঐক্য জোরদার না হওয়ায় হরিয়ানার জেতা ম্যাচ হাতছাড়া হয়েছে। তাই এবার তারা সতর্ক। অন্যদিকে জোট নিয়ে রীতিমতো ঘেঁটে রয়েছে এনডিএ। একে স্যর বা স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন নিয়ে জোটের অন্দরেই বিদ্রোহের আঁচ। তার উপর সমস্যা বাড়াতে তৈরি হয়েছেন লোক জনশক্তি পার্টির চিরাগ পাসোয়ান। তাঁর ঘোষণা, তিনি নিজেও ভোটে লড়বেন, দলকেও সব আসনে লড়াই করাবেন। ফলে বিজেপির এখন দ্বিমুখী সমস্যা। একদিকে জোটের অনৈক্য, অন্যদিকে তেজস্বীকে টেক্কা দেওয়ার মতো স্থানীয় নেতার অভাব। ফলে সবে ধন নীলমণি সেই মোদিজিতেই ভরসা গেরুয়াবাহিনীর। তিনিও পাটলিপুত্র জয়ে শুধু সেখানে হাজির হচ্ছেন না, যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন শুনিয়ে যাচ্ছেন বিহারের বীর-গাথা। কিন্তু প্রশ্ন এত করেও সাফল্য আসবে কি?